

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী হত্যা, সোনা চোরাচালান ও হাজার কোটি টাকা অর্থপাচারের গুরুতর অভিযোগে কারাবন্দী থাকার কথা থাকলেও বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগের অলিগার্ক দিলীপ কুমার আগরওয়ালার রহস্যজনক কারামুক্তি এবং বর্তমান প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা অনুষ্ঠানে তাঁর প্রকাশ্যে উপস্থিতি দেশ জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তির সহযোগিতায় অতি গোপনে কারাগার থেকে বের হয়েই তিনি এখন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভিআইপি প্রটোকলের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে পুরো স্বরাষ্ট্র প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে।
শুক্রবার রাতে রাজধানীর বনানী মাঠে গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন আয়োজিত শারদীয় দুর্গোৎসবের কেন্দ্রীয় মণ্ডপ পরিদর্শনে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। সেই উচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টিত অনুষ্ঠানে মূল মঞ্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একদম কাছাকাছি আসনে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বসে থাকতে দেখা যায় সাবেক এই আওয়ামী এমপি প্রার্থী ও ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের কর্ণধারকে।
সরকারের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার উপস্থিতিতে এক গণহত্যার সহযোগী ও অভিযুক্ত অপরাধীর এমন প্রকাশ্য উপস্থিতি প্রশাসনের নিরাপত্তা ও সদিচ্ছাকেই চরম কাটগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ অবশ্য দাবি করেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশের প্রতিটি পূজামণ্ডপে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়কে কোনো রাজনৈতিক দলের ‘ভোট ব্যাংক’ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ দেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্র সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে নিরাপত্তার বুলি আর মূল মঞ্চে পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনার অন্যতম অর্থ জোগানদাতা দিলীপের আসীন থাকার দৃশ্য দেখে হতবাক হয়েছেন জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি ও সাধারণ মানুষ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গুলশান থানা পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতারের পর বিভিন্ন মামলায় দিলীপ আগরওয়ালকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। কারাজীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি হাসপাতালে ভিআইপি কেবিনে আরাম-আয়েশে কাটিয়েছেন। এরপর গুলশান থানার একটি হত্যা মামলায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর আদালত জামিন দিলে, মাত্র তিন দিনের মাথায় ৩০ সেপ্টেম্বর কোনো ধরনের গোয়েন্দা ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই কঠোর গোপনীয়তায় কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বেরিয়ে যান তিনি।
আইনজীবীদের অভিযোগ, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার ছাড়পত্র ছাড়া একজন হাইপ্রোফাইল আসামির এত দ্রুত কারামুক্তি রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যক্ষ ও প্রভাবশালী সহযোগিতা ছাড়া কিছুতেই সম্ভব ছিল না।
কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পরপরই গা ঢাকা দিলেও সীমান্ত পেরিয়ে তিনি ভারতে পালিয়ে গেছেন নাকি দেশেই আছেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
একদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা করেছে এবং ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে সোনা চোরাচালান ও অর্থপাচারের অনুসন্ধান চলছে।
অন্যদিকে এমন একজন শীর্ষ অপরাধী কীভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ভিআইপি স্ট্যাটাস পান, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলের জোরালো দাবি, জুলাইয়ের বীর শহীদদের রক্তের সঙ্গে এই বিশ্বাসঘাতকতার পেছনে জড়িতদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে।
আপনার মতামত লিখুন :