• ঢাকা
  • শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪৪ পূর্বাহ্ন

বিআরটিসির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সর্বশীর্ষে রয়েছে ডিজিএম গোলাম ফারুক


প্রকাশের সময় : অগাস্ট ২৯, ২০২৬, ১১:৪২ পূর্বাহ্ন /
বিআরটিসির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সর্বশীর্ষে রয়েছে ডিজিএম গোলাম ফারুক

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহণ সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ করপোরেশন (বিআরটিসি) এখনও পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের দোসর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দখলে রয়েছে।

পতিত ফ্যাসস্ট হাসিনার আমলে প্রকাশ্যে দুর্নীতি করাসহ তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা লুটের অভিযোগ ছিল তারাই এখন শীর্ষ পদে কর্মরত থেকে খুনি হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের পুনর্বাসন করে চলেছেন। এর মধ্যে সর্বশীর্ষে রয়েছেন-বিআরটিসির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) গোলাম ফারুক।

এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি ৪ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্তেই এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরেও শাস্তির পরিবর্তে তাকে পদোন্নতি দিয়ে আরও দুর্নীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা।

শুধু তাই নয়, এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বর্তমান চেয়ারম্যানের সাথে লিয়াঁজো করে এখনও সমান তালে দুর্নীতি করে চলেছেন। একই সাথে তিনি খুনি হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের আগের মতোই অবৈধ সুবিধা দিয়ে সমানে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের তদন্ত ও শৃঙ্খলা বিভাগের নথিপত্র, বিআরটিসির নানা তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, নানা অপকর্মে অভিযুক্ত এই কর্মকর্তা বিআরটিসি থেকে বিভিন্ন সময়ে ৪ কোটিরও বেশি টাকা টাকা আত্মসাৎ করেন।

বিআরটিসির বিভাগীয় মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ডিজিএম গোলাম ফারুক ও ম্যানেজার (অপারেশন) নূর-ই- আলম রাজধানীসহ নানা জেলায় বিআরটিসির ডিপো গুলোতে বাস রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, যন্ত্রপাতি কেনার ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করেন। কখনো অকেজো দ্বিতল বাস কেটে বাইরে বিক্রি করে দিয়ে, কখনো বহিরাগত চালকদের দিয়ে বাস চালিয়ে অর্থ লোপাট করেছেন দেদারসে।

এখনও বাস ও কাউন্টার লিজ দিয়ে অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ লিজ বহাল রেখে লাখ লাখ টাকা লুট করছেন।

বিআরটিসির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, গোলাম ফারুক নামের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে ঘুষ, অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা। বিশেষ করে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দেদারছে কামিয়েছেন। এখনও ফ্যাসিস্ট হাসিনার মহযোগিদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে চলছেন।

টাকার বিনিময়ে তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার ফ্যাসিস্টদের পক্ষ নিতেও এতটুকু দ্বিধা করেন না। বরং অনিয়মকেই নিয়মে পরিণত করে ঘুষ, দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন।

একজন ভুক্তভোগী পরিবহন ব্যবসায়ী বলেন, মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়া গোলাম ফারুক কারও কথাই শোনেন না। বরং নানা অজুহাতে তার দখলে থাকা ফাইল আটকে রেখে সময় ক্ষেপণ করেন। এতে করে ভুক্তভোগীরা এক সময় বাধ্য হয় তাকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে। এ কাজ তিনি প্রকাশ্যেই করেন। যা বর্তমান চেয়ারম্যানেরও জানা। কিন্তু রহস্যজনক কারণে চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লাও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন না।

অভিযোগ রয়েছে, গোলাম ফারুক খুনি হাসিনার রক্ষাকবজ শাজাহান খানের মনোনীত ব্যবসায়িদের কখনোই বঞ্চিত করেন না। শাজাহান খানের মনোনীত ব্যবসায়ীরা যাতে টিকে থাকতে পারে সে জন্য তিনি সবসময় সচেষ্ট ছিলেন, এখনও তাই আছেন। তাকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করে চলেছেন বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান।

বিআরটিসির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, বর্তমান চেয়ারম্যান শুধু গোলাম ফারুককেই ক্ষমতাধর বানাননি, খুনি হাসিনার সমর্থকদেরকেও তিনি বিশেষ সুবিধা দিয়ে চলেছেন।

এসব বিষয়ে জানার জন্য গোলাম ফারুকের মোবাইল নম্বরে কয়েকবার কল করলেও তিনি কোন সাড়া দেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোন উত্তর দেননি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালের জুন মাসে বিআরটিসিতে ইন্সট্রাক্টর পদে যোগ দিয়েছিলেন গোলাম ফারুক। তিনি এখন বিআরটিসির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক ডিপোর ইউনিট প্রধান হিসেবে রেকর্ড ২ কোটি ৩৩ লাখ ১১ হাজার ৭৫০ টাকা বিআরটিসির তহবিলে জমা দেননি মো. গোলাম ফারুক। তখন তিনি বগুড়া ডিপোতে কর্মরত ছিলেন। নথিপত্র থেকে আরো জানা যায়, বিআরটিসি বাসের দৈনন্দিন অর্জিত রাজস্ব বিভিন্ন চালক, কন্ডাক্টর, ব্যক্তিদের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া রেখেছেন, যা বিআরটিসির কোষাগারে জমা হয়নি।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিসির নিজস্ব চালকদের বাদ দিয়ে বাইরের পছন্দসই চালকদের দিয়ে গাড়ি পরিচালনা করার। পরে সেসব গাড়ি পরিচালনায় অর্জিত অর্থ তিনি রাজস্ব তহবিলে জমা দেননি। এ কান্ডে তিনি ১ কোটি ১২ লাখ ৬২ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে বিআরটিসির একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

২০১৬-১৭ সালে তিনি কর্মরত ছিলেন মোহাম্মদপুর বাস ডিপোতে। এ সময় তিনি বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি ইস্যুতে নানা অনিয়ম করেন। এতে বিআরটিসির ২৮ লাখ ৩৫ হাজার ৬০০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। এ কান্ডে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তবে সে সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রভাব খাটিয়ে সেসব মামলা খারিজ করিয়ে নেন তিনি।

বিভাগীয় মামলা থাকার পরেও তিনি পদোন্নতি পেয়েছেন আওয়ামী লীগ আমলের পরিবহন সেক্টরের লুটেরা শাজাহান খানের আশীর্বাদে।

ক্ষমতার পালা বদলের পরেও শাজাহান খানের দাপট রয়েছে রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বিআরটিসিতে। সেই দাপটে গোলাম ফারুকও এখনও দাপুটে কর্মকর্তা। বিআরটিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশ্ন একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা থাকার পরেও তিনি পদোন্নতি পান কি ভাবে?

বিআরটিসির প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ঢাকার গাবতলী ডিপোর ম্যানেজার থাকাকালীন সময়ে গোলাম ফারুক বেতন-ভাতা বাবদ ৩৫ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫ টাকা পরিশোধ করেননি। এ ছাড়া প্রধান কার্যালয়ে চাকুরিবিধির ব্যত্যয় ঘটিয়ে একাধিকবার শোকজ নোটিশ পেয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে ৪ কোটি ৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে গোলাম ফারুকের বিরুদ্ধে।

শুধু তাই নয়, এখনও তিনি ট্রিপের হিসাবে গোঁজা মিল দিয়ে, বাস সার্ভিসিং ও খুচরা যন্ত্রাংশ কেনার নামে প্রতি সপ্তাহে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেই চলেছেন। তাকে রুখে এমন ক্ষমতা কারো নেই। এমনকি বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লাও টাকার বিনিময়ে গোলাম ফারুকের কাছে নিজেকে জিম্মি করে রেখেছেন।

সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, বর্তমান চেয়ারম্যান নিজেও ফ্যাসিস্টদের দলের একজন। যে কারণে তিনি ডিজিএম গোলাম ফারুককে অবৈধ ও অনৈতিক কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন।

বিআরটিসির একটি সূত্র জানায়, সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে বিপাকে পড়েছে বিআরটিসি। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ একাধিকবার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করলেও রহস্যজনক কারণে ডিজিএম গোলাম ফারুকের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমলেই যদি পতিত ফ্যাসিস্ট খুনি হাসিনার দুর্নীতিবাজ সহযোগীদের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে না সরানো যায়, তাহলে আগামীতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দোসর, খুনি হাসিনার ফ্যাসিস্টরা দুর্নীতির মাধ্যমে নিজেদের দলকে ক্রমে সুসংহত করার সুযোগ পাবে। শেষ পর্যন্ত এর দায় কে নেবে?