• ঢাকা
  • সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ০৭:০২ অপরাহ্ন

পিঠাভোগে রবীন্দ্রনাথের শিকড় : কুশারী বাড়িতে আজও বেঁচে আছে বিশ্বকবির পূর্বপুরুষের স্মৃতি


প্রকাশের সময় : মে ১০, ২০২৬, ৯:২২ অপরাহ্ন / ৩০
পিঠাভোগে রবীন্দ্রনাথের শিকড় : কুশারী বাড়িতে আজও বেঁচে আছে বিশ্বকবির পূর্বপুরুষের স্মৃতি

রাজিবুল ইসলাম রাজিব, খুলনাঃ খুলনার রূপসা উপজেলার ভৈরব নদের তীরঘেঁষা পিঠাভোগ গ্রাম। নিভৃত এই জনপদই বহন করছে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের–এর পিতৃপুরুষের স্মৃতি ও ইতিহাস। এখানকার কুশারী বাড়িকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে কবিগুরুর বংশপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য সাক্ষ্য হয়ে আজও টিকে আছে।

স্থানীয় ইতিহাস ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, পিঠা ভোগের কুশারী বংশ থেকেই পরবর্তীতে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের উদ্ভব। কুশারীরা ছিলেন ব্রাহ্মণ বংশীয়। ইংরেজ শাসনামলে বংশের উপাধি পরিবর্তিত হয়ে “ঠাকুর” নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীকালে সমাজে তারা “পীরালী ঠাকুর” নামেও পরিচিত হন। সেই বংশের একটি অংশ আজও পিঠাভোগ গ্রামে বসবাস করছে।

ইতিহাস বলছে, কুশারী বংশের অষ্টম পুরুষ রাম গোপালের ছেলে জমিদার জগন্নাথ কুশারী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের পিতৃকুলের আদি পুরুষ। তার অধস্তন চতুর্দশ পুরুষ পঞ্চানন কুশারী পারিবারিক বিরোধের জেরে পিঠাভোগ ছেড়ে কলকাতার গোবিন্দপুরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সে সময় ওই এলাকায় ব্রাহ্মণ পরিবার না থাকায় স্থানীয় মানুষ শ্রদ্ধাভরে তাকে “ঠাকুর” বলে সম্বোধন করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে কুশারী উপাধি হারিয়ে “ঠাকুর” নামটিই স্থায়ী হয়ে যায়।

পরে পঞ্চানন ঠাকুরের পৌত্র নীলমণি ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাঁকোয় বসতি স্থাপন করেন। তারই অধস্তন চতুর্থ প্রজন্মে ১৮৬১ সালে জন্ম নেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অন্যদিকে পিঠাভোগে থেকে যাওয়া প্রিয়নাথ কুশারীর বংশধররা এখনও ওই গ্রামে বসবাস করছেন।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে খুলনার সম্পর্ক কেবল পিতৃকুলেই সীমাবদ্ধ নয়। তার মা সারদা দেবীর বাড়ি ছিল ফুলতলার দক্ষিণডিহিতে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দক্ষিণডিহির রামনারায়ণ রায় চৌধুরীর কন্যা সারদা দেবীর বিয়ে হয়। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ নিজেও বিয়ে করেন দক্ষিণডিহির বেনীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণী দেবীকে, যিনি পরবর্তীতে মৃণালিনী দেবী নামে পরিচিত হন। ফলে পিতৃকুল, মাতৃকুল ও শ্বশুরবাড়ির সূত্রে খুলনার সঙ্গে কবিগুরুর আত্মিক সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

পিঠাভোগের কুশারী বাড়িতে একসময় দাঁড়িয়ে ছিল দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যময় অট্টালিকা। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ভবনটি ইন্দো-ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ছিল এবং মাটি থেকে প্রায় চার ফুট উঁচুতে অবস্থিত ছিল। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে কবির বংশধরেরা ১৯৯৪ সালের দিকে বাড়িটি বিক্রি করে দেন। এরপর ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায় ঐতিহাসিক সেই স্থাপনা।

তবে হারিয়ে যায়নি ইতিহাসের চিহ্ন। ২০১১ সালের এপ্রিলে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে এখানে একটি বিলুপ্ত ইমারতের ভিত্তিনকশা উন্মোচিত হয়। উদ্ধার করা হয় তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন প্রত্নবস্তু ও স্মারক নিদর্শন। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পিঠাভোগের এই বাস্তুভিটাকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে।

বর্তমানে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের বসতভিটা ও রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রহশালা’। প্রবেশপথটি নির্মাণ করা হয়েছে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির আদলে। ১৯৯৪ সালের ২৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করা হয়।

এদিকে বিশ্বকবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে এবারও পিঠাভোগে চলছে তিন দিনের আয়োজন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি ও রবীন্দ্রসংগীতের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হচ্ছে কবিগুরুর স্মৃতি।

রূপসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু বাঙালি জাতির গর্ব নন, তিনি বিশ্বসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর জন্মবার্ষিকী আমাদের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। পিঠাভোগের এই ঐতিহাসিক স্থানকে ঘিরে আমরা সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত আয়োজন নিশ্চিত করতে চাই।