

এম রোমানিয়া, ব্যুরো প্রধান, খুলনাঃ খুলনার কয়রা উপজেলা ও সুন্দরবন সংলগ্ন নদীপাড়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে মৌবাক্সভিত্তিক আধুনিক মধু চাষের এক নতুন সম্ভাবনা।
এক সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনভিত্তিক মৌয়ালদের প্রাকৃতিকভাবে মধু সংগ্রহ করতে হলেও এখন স্থানীয় উদ্যোক্তারা নিরাপদ ও টেকসই পদ্ধতিতে মৌবাক্স বসিয়ে বাণিজ্যিকভাবে মধু উৎপাদনে ঝুঁকছেন।
সুন্দরবনের ফুল, গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোতে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে পরিকল্পিত মৌচাষ। স্থানীয়দের দাবি, এসব এলাকার মধুর স্বাদ ও গুণগত মান দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আলাদা এবং অধিক উৎকৃষ্ট।
সরেজমিনে বানিয়াখালী গ্রাম এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর পাড় জুড়ে সারি সারি মৌবাক্স। মৌচাষিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন মধু সংগ্রহ ও মৌবাক্স পরিচর্যায়। তীব্র রোদ থেকে মৌমাছিকে রক্ষা করতে বাক্স গুলোর ওপর খড় ও চটের বস্তা দিয়ে ছাউনি দেওয়া হয়েছে।
মৌচাষি রিফাত হোসেন বলেন, এগুলোই আমাদের মৌমাছির ঘর। সুন্দরবনের বিভিন্ন ফুল থেকে মৌমাছিরা মধু এনে এখানে জমা করে। এখন আর গভীর বনে যেতে হয় না, বনের পাশেই বসে নিরাপদভাবে মধু সংগ্রহ করা যাচ্ছে।
জানা গেছে, সাতক্ষীরা থেকে আসা একদল মৌচাষি বর্তমানে বানিয়াখালী এলাকায় অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন। তাঁদের মোট ৪০০টি মৌবাক্সের মধ্যে ১২০টি রাখা হয়েছে এ অঞ্চলে। মৌচাষিদের ভাষ্য, মৌমাছিরা নদী পেরিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে প্রায় তিন কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়ে ফুলের রেণু ও মধুর রস সংগ্রহ করে।
সম্প্রতি তাঁরা প্রায় তিন মণ মধু সংগ্রহ করেছেন। বর্তমানে সুন্দরবনে কেওড়া ফুল ফোটা শুরু হওয়ায় উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশাবাদী তাঁরা।
মৌচাষি রিফাত হোসেন জানান, ৪০০টি মৌবাক্স পরিচালনায় বছরে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়। গত বছর তাঁদের আয় হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ টাকা। তবে ফুলের মৌসুম শেষ হলে মৌমাছিকে টিকিয়ে রাখতে চিনি খাওয়াতে হয়। প্রতিটি বাক্সে একটি রানী মৌমাছি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রানী না থাকলে শ্রমিক মৌমাছিরা অন্যত্র চলে যায়।
একই চিত্র দেখা গেছে শাকবাড়িয়া নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতেও। সেখানে আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে মৌচাকের ফ্রেম ঘুরিয়ে মধু আলাদা করা হচ্ছে। পরে সেই ফ্রেম আবার বাক্সে ফিরিয়ে দিলে মৌমাছিরা নতুন করে মধু জমাতে শুরু করে।
মঠবাড়ি গ্রাম এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির পেছনে বসানো মৌবাক্স ঘিরে নারী-পুরুষ মিলেই কাজ করছেন। চাক থেকে ফ্রেম বের করে ব্রাশ দিয়ে মৌমাছি সরিয়ে বিশেষ মেশিনে ঘুরিয়ে সংগ্রহ করা হচ্ছে খাঁটি মধু।
কয়রায় অবস্থিত কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মোঃ নাসির উদ্দীন বলেন, এটি অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ। এতে সুন্দরবনের ওপর চাপ কমছে এবং বননির্ভর মৌয়ালদের জীবনের ঝুঁকিও হ্রাস পাচ্ছে।
এ বিষয়ে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, মৌবাক্স ভিত্তিক এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করছে। বনে প্রবেশ ছাড়াই সুন্দরবনের মধু আহরণের নিরাপদ ও টেকসই বিকল্প তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কয়রা ও সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলে মৌচাষ ভবিষ্যতে একটি লাভজনক শিল্পে পরিণত হতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :