• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫০ পূর্বাহ্ন

বিআরটিসির ডিজিএম আশরাফুল আলমের দুর্নীতির সাম্রাজ্য : ট্রাক ডিপোতে কোটি কোটি টাকা লোপাট, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও নারী কর্মী সরবরাহের অভিযোগ পর্ব-২


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ৯:২২ পূর্বাহ্ন / ৮
বিআরটিসির ডিজিএম আশরাফুল আলমের দুর্নীতির সাম্রাজ্য : ট্রাক ডিপোতে কোটি কোটি টাকা লোপাট, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও নারী কর্মী সরবরাহের অভিযোগ পর্ব-২

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকাঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চলতি দায়িত্বে থাকা ডিজিএম মো. আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দালালি, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

১৯৯৯ সালে ইন্সপেক্টর পদে চাকরি শুরু করা এই কর্মকর্তা ধাপে ধাপে ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুতে পৌঁছেছেন এবং বিভিন্ন ডিপো ও ওয়ার্কশপে দায়িত্ব পালনকালে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগকারী সূত্র ও অভ্যন্তরীণ নথি অনুসারে জানা যায়, তিনি শুধু ব্যক্তিগত ভাবে দুর্নীতি করেননি, বরং বিআরটিসিতে একটি বিশাল কর্মকর্তা সিন্ডিকেট গড়ে তুলে ডিপো প্রধানদের নিয়োগ ও বদলি থেকে শুরু করে চেয়ারম্যানের পক্ষে মাসোহারা আদায় পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি। তার এই কর্মকাণ্ডে বিআরটিসির রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সাধারণ শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

মো. আশরাফুল আলমের চাকরী জীবন শুরু হয় ১৯৯৯ সালে ইন্সপেক্টর পদে। ২০০৩ সালে তিনি সিনিয়র ইন্সপেক্টর থেকে ম্যানেজার (কারিগরি) পদে আত্মীকরণ হন। এরপর আর কোনো নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ না থাকায় ২০১৭ সালে চলতি দায়িত্বে ডিজিএম পদ পান। তার প্রথম বড় দুর্নীতির অ্যাসাইনমেন্ট ছিল বিআরটিসির কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানা, গাজিপুরে পদায়ন কালে।

২০০৯ সালে সরকার ৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করে ভলভো বাস মেরামতের জন্য। কিন্তু সেই প্রকল্পে ভলভো বাসের পরিবর্তে বিআরটিসির অন্য বাস (দ্বিতল-টিসি) মেরামতে কনভার্ট করা হয় এবং এতে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।

এই অনিয়মের বিষয়ে ২০ জুন ২০১৯ তারিখে কর্মচারীদের পক্ষে মো. নজরুল ইসলাম একটি অভিযোগ দায়ের করেন। মন্ত্রণালয় থেকে ২১ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে পত্র নং-৩৫.০০.০০০০.০১৩.৯৯.০২৪.১৮-১৫১ ইস্যু হয়। প্রকল্প ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতির খবর থাকলেও তিনি তা সফলভাবে মোকাবিলা করে বিআরটিসির দুর্নীতির নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন।

এরপর থেকে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। গাজিপুর বাস ডিপো, জোয়ারসাহারা বাস ডিপো, মতিঝিল বাস ডিপো, কল্যাণপুর বাস ডিপো, কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানা তেজগাঁও, কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তেজগাঁও এবং ঢাকা ট্রাক ডিপোতে পোস্টিং নিয়েছেন তিনি। তার মাধ্যমেই ডিপোর ইউনিট প্রধানের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি বিআরটিসির চেয়ারম্যান মো. জসিম, মো. মিজানুর রহমান, মো. ফরিদ ভূইয়া, এহসানুল এলাহি, মো. তাজুল ইসলাম এবং বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আব্দুল লতিফ মোল্লার একমাত্র ভরসার পাত্র হয়ে উঠেন। তাদের সকল অপকর্মের সহযোগী হিসেবে আশরাফুল কাজ করছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

ডিজিএম আশরাফুল আলমের রয়েছে বিশাল কর্মকর্তা সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা হলেন, বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যানের পিএস মো. মোহাইমিন সজিব, বরিশাল ডিপোর ম্যানেজার মো. জুলফিকার (ট্রাফিক অফিসার), খুলনা ডিপোর ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামান (সিনিয়র ইন্সেটেক্টর), টুঙ্গিপাড়া ডিপোর ম্যানেজার মো. জামসেদ আলী, রংপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. জুলফিকার আল ভুইয়া (সিনিয়র ইন্সটেক্টর), মতিঝিল ডিপোর ম্যানেজার মো. শাহিদুল, দিনাজপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. মোস্তাফিজুর (ম্যানেজার কারিগরি), ময়মনসিংহ ডিপোর ম্যানেজার মো. এনামুল, গাজিপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. মোশাররফ (হিসাব অফিসার), সোনাপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. রাজু মোল্লা, কুমিল্লা ডিপোর ম্যানেজার মো. আব্দুল কাদের জিলানি, নরসিংদী ডিপোর ম্যানেজার মো. নূর এ আলম (হিসাব অফিসার), সিলেট ডিপোর ম্যানেজার মো. রুকনুজ্জামান, মিরপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. ওমর ফারুক মেহেদী, কল্যাণপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. শাহরিয়ার বুলবুল, গাবতলী ডিপোর ম্যানেজার মো. নায়েব আলী এবং ঢাকা ট্রাক ডিপোর ম্যানেজার মো. মোশাররফ হোসেন সিদ্দিকি (ইন্সেটক্টর)।

এছাড়াও বিআরটিসির প্রধান কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে আরও ১০-১২ জন কর্মকর্তা রয়েছেন, যাদের মধ্যে মো. মনিরুজ্জামান (ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম) অন্যতম। আশরাফুলের ক্ষমতা এতটাই বেশি যে তিনি গাজিপুর ওয়ার্কশপ ও ডিপো ব্যতীত ঢাকার বাইরে বা প্রধান কার্যালয়ে কখনো পদায়িত হননি। ঢাকার ভিতরে ডিপো, ওয়ার্কশপ, প্রশিক্ষন কেন্দ্রের দ্বায়িত্বে থাকলেও তার অফিসের সিংহভাগ সময় কাটে প্রধান কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে।

আশরাফুল আলম গাজিপুর, জোয়ারসাহারা, মতিঝিল, কল্যাণপুর, ওয়ার্কশপ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে জানুয়ারি ২০১৩ থেকে ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত আট বছরে দায়িত্ব পালন কালে কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা লোপাট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আশরাফুল আলমের বিষয়ে বিস্তারিত লিখতে শত পৃষ্ঠা লাগবে। তার ঢাকা ট্রাক ডিপোতে ফেব্রুয়ারি ২০২১ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত চার বছরের দুর্নীতি-অনিয়মের চিত্র আরও স্পষ্ট। এই সময়ে ঢাকা ট্রাক ডিপোর রাজস্ব অর্জন ছিল ২৮৩ কোটি ৮৫ লাখ ২২ হাজার টাকা। এর মধ্যে (সম্ভবত চলাচল বা অনুরূপ) থেকে আয় ২৪-২৫ কোটি টাকা এবং অবশিষ্ট ২৫৮-২৬০ কোটি টাকা প্রাতিষ্ঠানিক আয়। মোট আয়ের বিপরীতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৪৮ কোটি ৯ লাখ টাকা, যা মোট আয়ের ৮৭.৪০ শতাংশ। উদ্বৃত্ত বা নীট লাভ দেখানো হয়েছে ৩৫ কোটি ৭৬ লাখ ২২ হাজার টাকা, যা মোট আয়ের ১২.৬০ শতাংশ। মাসিক নীট লাভ ৭৪ লাখ ৫০ হাজার ৪৫৮ টাকা। ব্যয়ের ২৪৮ কোটি ৯ লাখ টাকার মধ্যে জ্বালানি খাতে ব্যয় ১০৭ কোটি ৪৫ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৯ টাকা, যা মোট আয়ের ৩৭.৮৬ শতাংশ। তার সময়কালে মাসিক বেতন ৫০ থেকে ৮০ লাখ টাকা ছিল, যা পরে কোটি টাকায় উন্নীত হয়। তাতে বর্তমান সময়ে গড়ে ৫০-৫৫ লাখ টাকা নীট লাভ হওয়ার কথা। কিন্তু পরবর্তী ইউনিট প্রধানের জানুয়ারি ২০২৫ থেকে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ১১ মাসের নীট লাভ ৮ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫২ টাকা, মাসিক গড় ৭৭ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৬ টাকা।

বর্তমান ইউনিট প্রধানের ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত আট মাসে নীট লাভ ৭ কোটি ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, মাসিক গড় ৮৯ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা। মাসে শুধু বেতন বাড়লে ১০-২০ লাখ টাকা। অন্য খরচের বিষয় গুলো বিবেচনায় না নিলেও এই অবস্থা। আশরাফুলের পরে দুইজন ইউনিট প্রধান যে ঈমানদার তা নয়, এখনও এই ডিপোতে মাসে ৫০ লাখ টাকার মতো দুর্নীতি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

যন্ত্রাংশ খাতে জানুয়ারি ২০২১ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত মেরামত ব্যয় ৯ কোটি ৪৯ লাখ ১ হাজার ৮১১ টাকা। এর মধ্যে ডিসেম্বর ২০২২-এর পূর্ববর্তী সময়ে যন্ত্রাংশের পরিমাণ ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৮৯ হাজার ৭১১ টাকা। ডিসেম্বর ২০২২ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ৬ কোটি ১১ লাখ ১২ হাজার ১০০ টাকা, পরিশোধ ৫ কোটি ৩৪ লাখ ৬১ হাজার ৬২৭ টাকা এবং ভ্যাট-ট্যাক্স ৭৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৩ টাকা।

যন্ত্রাংশের মধ্যে ক্লাস প্লেটের তুলনামূলক মূল্যবৃদ্ধি দেখলেই দুর্নীতির পরিমাণ আন্দাজ করা যায়। ১০ মার্চ ২০২২-এ একটি ক্লাস প্লেট ছিল ৮ হাজার ৫০০ টাকা, ক্রয় করা হয় বাংলাবাজার, ঢাকার আইচার মটরস থেকে। ২৭ মার্চ ২০২২-এ একই যন্ত্রাংশ ১৩ হাজার ৩০০ টাকায় ক্রয় করা হয় বাংলাবাজারের মিজান মটরস থেকে (টেন্ডার ছাড়া)। ১৪ জুন ২০২৩-এ তা আরও বেড়ে ১৬ হাজার ৩৫০ টাকা হয়। আবারও মিজান মটরস থেকে (টেন্ডারের মাধ্যমে)। ডিপোর প্রতিটি যন্ত্রাংশ ক্রয়ের চিত্রই এমন। ভুয়া ভাউচার ও নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ক্রয়ের বিষয়তো আছেই।

আশরাফুল ট্রাক ডিপোতে তার দায়িত্বকালীন সময়ে ৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকার যন্ত্রাংশ ব্যয়ের অর্ধেকই দুর্নীতি ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এখনও নগদ টাকায় ভালো মানের একটি ক্লাস প্লেট ৭-৮ হাজার টাকায় ক্রয় করা যায়। টায়ার খাতে জানুয়ারি ২০২১ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ব্যয় ১০ কোটি ৪২ লাখ ৫১ হাজার ৯৮৮ টাকা। ডিসেম্বর ২০২২-এর পূর্ববর্তী সময়ে টায়ারের পরিমাণ ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩৬ হাজার ৯০০ টাকা। ডিসেম্বর ২০২২ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ৫ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার ৮৮ টাকা। ১৫ মার্চ ২০২২-এ একটি ১০.০০-২০ এমআরএফ টায়ার ক্রয় করা হয় প্রতিটি ২৭ হাজার টাকায়, বাংলাবাজারের নোমান এন্টারপ্রাইজ থেকে (টেন্ডার ছাড়া)। ২২ জুন ২০২৩-এ একই টায়ার ৩৩ হাজার ৫০০ টাকায় ক্রয় করা হয় একই প্রতিষ্ঠান থেকে। ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ তা ৩৮ হাজার ১৫০ টাকায় উন্নীত হয়, আবারও নোমান এন্টারপ্রাইজ থেকে (টেন্ডারের মাধ্যমে)। টেন্ডারের নামে প্রতি টায়ারে ১-১.৫ বছরের ব্যবধানে ১০-১২ হাজার টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। মূলত কীভাবে দুর্নীতি করতে হয়, তা আশরাফুল জানেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

জ্বালানি খাতে বাসের রক্ষণাবেক্ষণ লগ বই ও ট্রাফিক বিভাগ কর্তৃক জ্বালানি লগ বইয়ে কিলোমিটার পার্থক্য দেখিয়ে আশরাফুল চার বছরে কয়েক কোটি টাকা লোপাট করেছেন, যা ডিপোর রেকর্ড বইয়ে প্রমাণিত বলে দাবি করা হয়েছে।

জ্বালানি, মেরামত, টায়ারের বাইরে আরও তিনটি বড় খাত হলো সরকারি পণ্যে ভ্যাট ও ট্যাক্স, যা সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি কর্তনযোগ্য। টোল/ফেরি খাতে মাসে ৪০-৫০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। কিন্তু এই ফেরি/টোলের ব্যয় সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনো রেকর্ড নেই। এই টাকার পুরোটাই ভুয়া, ক্যাশিয়ার কর্তৃক ব্যাংক থেকে নগদ উত্তোলন করা হয় বলে অভিযোগ।

আনলোডিং খাতে মাসে ৪০-৫০ লাখ টাকা ব্যয় (চট্টগ্রাম ট্রাকসহ)। চট্টগ্রাম ট্রাকের আনলোডিং ব্যয় ঢাকা ট্রাক ডিপো কর্তৃক করা হয়। এই খাতে ব্যয় বিবরণীতে যে পরিমাণ ব্যয় দেখানো হয়েছে, তার চেয়ে আশরাফুলের দায়িত্বকালীন সময়ে ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা কম, যা ব্যাংক থেকে সরাসরি উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জ্বালানি, মেরামত, টায়ার, ভ্যাট, ট্যাক্স, টোল, ফেরি আনলোডিংসহ আরও ৪০ থেকে ৫০টি খাতে ডিপোর ব্যয় হয়। প্রত্যেকটি খাতেই কম বেশি দুর্নীতি রয়েছে। এই সকল ব্যয়ের বাইরে খাত বহির্ভূত চেক কেটে নগদ উত্তোলিত কয়েক কোটি টাকার ব্যয়ের কোনো হিসাব নেই।

বর্তমানে মো. আশরাফুল আলম কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানার ডিজিএম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রায় প্রতিদিন তিনি প্রধান কার্যালয়ে আসেন তার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও ইউনিট প্রধান বদলি বাণিজ্যের ধারা অব্যাহত রাখতে।

তবে তার প্রতিপক্ষ একটি গ্রুপও বর্তমানে বেশ সক্রিয়। এই গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন তার একসময়ের শিষ্য মো. মাসুদ তালুকদার। যিনি জোয়ারসাহারা বাস ডিপোর ইউনিট প্রধান। সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে তিনি মনিটরিং করেন এবং মাসিক মাসোহারা আদায়ে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন।

সিন্ডিকেট সদস্যরা ঢাকায় এলে নিয়মিত যোগাযোগের বাইরেও তার তেজগাঁওয়ের দপ্তরে যান। এই দপ্তরে প্রায় প্রতিদিনই প্রধান কার্যালয়ের মো. মনিরুজ্জামান, মো. ফারুক, মো. নায়েব আলী ও চেয়াম্যানের পিএ মো. মোহাইমিন মিলিত হন। ইউনিট প্রধান বদলির প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার হস্তক্ষেপ রয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে জোয়ারসাহারা ও চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ইউনিট প্রধান বদলির ক্ষেত্রে তিনি কিছুটা হোঁচট খেয়েছেন। তার প্রিয় একজন সিন্ডিকেট সদস্য মো. সুলতানকে পরপর দুইবার বদলি আদেশ করেও ব্যর্থ হয়েছেন। এই বদলির পেছনে তার টাকার লেনদেন ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

চেয়ারম্যানের দালালি বিষয়ে একটু পেছনে ফিরে দেখা যায়, মো. জসিম থেকে সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা পর্যন্ত সকল চেয়ারম্যানের চাওয়া-পাওয়া মিটাতে আশরাফুল অতুলনীয়। কোনো চেয়ারম্যান তার প্রতি বিরূপ নন, বরং তাদের মধ্যে অনেকেই তার দপ্তরে এখনও আতিথেয়তার জন্য আসেন। তাদের মধ্যে অন্যতম মো. মিজানুর রহমান।

এছাড়াও অনৈতিক কাজে মহিলা স্টাফ সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য বিআরটিসির মহিলা স্টাফদের ব্যবহারেও তার দ্বিধা নেই। ২০১৭ সালে চেয়ারম্যান মো. ফরিদ এবং ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে সাবেক চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলামের সময়ে এই বিষয়টির চর্চা অনেক বেশি হয়েছে এবং তার দায়িত্বে ছিলেন আশরাফুল আলম। তার দপ্তরে পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কয়েকটি ঘটনার নিষ্পত্তি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিআরটিসির শ্রমিক ও কর্মকর্তা নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার স্বার্থের বিপরীতে বিআরটিসির স্বার্থ নিয়ে কথা বললে তাকে হয়রানির শিকার হতে হয়। এমন অনেক ঘটনাই আছে। তার দপ্তরে হেলাল নামে একজন স্টাফ কাজ করেন। এই হেলাল তার জন্য সব করেছেন, কিন্তু তার ব্যক্তিগত বিষয় সামনে আনলেই তাকে ট্রাক ডিপোতে বদলি করে নিজ দপ্তরে কাজ করাচ্ছেন। তার ট্রাক ডিপোতে দায়িত্বকালীন সময়ে ইয়ার্ডের উন্নয়ন কাজ চলা অবস্থায় ডিএলাই দেখতে গিয়ে কতটুকু ডিএলাই হওয়ার কথা আর কতটুকু হচ্ছে—এ বিষয়ে মন্তব্য করার শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।

সম্প্রতি ৮-৯ মাস আগে ঢাকা ট্রাক ডিপোতে শ্রমিক ও ম্যানেজারের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। এই অসন্তোষের নায়কও মো. আশরাফুল বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিআরটিসির এই শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উঠা দুর্নীতি, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, বদলি বাণিজ্য ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ গুলো সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব ও সুনাম আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
(চলবে)