

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকাঃ রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াতের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে যেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের লুটপাটের ময়দানে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের হওয়া এক অভিযোগ এবং বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ তথ্য সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৬—মাত্র তিন বছরে শুধু এই ডিপোতেই ১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকারও বেশি অপচয়, ক্ষতি ও চুরির অভিযোগ উঠেছে। ভুয়া বিল, জ্বালানি ও ফেরি খরচ ফাঁকি, অগ্রিম ভাতা, টিএ/ডিএ আত্মসাৎ এবং হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ যে ভাবে গিলে খাওয়া হয়েছে, তা প্রতিষ্ঠানটির গভীরে প্রথিত সিন্ডিকেটের চিত্রই তুলে ধরে।

দুদকে দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর রাজস্ব আদায়, জ্বালানি, বায়ু, জমা-রাজস্ব খাত এবং নির্ধারিত ব্যয় নির্বাহের নামে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
অভিযোগকারী বিআরটিসির কেন্দ্রীয় স্টোর অফিসার মো. মোস্তাকিজুর রহমানের দাবি, জ্বালানি, গ্যারেজ, টুলস ও ফেরিসহ বিভিন্ন খাতে এবং প্রথম মাইলেজ ভাতা, দৈনিক ভাতা ও বিবিধ ব্যয়ের নামে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে নগদ উত্তোলন করে প্রায় ১০-১২ কোটি টাকার অপচয়, ক্ষতি ও চুরি ঘটেছে।
ওই তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে এই সময়কালের ৪৩০ পাতারও বেশি তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগে চিহ্নিত প্রধান ব্যক্তিদের মধ্যে অভিযুক্ত মো. কামরুজ্জামান, যিনি সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে ওই ডিপোতে কর্মরত ছিলেন এবং এখন তিনি খুলনা বাস ডিপোতে কর্মরত রয়েছেন। ওই অভিযোগে আরও নাম উঠেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যাশিয়ার মো. আ. করিম এবং হিসাব কর্মকর্তা মো. রমজান হোসেনের। এদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা ও দুদকের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
বিআরটিসির অভ্যন্তরে মো. কামরুজ্জামানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ উঠে আসছিল।
মো. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে, তার শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লায় হওয়ায় তিনি সাবেক এমপি শেখ সেলিমের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং সেই ছত্রছায়ায় বড় বড় ডিপোতে পোস্টিং পেয়েছিলেন।
এছাড়াও পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের স্পিকার শিরিন শারমিন ও আলোচিত-সমালোচিত জামালপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের সাথে ছিলো সখ্যতা। তাদের দুজনের নাম ভাঙ্গিয়ে তিনি বিআরটিসির সাবেক চেয়ারম্যানকে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে ভাল ভাল পোষ্টিং বাগিয়ে নিতেন।

সম্প্রতি তাকে খুলনা বাস ডিপোর দায়িত্ব দেওয়াকে কেন্দ্র করেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কর্মকর্তাদের একাংশ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ ডিপো ও ইউনিটে পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে।
এসব অভিযোগের পক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন এখনও প্রকাশিত না হলেও বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ তথ্য ও দুদকে জমা দেওয়া নথিপত্রে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর আর্থিক অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জ্বালানি তেল ও ফেরি বিল, গ্যারেজ শ্রমিকের মজুরি, মাইলেজ বিল, দৈনিক ভাতা এবং টিএ/ডিএর নামে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে নগদ উত্তোলন করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে ডিপোর রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা তিনি এই সিন্ডিকেটের বতর্মান প্রধান বলে একটি বিশ্বস্থ সুত্র নিশ্চিত করেছে।
বিআরটিসিতে ফ্যাসিস্ট চেয়ারম্যান থাকলেই এরকম একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট টিকে থাকা সম্ভব। বিগত দিনের দুর্নীতির একটি ভাগ বতর্মান চেয়ারম্যানকে দিতে হয়েছে। সকল অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে তিনি।তাই তার কর্মকর্তারাও দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে। বতর্মান সরকারের উচিৎ খুব দ্রুত সময়ের ভেতর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
চেয়ারম্যান নিজেই এই প্রতিষ্ঠানটি থেকে লুটপাটের স্বীকৃতি দিয়েছেন নিজে অর্থনৈতিক সুবিধা নেয়ার জন্য।
পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ন্যাক্কার জনক ভাবে বিদায় নিলেও বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের এক নেতার জামাতা। এই সিন্ডিকেট যে ক্ষমতার পালাবদলের পরও টিকে আছে। এমন চেয়ারম্যান পাওয়াতেই তা স্পষ্ট। অনেক ডিপোতে এখনও সেই সময়ের অবৈধ লিজ ও অবৈধ কাউন্টার এবং তাহার ব্যবস্থাপনা এখনো বহাল রয়েছে।
অপরদিকে একটি বিশ্বস্থ সুত্রে জানা যায়, বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা মাসে বিভিন্ন ডিপো থেকে ৩ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকা মাসিক মাসোয়ারা হিসেবে ম্যানেজারদের কাছ থেকে আদায় করে থাকেন।
আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মা দুর্নীতির বরপুত্র বর্তমান বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লাকে কোন ম্যানেজারা টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলেই ডিপোর ম্যানেজারের চেয়ার কেড়ে নেয়ার ভয় দেখানো শুরু করেন। ভয়ে মাসিক মাসোয়ারার টাকা দিতে বাধ্য হয় ম্যানেজাররা।
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার দাবি এই টাকা তিনি একানেন না বিএনপির এমপি, মন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়। তার এই চেয়ার টিকানোর জন্য। একথা গুলো ম্যানেজারদের সাথে সরাসরি বলে থাকেন চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ডিপো ম্যানেজার বলেন, চেয়ারম্যান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পরিবারের লোক তাই সকল সুবিধা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লোক জনকেই দিয়ে থাকেন। তিনি মুখে মুখে বিএনপি হলেও অন্তরে তিনি প্রকৃত আওয়ামী লীগ। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক নেতার জামাতা হলেও বিএনপির এমপি, মন্ত্রীদের কথা বলে সকল ডিপো ম্যানেজারদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে থাকেন। অথচ সেই টাকা নিজেই ভোগ করেন।
একাধিক সুত্রের দাবি, মাসিক মাসোয়ারার পরেও ভিন্ন ভিন্ন খাদত অর্থ বরাদ্দ করে সেই অর্থও হাতিয়ে নিচ্ছে আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মা দুর্নীতির বরপুত্র বর্তমান বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা।
বিগত বছর গুলোতে আন্তর্জাতিক বানিজ্য মেলায় অপারেটিং ব্যায় খরচ নির্বাহের জন্য ধরা হতো ১৫ লক্ষ টাকা। কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যান সেখানে (আন্তর্জাতিক বানিজ্য মেলায় অপারেটিং ব্যায় খরচ নির্বাহের জন্য ৫৭ লক্ষ ৫৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছেন।) অথচ মাত্র ৬ লক্ষ টাকাও খরচ হয়।
চেয়ারম্যানের রুমের ডেকারেশনের বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৫৬ লক্ষ টাকা। অথচ ভাউচার দিয়ে চেয়ারম্যানের পকেটে ঢুকেছে ৪০ লক্ষ টাকা। সাবেক চেয়ারম্যানগন যে রুমে অফিস করেছেন সেই রুমের ডেকোরেশনের জন্য ৫৬ লক্ষ টাকা বাজেট করে খরচ করেছেন। অথচ সেই রুমে বসেই বিআরটিসির সাবেক চেয়ারম্যানগন দায়িত্ব পালন করেছেন।
মাসিক মাসোয়ারা বাদে ও বর্তমানে ভিন্ন ভিন্ন খাদে অর্থ বরাদ্দ করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা।
বিআরটিসির চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর এই অভিযোগ কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়মের চিত্র নয়। এটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ছত্রছায়া, হিসাব জালিয়াতি এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক লুটপাটের একটি বড় চিত্র।
দুদকে দায়ের করা অভিযোগ এবং টিআইবিসহ বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা মিলে একই সত্যকেই তুলে ধরছে বিআরটিসিকে গিলে খাওয়া সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয়। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানকে জনগণের সেবায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে এখন।
এ সকল বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন খাতের দুর্নীতি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা ও মেধাকে উপেক্ষা করে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে লোক বসানো গুরুতর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শামিল।
এ ধরনের সিন্ডিকেট ভিত্তিক নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক শৃঙ্খলাই ভেঙে দেয় না, জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার ওপর জনগণের আস্থাকেও মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
টিআইবির এক গবেষণায় দেখা গেছে,পরিবহন খাতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সিন্ডিকেটই অনিয়ম-দুর্নীতির মূল কারণ। প্রাইভেট খাতে বছরে অন্তত এক হাজার কোটি টাকারও বেশি চাঁদা ও ঘুষ আদায় হয়। যার বড় অংশ রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পকেটে যায়। বিআরটিএ ইতোমধ্যে দুর্নীতির তালিকায় শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে অন্যতম। বিআরটিসির মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় একই ধরনের রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও হিসাব জালিয়াতি চললে জনগণের আস্থা আরও ক্ষুণ্ন হবে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থনীতিবিদ ও সুশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিআরটিসির মতো প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করা সম্ভব নয়।
একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, যখন কোনো কর্মকর্তা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে লাভজনক পদে বহাল থাকেন এবং হিসাবের জালিয়াতি চলে, তখন তা ব্যক্তিগত দুর্নীতির পর্যায় পেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংকট তৈরি করে। দুদক ও বিভাগীয় তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
আরেকজন বিশ্লেষকের মতে, ক্ষমতার পালা বদলের পরও পুরনো সিন্ডিকেট যদি বহাল থাকে, তাহলে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অর্থহীন হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত মো. কামরুজ্জামানের বক্তব্য জানার জন্য তাকে একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।
পরবর্তীতে তার মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোন উত্তর দেননি। ফলে তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া সম্ভব হয়নি।
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনিও ফোন রিসিভ করেনি। পরবর্তীতে তার মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোন উত্তর দেননি। ফলে তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া সম্ভব হয়নি।
আপনার মতামত লিখুন :