• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৬ অপরাহ্ন

নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ’র বেহাল অবস্থা : সহকারী পরিচালক মাহবুবুর রহমান রয়েছে কেন্দ্রবিন্দুতে


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২২, ২০২৬, ৫:১৭ অপরাহ্ন / ১৯
নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ’র বেহাল অবস্থা : সহকারী পরিচালক মাহবুবুর রহমান রয়েছে কেন্দ্রবিন্দুতে

বিশেষ প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জঃ গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সনদ কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্স—সরকারি ফি জমা দিয়ে নির্ধারিত নিয়মে সেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) জেলা কার্যালয়ে এসব সেবা নিতে গিয়ে নির্ধারিত ফির বাইরেও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছালে জটিলতা কমে, আর সরাসরি সেবা নিতে গেলে নানা অজুহাতে আটকে যায় ফাইল।

এই অভিযোগের কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছেন বিআরটিএ নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মাহবুবুর রহমান।

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, তাঁর কার্যালয়ে রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মালিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন সেবায় ‘সিগনেচার’ অনুযায়ী এক হাজার টাকা থেকে শুরু করে সেবাভেদে লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঘিরে একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ, অর্থ লেনদেনের নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়া যায়নি।

এ সকল অভিযোগ অস্বীকার করে মাহবুবুর রহমান দাবি করেছেন, নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ে কোনো দালাল নেই এবং এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত নন।

বিআরটিএর সেবা কাঠামো অনুযায়ী, মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সনদ, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, শিক্ষানবিশ লাইসেন্স, রুট পারমিট এবং ট্যাক্স টোকেনের মতো সেবা নির্ধারিত নিয়ম ও ফি অনুসারে দেওয়ার কথা।

রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই, ফি জমা এবং মোটরযান পরিদর্শনের পর বিধি অনুযায়ী অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া রয়েছে। ফিটনেস সনদের ক্ষেত্রেও গাড়ি পরীক্ষা করে উপযুক্ত বিবেচিত হলেই সনদ দেওয়ার কথা। ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য রয়েছে নির্ধারিত আবেদন, পরীক্ষা, বায়োমেট্রিক ও ফি জমা দেওয়ার ধাপ।

কিন্তু ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ে এসব প্রক্রিয়ার মধ্যেই কৃত্রিম জটিলতা তৈরি করা হয়। সরাসরি আবেদন করতে গেলে কাগজপত্রে ত্রুটি দেখানো, ফাইল আটকে রাখা কিংবা বারবার অফিসে আসতে বলার অভিযোগ রয়েছে। পরে দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে সেই জটিলতা দ্রুত সমাধানের পথ খুলে যায় বলে দাবি তাঁদের।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এ ভাবে সেবাপ্রার্থীদের একপর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়। ফলে সরকারি ফি দিয়ে সেবা পাওয়ার পরিবর্তে তাঁদের বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।

অভিযোগে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামঃ সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগে সহকারী পরিচালক মাহবুবুর রহমানের পাশাপাশি মোটরযান পরিদর্শক উসমান গনি , মোটরযান পরিদর্শক সাখায়াত হোসেন এবং সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. হেমায়েত হোসাইনের নাম এসেছে। এ ছাড়া উচ্চমান সহকারী ও অফিস সহায়ক পর্যায়ের কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধেও দালাল চক্রকে সহযোগিতার অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সেবা প্রার্থীদের কাগজপত্র যাচাইয়ের সময় সম্ভাব্য ত্রুটি বা জটিলতার বিষয়টি সামনে আনেন। এরপর দালালরা দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করার বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয় বলে দাবি অভিযোগকারীদের।

তবে নাম আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যেকের ভূমিকা, তাঁদের মধ্যে অর্থ লেনদেনের সম্পর্ক কিংবা অভিযোগে বর্ণিত সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের প্রত্যেকের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ পরিবহন খাতের গুরুত্বপূর্ণ সেবা। গাড়ির বৈধ কাগজপত্র নিশ্চিত করতে এসব সেবা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় দেওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ে এই প্রক্রিয়াকে ঘিরেই দালালনির্ভর একটি বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

তাঁদের অভিযোগ, সরাসরি আবেদনকারীরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও নানা জটিলতার মুখে পড়েন। অন্যদিকে, দালালের মাধ্যমে গেলে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

ফিটনেস সনদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি জমা দিয়ে মোটরযান পরীক্ষা করানোর পর উপযুক্ত বিবেচিত হলে সনদ দেওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে সেবা পেতে বিলম্ব হয়।

ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও দালাল নির্ভরতার অভিযোগ করেছেন সেবাপ্রার্থীদের কেউ কেউ।

তাঁদের ভাষ্য, নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করার পরও কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত অর্থের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট আবেদন নম্বর, লেনদেনের নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট সেবাগ্রহীতাদের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তুলেছেন অভিযোগকারীদের কেউ কেউ। তাঁদের দাবি, ঢাকায় তাঁর দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া গ্রামের এলাকায় নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে সম্পদ থাকার অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব সম্পদের মালিকানা, মূল্য, অর্থের উৎস কিংবা বৈধতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিল, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী ও অন্যান্য আর্থিক তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

২০২৫ সালে দুদকের অভিযানের তথ্যঃ অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসে নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, অভিযানের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সতর্ক হয়ে যাওয়ায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।

তবে অভিযানের সুনির্দিষ্ট বিষয়, অভিযানে কী পাওয়া গিয়েছিল, কারও বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধান বা মামলা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে নিশ্চিত নথি পাওয়া যায়নি। তাই ওই অভিযানের সঙ্গে বর্তমানে ওঠা অভিযোগগুলোর সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এর আগে বিআরটিএর সদর দপ্তর থেকে অনিয়ম ও দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি। পরে তিনি দাবি করেন, নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ে কোনো দালাল নেই এবং এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত নন।

তাঁর এই বক্তব্যের বিপরীতে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলেছে। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে শুধু বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে সেবার আবেদন, ফাইল নিষ্পত্তির সময়, সরকারি ফি জমার রসিদ, অভিযোগকারীদের সাক্ষ্য এবং অর্থ লেনদেনের সম্ভাব্য প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।

নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে নয়; সরকারি সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দালালনির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

একই সঙ্গে প্রতিটি সেবার নির্ধারিত ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা ও অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি কার্যালয়ে স্পষ্টভাবে প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা। আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে অনুমোদন ও সনদ প্রদান পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ডিজিটাল ব্যবস্থায় অনুসরণযোগ্য হলে অযৌক্তিক বিলম্ব এবং অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের সুযোগ কমতে পারে।

তবে সবচেয়ে জরুরি হলো অভিযোগ গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। নথি যাচাই, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আনা গেলে দায়ীদের শনাক্ত করা এবং সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।