• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ন

ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের ডিডি ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দৈনিক ১০ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২২, ২০২৬, ৫:০৬ অপরাহ্ন / ২৯
ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের ডিডি ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দৈনিক ১০ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে মানবসেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগে একের পর এক অনিয়ম ও অনৈতিক অর্থ লেনদেনের তীব্র অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের প্রধান তীর অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের উপ পরিচালক (ডিডি) মো. ছালেহ উদ্দিনের দিকে। তাঁর বিরুদ্ধে লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্ট অনুমোদন, সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ আটকে রাখা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগসহ ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক দাবি সামনে এসেছে।

তবে এসব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বিষয়টি হলো—কথিতভাবে ঘুষের হিসাব সরাসরি টাকার অঙ্কে না লিখে বিভিন্ন ‘কোড’ ব্যবহার করে একটি বিশেষ ডায়েরিতে সংরক্ষণ করা। সংগৃহীত অর্থের হিসাব মিলিয়ে তেজগাঁও এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে, যা একটি সেবামূলক জরুরি প্রতিষ্ঠানে চরম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধ অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া আড়াল করতে একটি কৌশল অবলম্বন করা হয়।

কোডভিত্তিক হিসাবঃ সংগৃহীত অর্থের হিসাব সরাসরি টাকায় না লিখে বিভিন্ন সাংকেতিক ‘কোড’-এর মাধ্যমে গোপন ডায়েরিতে লেখা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি কোডের বিপরীতে আনুমানিক ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ধরা হয়।

পিএ জাকিরের ভূমিকাঃ কথিত এই ডায়েরিটি ডিডি ছালেহ উদ্দিনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) হিসেবে পরিচিত জাকিরের কাছে সংরক্ষিত থাকে।

দিন শেষে সেটেলমেন্টঃ সারাদিনের সংগৃহীত অর্থ দিন শেষে কোড মিলিয়ে হিসাব চুকানো হয়। এরপর বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের বড় একটি অংশ গাড়িতে করে তেজগাঁও এলাকায় ছালেহ উদ্দিনের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয় বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

জননিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ফায়ার লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্ট ঘিরে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ হাজার বর্গফুট ফ্লোর সংযোজনের জন্য ৫ হাজার টাকা এবং ফায়ার রিপোর্টের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কমিশন আদায়ের একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। দাবি করা কমিশন বা অর্থ না পেলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র আটকে রাখা হয় এবং রিপোর্টে স্বাক্ষর না করে কালক্ষেপণ করা হয়। জনস্বার্থ ও ভবনের নিরাপত্তাসংক্রান্ত এই স্পর্শকাতর সেবায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনৈতিক লেনদেন হয় বলে এক অভিযোগকারী দাবি করেছেন।

ডিডি ছালেহ উদ্দিনের পদোন্নতি এবং ঢাকা বিভাগে আগমন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

সরকারি গেজেট অনুযায়ী সহকারী পরিচালক থেকে উপপরিচালক বা সমমানের পদে তাঁর পদোন্নতি হয়। তবে অভিযোগকারীদের দাবিঃ পদোন্নতির পূর্বে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে তাঁর বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ ছিল। পদোন্নতি পাওয়ার পর ঢাকা বিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রেও প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তদবির ও বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় এবং বদলি-নিয়োগ বাণিজ্যে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত নুর উদ্দিন আনিস ও সহকারী পরিচালক আনিসের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ছালেহ উদ্দিনের দায়িত্বকালে নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার সরকারি কেনাকাটা সম্পন্ন করা হয়েছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, স্টেশনারি ও গাড়ির পাম্পের খরচ অন্য খাতে দেখিয়ে, বিশেষ করে ‘আসবাবপত্র’ ক্রয়ের হিসাব বানিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

এর ফলে ঢাকা বিভাগের বেশ কয়েকটি ফায়ার স্টেশনে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যানবাহনের নিবন্ধন এবং কর্মচারীদের খাবারের বিল আটকে গিয়ে চরম প্রশাসনিক ও পরিচালনাগত সংকট দেখা দিয়েছে।

বারিধারা ফায়ার স্টেশনের জ্বালানি বিল বকেয়া পড়ায় স্থানীয় ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি সরবরাহ বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে, যা যে কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনায় জরুরি সেবা ব্যাহত করার বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।

অধীনস্থ সিনিয়র স্টেশন অফিসার ও ডিস্ট্রিক্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টরদের (ডিএডি) কাছ থেকে নিয়মিত ‘মাসোহারা’ বা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ না করলে ছুটি আটকে দেওয়া বা বিভিন্ন প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

বিশেষ করে সম্প্রতি সিনিয়র স্টেশন অফিসারদের সাপ্তাহিক ছুটি মঞ্জুর না করা নিয়ে বিভাগে চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

এসব গুরুতর অভিযোগের সত্যতা ও প্রতিক্রিয়া জানতে ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিনের মুখোমুখি হলে তিনি কোনো ধরনের বক্তব্য বা মন্তব্য দিতে রাজি হননি।

অভিযোগগুলো মূলত প্রশাসনিক অনিয়ম, অর্থনৈতিক আত্মসাৎ এবং জরুরি সেবার সক্ষমতা বিনষ্টের সাথে সম্পর্কিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো আগাম সিদ্ধান্ত না টেনে কথিত ডায়েরির অস্তিত্ব, ক্রয় সংক্রান্ত বিল-ভাউচার, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলোর প্রশাসনিক নথি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি। ফায়ার সার্ভিসের মতো সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জন আস্থা ও স্বচ্ছতা রক্ষা করতে হলে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।