• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৫ অপরাহ্ন

২,৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পে তুঘলকি কাণ্ড : বঙ্গবন্ধু পরিষদ নেতাকে খুলনা ওয়াসার পিডি নিয়োগ ঘিরে তীব্র বিতর্ক


প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫, ৮:২৩ অপরাহ্ন / ২৪৫
২,৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পে তুঘলকি কাণ্ড : বঙ্গবন্ধু পরিষদ নেতাকে খুলনা ওয়াসার পিডি নিয়োগ ঘিরে তীব্র বিতর্ক

খুলনা অফিসঃ নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ–২)-এ প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে খুলনা ওয়াসায় সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন বিতর্ক ও অস্থিরতা। কোনো নিয়োগ পরীক্ষা কিংবা বোর্ড সভা ছাড়াই মাত্র এক দিনের মধ্যে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই সাবেক এমপি শেখ জুয়েলের ঘনিষ্ঠজন এবং বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা হিসেবে পরিচিত।

গত বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) বিকেলে প্রস্তাব পাঠানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সন্ধ্যায় আদেশ জারি হলে খুলনা ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হতবাক হয়ে পড়েন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ওয়াসা ভবনে চরম অসন্তোষ, বিভাজন ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।

বিধি উপেক্ষা করে নিয়োগঃ ওয়াসা সূত্র জানায়, এ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে ন্যূনতম ৪র্থ গ্রেডের প্রকৌশলী থাকার বিধান থাকলেও রাজনৈতিক তদবির ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের মধ্যেই ৬ষ্ঠ গ্রেডের একজন প্রকৌশলীকে পিডি (রুটিন দায়িত্ব) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে সংস্থার ভেতরে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। একাংশ এই নিয়োগে সন্তুষ্ট থাকলেও বড় একটি অংশ একে নীতিবহির্ভূত ও রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

ফোকাল পার্সন বহাল রেখেই নতুন পিডিঃ খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ–২) এর প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয় ৯ ডিসেম্বর। বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ অক্টোবর ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত।

এই প্রকল্পের ফোকাল পার্সন হিসেবে ২০২৩ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন পিইঞ্জ, যিনি এডিবির সঙ্গে সব ধরনের সমন্বয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ না করেই হঠাৎ নতুন পিডি নিয়োগ দেওয়ায় দুই প্রকৌশলীর মধ্যে শুরু হয়েছে ঠাণ্ডা লড়াই, যার প্রভাব পড়েছে পুরো ওয়াসা জুড়ে।

নিয়োগ বোর্ডেই ডাকা হয়নিঃ অভিযোগ রয়েছে, পিডি পদে খুলনার চারজন প্রকৌশলী আবেদন করেন—

সেলিম আহমেদ (৫ম গ্রেড), মো. কামাল হোসেন পিইঞ্জ (৫ম গ্রেড), মো. রেজাউল ইসলাম (৬ষ্ঠ গ্রেড)
আরমান সিদ্দিকী (৬ষ্ঠ গ্রেড)। কিন্তু তাদের কাউকেই নিয়োগ বোর্ডে ডাকা হয়নি। এরপরও রহস্যজনকভাবে মো. রেজাউল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

আদেশে তথ্যগত বিভ্রান্তিঃ স্থানীয় সরকার বিভাগ পরিকল্পনা–৩ শাখার উপ-সচিব ইবাদত হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়—খুলনায় গ্রেডভুক্ত কর্মকর্তা না থাকায় ৬ষ্ঠ গ্রেডভুক্ত একমাত্র কর্মকর্তা হিসেবে মো. রেজাউল ইসলামকে পিডি (রুটিন দায়িত্ব) দেওয়া হলো। কিন্তু বাস্তবে খুলনা ওয়াসায় ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ কর্মরত রয়েছেন। আদেশে এই তথ্যগত বিভ্রান্তি নিয়েই বড় প্রশ্ন উঠেছে।

এমডি যোগদানের দিনই চাপঃ সূত্র জানায়, ১০ ডিসেম্বর খুলনা ওয়াসার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান যোগদান করেন। পরদিন অফিসে এসেই তিনি পড়েন চাপের মুখে। ওই দিন ওয়াসা ভবনে বোর্ড সদস্য ও ছাত্র প্রতিনিধি ইব্রাহিম খলিল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম, এনসিপি নেতা অহিদুজ্জামানসহ কয়েকজন উপস্থিত হন। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়ের নাম ভাঙিয়ে এমডিকে নির্দিষ্ট একটি নাম প্রস্তাব পাঠাতে বাধ্য করা হয়। তাদের চলে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পিডি নিয়োগের আদেশ জারি হয়।

মোটা অঙ্কের লেনদেন’ নিয়ে গুঞ্জনঃ ওয়াসা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, দুই বোর্ড সদস্য ও ছাত্র প্রতিনিধিদের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের লেনদেনের বিনিময়ে এই নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ফাইল নিষ্পত্তি হওয়ায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।

প্রশ্নবিদ্ধ অতীতঃ অভিযোগ রয়েছে, একসময় ছাত্রলীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা মো. রেজাউল ইসলাম ৫ আগস্টের পর নিজেকে ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। বড় কোনো প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে এডিবি অর্থায়িত মেগা প্রকল্পের পিডি করায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিস্ময় ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যঃ ফোকাল পার্সন মো. কামাল হোসেন পিইঞ্জ বলেন, আমাকে কোনো নিয়োগ পরীক্ষায় ডাকা হয়নি। ফোকাল পার্সনের দায়িত্ব ছাড়ার কোনো আদেশও পাইনি।

প্রকৌশলী সেলিম আহমেদ বলেন, আমরা আবেদন করলেও কাউকেই বোর্ডে ডাকা হয়নি।

পিডি মো. রেজাউল ইসলাম দাবি করেন, সকলেরই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তবে অফিসে উপস্থিত না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি ফোন কেটে দেন।

নতুন এমডি মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন,
আমি সদ্য যোগদান করেছি, প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না।

সাংবাদিকদের সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগঃ এ ঘটনায় তথ্য সংগ্রহে রোববার (১৪ ডিসেম্বর) খুলনা ওয়াসা ভবনে গেলে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগ ওঠে। খুলনা প্রেসক্লাবের নির্বাহী সদস্য ও মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম নুর জানান, রেজাউলের দপ্তরে গেলে তিনি কক্ষ ত্যাগ করেন এবং কয়েকজন কর্মচারী সাংবাদিকদের সঙ্গে মারমুখি আচরণ করেন। এতে সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ প্রকল্পঃ বিতর্কিতভাবে মো. রেজাউল ইসলামকে রুটিন দায়িত্বে পিডি করা হলেও ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সচেতন মহলের প্রশ্ন—যে প্রকল্প শুরুতেই রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগে জর্জরিত, তার বাস্তবায়ন কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে?

একাধিক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া হলে খুলনা ওয়াসার ভেতরের এই চাপা ক্ষোভ যে কোনো সময় বিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে।