

বিশেষ প্রতিবেদকঃ মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের একজন সাধারণ তথ্য সহকারী মনিরুল ইসলাম। অথচ তার প্রভাব ও সম্পদের কাছে নতজানু বন্দরের শীর্ষ কর্মকর্তারাও।
পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে প্রভাবশালী মন্ত্রীদের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধভাবে চাকরিতে ঢুকে বন্দরে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছিলেন রাজবাড়ীর পাংশার এই সন্তান। স্ত্রীর নামে বন্দরের জমি দখল করে গড়ে তুলেছেন ১০ কোটি টাকার অট্টালিকা, ফাঁকি দিয়েছেন আয়কর, আর জালিয়াতির মাধ্যমে ছিনিয়ে নিয়েছেন পদোন্নতিও।
আজকের বাংলাদেশ টুয়েন্টিফোর ডটকম পত্রিকার দীর্ঘ সরেজমিন অনুসন্ধান ও দালিলিক প্রমাণে বেরিয়ে এসেছে মোংলা বন্দরের এই ‘হোটেল মনির’-এর দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর সব চিত্র।
মন্ত্রীর ফোনে চাকরি, তারপর দাপটের রাজত্বঃ ব্যাপক অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৩ সালে তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানের সরাসরি হস্তক্ষেপে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এলডিএ কাম কম্পিউটার অপারেটর (১৬তম গ্রেড) পদে বন্দরের চাকুরিতে যোগ দেন মনিরুল ইসলাম। নিয়োগ পরীক্ষায় নির্ধারিত টাইপিং গতি না থাকলেও মন্ত্রী-এমপিদের প্রভাব খাটিয়ে চাকরি বাগিয়ে নেন তিনি। এরপর থেকেই শুরু হয় তার দাপট।
ডিজিটাল হাজিরা ফাঁকি দিয়ে এক মাসের স্বাক্ষর একদিনে ম্যানুয়াল খাতায় করার অভিযোগ পর্যন্ত রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার ভয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পর্যন্ত বিনীত স্বরে জানতে চাইতেন—আপনি আজকে কি আসবেন? একটু দেখা করতেন। ডিজিএফআই, এনএসআই, থানা পুলিশ ও বন্দর চেয়ারম্যান তার পকেটে—এমন ভয় দেখিয়ে অফিসে টেন্ডারবাজি ও ত্রাসের রাজত্ব চালাতেন তিনি।
মেসের জমিতে প্রাসাদ, ভেতরে গোপন কক্ষঃ সরেজমিনে মোংলা কাস্টমস হাউজের পাশে গিয়ে দেখা যায়, বন্দর সদর দপ্তরের সন্নিকটে ৫৪২ বর্গগজ জমিতে গড়ে তুলেছে তিনতলা বিলাসবহুল ভবন। তৎকালীন রাজবাড়ী-২ আসনের এমপি জিল্লুল হাকিম ও মন্ত্রী শাহজাহান খানের সুপারিশে এই জমি স্ত্রী মালিহা খাতুন দিশা’র নামে বরাদ্দ করান মনির, আর তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) কে দেন মোটা অঙ্কের ঘুষ। বন্দর ভূমি বরাদ্দ নীতিমালা পুরোপুরি উপেক্ষা করে নির্মিত এই ভবনে থাকার কথা ছিল কর্মচারীদের মেস, অথচ সেখানে এখন ওয়ান ব্যাংকের শাখা, এটিএম বুথ, দুটি ফটোকপির দোকান এবং নামকাওয়াস্তে একটি হোটেল।
বেতন বনাম আয়ঃ মনিরুল ইসলাম। চাকুরি করেন সরকারি গ্রেড ১৬ তম। মূল বেতন স্কেল ৯,৩০০ টাকা।
ভবন নির্মাণ ব্যয়ঃ আনুমানিক ৩ কোটি টাকা
বর্তমান বাজার মূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি
বার্ষিক আয় (অভিযোগ অনুযায়ী) প্রায় ৩৬ লাখ টাকা। বন্দরকে পরিশোধিত ভাড়া দেয় মাত্র ২২,৭৬৪ টাকা। অভিযোগ আছে, ভবনের একটি ‘গোপন কক্ষে’ অবৈধ কর্মকাণ্ড ও ‘হানিট্র্যাপ’-এর মতো কাজ পরিচালনা করতেন মনিরুল ইসলাম মনির।
আয়কর নথিতে ধোঁয়াশা, রাজবাড়ীতেও জমিঃ দৈনিক পর্যবেক্ষণ পত্রিকার হাতে আসা নথি বলছে, মনিরের আয়কর রিটার্নে এই বিপুল সম্পদের কোনো হিসাবই নেই। সম্প্রতি রাজবাড়ী শহরেও প্রায় ৩৬ লাখ টাকা মূল্যের জমি কিনেছেন তিনি। অথচ চাকরিতে যোগদানের সময় ব্যক্তিগত বিবরণীতে তার কোনো অলংকার, জমি বা ভবনের তথ্য উল্লেখই ছিল না। পেছনের তারিখ, রাতের আঁধারে পদোন্নতি। একাধিক অভিযোগ ও বিভাগীয় মামলা মাথায় নিয়েও জালিয়াতির মাধ্যমে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন মনির। ২০২২ সালে তালিকায় ৫২ নম্বরে থাকলেও বোর্ড পরিচালক কালাচাঁদ সিংহকে ঘুষ দিয়ে নিজেকে ১১ নম্বরে তুলে আনেন তিনি। চলতি বছরের (২০২৬) ১৫ মার্চ ঈদের আগে তড়িঘড়ি প্রমোশনের জন্য বোর্ড বসলেও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব আতিকের আপত্তিতে তা আটকে যায়। এরপর ১৬ মার্চ পেছনের তারিখ (১১ মার্চ) দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ নিষ্পত্তির ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায় তৎকালীন বন্দর প্রশাসন। শেষ পর্যন্ত গত ২৬ জুন ২০২৬ চরম গোপনীয়তায় তথ্য সহকারী থেকে জুনিয়র অফিসার (১১তম গ্রেড) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় তাকে। জানাজানির ভয়ে এককভাবে জারি করা হয় তার অফিস আদেশ।
নাম বদলে আড়ালে মনির, মেলেনি প্রতিক্রিয়া
এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে আজকের বাংলাদেশ টুয়েন্টিফোর ডটকম পত্রিকার পক্ষ থেকে মনিরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপ এ ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও মেলেনি কোন বক্তব্য। পরে তার দপ্তরে গিয়েও পাওয়া যায়নি তাকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নিজের পুরোনো ফেসবুক আইডি বন্ধ করে দিয়ে কখনো ‘খন্দকার মনির’, কখনো ‘মনিরুল ইসলাম’, আবার কখনো ‘মো. মনির’ পরিচয়ে আড়ালে থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
এছাড়াও মনিরের স্ত্রী মালিহা খাতুন (দিশা)-এর সঙ্গেও এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে কয়েক দফা প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের, দুদকের নজরদারির দাবিঃ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের বর্তমান প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা আজকের বাংলাদেশ টুয়েন্টিফোর ডটকম পত্রিকাকে বলেন, বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী মন্ত্রীদের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ কখনো মুখ খোলার সাহস পেতেন না। তবে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নির্দেশনার ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ওঠা অবৈধ সম্পদ ও পদোন্নতি জালিয়াতির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক এক কর্মকর্তা ও আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, একজন ১৬তম গ্রেডের কর্মচারীর পক্ষে ১০ কোটি টাকার ভবন নির্মাণ ও আয়কর নথিতে তথ্য গোপন করা স্পষ্টতই মানিলন্ডারিং ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের শামিল। এছাড়া বন্দরের জমি বরাদ্দ নীতিমালা লঙ্ঘন করে সেখানে বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা ভাড়া দেওয়াও চরম বেআইনি। তার মতে, দুদক ও এনবিআরের উচিত অবিলম্বে মনিরের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে এই সম্পদের উৎস তদন্ত করা।
এ সকল বিষয়ে সুস্ঠ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রী, নৌপরিবহন সচিব, দুদক চেয়ারম্যান, মোংলা বন্দর চেয়ারম্যান সহ উর্ধতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছে ভুক্তভোগী সহ সাধারণ মানুষ।
আপনার মতামত লিখুন :