• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ০৫:১৩ অপরাহ্ন

সাব-রেজিস্টার ইমরুল কায়েসের দুর্নীতির সাম্রাজ্যে : জিম্মি সাধারণ মানুষ


প্রকাশের সময় : মে ১৫, ২০২৬, ৩:৩৮ অপরাহ্ন / ২৪
সাব-রেজিস্টার ইমরুল কায়েসের দুর্নীতির সাম্রাজ্যে : জিম্মি সাধারণ মানুষ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর অদুরে কেরানিগঞ্জ দক্ষিন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। এক সময় সাধারণ মানুষের জমি-জমার দলিল রেজিস্ট্রির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত ছিল এ দপ্তরটি। কিন্তু বর্তমানে এটি পরিণত হয়েছে ঘুষ, দুর্নীতি, জুলুম এবং দালাল চক্রের অভয়ারণ্যে। আর এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দুর্নীতিবাজ সাব-রেজিস্ট্রার ইমরুল কায়েস।

সাব-রেজিস্টার ইমরুল কায়েস সরকারি এ পদকে ব্যবহার করে গড়ে তুলেছেন ব্যক্তিগত ক্ষমতার এক বেপরোয়া সাম্রাজ্য। যার ভয়ে কাঁপে সেবা গ্রহীতা, অফিসকর্মী, এমনকি স্থানীয় দালালরাও।

ব্যাপক অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য সাব-রেজিস্ট্রার ইমরুল কায়েস শুধু ঘুষ গ্রহণ কিংবা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত নন। তিনি পুরো দপ্তরটিকে ব্যক্তিগত বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। দলিল রেজিস্ট্রি থেকে শুরু করে নকল উত্তোলন, বিবাহ নিবন্ধন সুপারিশ, নামজারির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই এমন কোনো কিছুই তার অনুমতি ছাড়া সম্পন্ন হয় না। দপ্তরটি কার্যত এখন তাঁর একক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে চলে।

কেরানিগঞ্জ দক্ষিন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের আওতাধীন স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য মতে, কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ সাব রেজিস্ট্রি অফিসে সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদানের পর থেকেই ইমরুল কায়েসের আচরণ হঠাৎ করেই বদলে যায়। আগে নিরহঙ্কার, সাধারণ পোশাকে চলাফেরা করলেও এখন তিনি চড়েন দামী গাড়িতে। তার সঙ্গে থাকে একাধিক সহযোগী। অফিসে প্রবেশের পর তার আশপাশে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হয় যেন তিনি সরকারি কোন কর্মকর্তা নন যেন দপ্তরের একজন গডফাদার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দলিল লেখক জানান, প্রতিদিন সকালে অফিস খোলার পর দালালদের ভিড় লেগে যায় সাব-রেজিস্ট্রার ইমরুল কায়েসের খাস কামরার সামনে। সেখানে প্রবেশের সুযোগ হয় শুধু মাত্র তার অনুমোদিত লোকদের জন্য। সাধারণ মানুষ কিংবা দলিল প্রস্তুতকারীরা সেখানে ঢুকতে চাইলেও তার অনুমতি মেলেনা যার কারনে তারা আর প্রবেশ করতে পারেন না। তবে তার নিজস্ব লোকজন নিয়ে কক্ষের ভেতরে চলে অঘোষিত দরদাম। কোন দলিল কত টাকায় পাস হবে, কোন ফাইল আটকে রাখা হবে, কোন আবেদন জরুরি হিসেবে দেখিয়ে দ্রুত শেষ করা হবে। এ সব নিয়ে প্রতিদিনই চলে দেনদরবার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সহকারী দলিল লেখক অভিযোগ করে বলেন, এখানে বৈধ দলিল প্রমাণ করার চেয়ে টাকা দেওয়া বেশি জরুরি। টাকা না দিলে সই হবে না, সই না হলে দলিল রেজিস্ট্রিও হবে না।

তিনি আরও বলেন, ইমরুল কায়েস ভাইয়ের ফারুক নামে একজন ডান হাত আছে, তার নির্দেশ ছাড়া কোনো ফাইল এখানে নড়াচড়া করে না।

ব্যাপক অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ফারুক নামের ওই ডান হাতকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে ঘুষ বাণিজ্যের এক ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট। অফিসের আশপাশে থাকা দালাল থেকে শুরু করে কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী তারা সবাই এই সিন্ডিকেটের অংশ। তারা সবাই সাব-রেজিস্টার ইমরুল কায়েসের চোখের ইশারা বোঝেন। সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাজ তিনটি, ভুক্তভোগী খুঁজে বের করা, ঘুষের লেনদেন ঠিক করা এবং টাকার বিনিময়ে দলিল পাস করিয়ে দেওয়া। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন প্রায় লক্ষাধিক টাকা হাতবদল হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জমির দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে যেখানে সরকারি ফি নির্ধারিত, সেখানে ঘুষ হিসেবে দিতে হয় আরও কয়েক গুণ টাকা। কারো দলিলে সামান্য ভুল থাকলে তা সংশোধনের নামে নেওয়া হয় বিশেষ চার্জ। দলিল সঠিক থাকলেও ইচ্ছা করেই ভুল দেখানো হয় যাতে সেবাগ্রহীতা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দেয়।

অনেক ভুক্তভোগী জানান, দলিল সই করানোর জন্য যদি কেউ সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রার ইমরুল কায়েসের কক্ষে যেতে চান, তাকে প্রথমেই বলা হয় দালালের মাধ্যমে আসেন। এতে বোঝা যায়, সাব-রেজিস্টার ইমরুল কায়েস পুরো দালাল চক্রকেই নিজের আর্থিক উৎস হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফলে ভুক্তভোগীরা দালালের কাছে না গেলে কোন কাজই হয় না।

তবে অভিযোগ উঠেছে, বড় অঙ্কের লেনদেন হলে সরাসরি সাব-রেজিস্টার ইমরুল কায়েস নিজেই দর কষাকষি করেন। এমনকি অফিসের বাইরে নির্দিষ্ট কয়েকটি অন্ধ অঞ্চল ব্যবহার করা হয় ঘুষের টাকা লেনদেনের জন্য। যেখানে সিসিটিভির নজরদারি নেই। এই স্থানগুলোই এখন কেরানিগঞ্জ দক্ষিন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের “সেফ জোন ফর কালেকশন” হিসেবে বেশি পরিচিত। টাকার বিনিময়ে তিনি ত্রুটিপূর্ণ দলিলে সই করেন এমন অভিযোগ বহুদিনের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক দলিল লেখক ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি জানিয়েছেন, সাব-রেজিস্ট্রার ইমরুল কায়েস ভাইয়ের নিজস্ব একটি কোড আছে। টাকা ঠিক হলে দলিলে কোনো ত্রুটি থাকে না। আবার টাকা ঠিক না হলে বৈধ দলিলেও বিভিন্ন সমস্যা বের হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ভুক্তভোগী জানান, তিনি ৩/৪ মাস ধরে দলিল করাতে আসছেন। কিন্তু কোনোভাবে তার কাজ হচ্ছে না। কিন্তু যখন তিনি দালালের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা দেন, তখন ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার কাজ শেষ হয়ে যায়। তার ভাষায়, আমি বুঝলাম এখানে আইন নাই, টাকাই এখানে আইন।

সাব-রেজিস্ট্রার ইমরুল কায়েস শুধু দুর্নীতি করেই থেমে নেই, তার বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তিনি উচ্চপর্যায়ে নিজের অবস্থান মজবুত করতে সাব-রেজিস্ট্রারদের সমিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে তার নিজস্ব লোককে বসিয়েছেন। তার নিজস্ব লোকের এ পদ তাকে আরও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে কতৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথে বাধা দেন পদে থাকা তার সেই নিজস্ব লোক। ফলে দুর্নীতির অভিযোগ জমতে থাকে, কিন্তু সাব-রেজিস্টার ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

সরকারি বেতনভুক্ত কর্মকর্তা হয়েও কীভাবে তিনি একাধিক ফ্ল্যাট, গাড়ি ও বাড়ির মালিক হলেন—এমন প্রশ্নের উত্তর তিনি কখনোই দিতে পারেননি। বরং সাংবাদিকরা এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে বলেন, এসব বাদ দিন, আগে চা খান। এই আচরণ প্রমাণ করে, তিনি অভিযোগকে গুরুত্ব দেন না কিংবা তিনি ভাবেন—তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারবে না। অফিসের ভেতরেও তার আচরণ ত্রাসসৃষ্টিকারী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মচারীরা বলেন, তিনি যে কাউকে কারণ ছাড়াই বকা দেন, আবার যাকে পছন্দ করেন তাকে দিয়ে লেনদেনের বড় বড় দায়িত্ব দেন। যারা তার দুর্নীতিতে সহযোগিতা করেন না, তাদের হয়রানি করা হয়। অনেককে ইচ্ছা করে বদলি করা হয়, আবার কারও ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ দিয়ে শাস্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা হয়।

দপ্তরের বাইরে স্থানীয়রা বারবার অভিযোগ করলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনেকেই বলেন, সাব-রেজিস্টার ইমরুল কায়েস এতটাই শক্তিশালী যে তাকে কেউ কিছু বলতে পারে না। তিনি উপরের লোকজনকে টাকা দিয়ে হাত করে রেখেছেন।

ব্যাপক অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, কেরানিগঞ্জ দক্ষিন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমা হওয়া সরকারি রাজস্বের হিসাব নিয়েও রয়েছে নানা অনিয়ম। ঘুষের কারণে আসল লেনদেনকে অনেক সময় ঢেকে রাখা হয়, যার ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে দলিল রেজিস্ট্রির পর সরকারি ফি জমা দিতে দেরি করা হয় বা কখনো কখনো সেই অর্থ দেরিতে ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়—যা সরাসরি রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অফিসে অভিযোগ করার সুযোগ থাকলেও তা কার্যত নিষ্ক্রিয়। অভিযোগ বাক্সে দেওয়া অভিযোগ কখনো খোলা হয় না। যারা অভিযোগ করেন, তাদের ফাইল আটকে দিয়ে আরও হয়রানি করা হয়। ফলে কেউই প্রকাশ্যে তাদের নাম বলতে চান না।

সাব-রেজিস্টার ইমরুল কায়েস নিজের অবস্থান ঠিক রাখতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের উচ্চ পর্যায়ের ৩/৪ জন সাংবাদিকদের সঙ্গে করেন সখ্যতা। এতে সরকারের কোন পর্যায়ের লোকজন তার দিকে আঙ্গুল তুললেই ওই সাংবাদিকদের মাধ্যমে হয়রানি শুরু করেন। সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে রাখেন বিভিন্ন সাব-রেজিস্টারদের।

এছাড়াও কোন সাংবাদিক তার বিরুদ্ধে নিউজ করার জন্য বক্তব্য বা মন্তব্য চাইলে তিনি তার পালিত সাংবাদিক বাহিনী দিয়ে ওই সাংবাদিককে হুমকি-ধামকি দিয়ে থাকেন। এমনকি মামলা করারও হুমকি দিয়ে থাকেন। সপ্তাহের শুক্রবার-শনিবার বাদ দিয়ে প্রতিদিনই তার পালিত ৪/৫ জন সাংবাদিককে দেখা যায় তার খাস কামরায় আড্ডা দিতে। এ সময় ওই খাস কামরায় চলে চা-নাস্তা ও ধুমপানের আড্ডা। এ সময় খাস কামরা থাকে সিগারেটের ধোয়ায় আচ্ছন্ন। তিনি নিজেও খাস কামরায় বসে ধুমপান করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ অবস্থায় সাধারণ মানুষ, ভূমি মালিক, দলিল লেখক, এমনকি সেবাদানকারী কর্মচারীরাও দাবি করেছেন—সাব-রেজিস্টার ইমরুল কায়েস ও তার সিন্ডিকেটকে দ্রুত অপসারণ করে কেরানিগঞ্জ দক্ষিন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত করা হোক। তারা আরও বলেছেন, তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ঘুষের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণের বিষয়ে দুদকের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি।

এখন প্রশ্ন হলো একজন সাব-রেজিস্ট্রার কীভাবে পুরো দপ্তরকে নিজের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে পরিণত করলেন? তার পিছনে কি আরো প্রভাবশালী কেউ রয়েছে? তিনি কি একা নন, আরো বড় কোনো নেটওয়ার্কের অংশ? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে অবশ্যই প্রয়োজন উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নজরদারি।

ভুক্তভোগীরা মনে করেন, সাব-রেজিস্টার ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে দেশের অন্যান্য সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেও একই ধরনের দুর্নীতির বিস্তার ঘটবে। কারণ একজন কর্মকর্তা যদি খোলাখুলি কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেও বহাল তবিয়তে থাকতে পারেন তাহলে তা অন্যদের জন্যও উৎসাহ যোগায়।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাব-রেজিস্টার ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সাধারন জনগণের প্রত্যাশা—কেরানিগঞ্জ দক্ষিন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতির নেপথ্যে থাকা এই একক ক্ষমতার অধিপতিকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।