

নিজস্ব প্রতিবেদক, গোপালগঞ্জঃ গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার জলিরপাড় ইউনিয়নের বানিয়ারচর—নদী ভাঙনে ক্ষতবিক্ষত, দীর্ঘদিনের অবহেলায় পিছিয়ে পড়া এক জনপদ। জীবনের প্রতিটি ধাপে যেখানে সংগ্রাম, চিকিৎসা যেখানে প্রায় অধরা—সেই জনপদের বুকেই নীরবে-নিভৃতে মানবতার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন। মানবিক এ সংগঠনটি স্ট্রোকজনিত প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগী, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু (প্রতিবন্ধী শিশু) এবং অসহায় মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠানটি আজ শুধু একটি চিকিৎসা কেন্দ্রই নয়—এটি এক টুকরো আশ্রয়, এক চিলতে আশা এবং নতুন জীবনের দিশারী।
গত ২০২৩ সালে বানিয়ারচর খেয়াঘাট সংলগ্ন একটি ভাড়া বাসায় স্বল্প পরিসরে এ সংগঠনটি যাত্রা শুরু করে। সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও মানবিক এর সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক সভারঞ্জন শিকদারের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অসীম ধৈর্য, ত্যাগ এবং মানবিক দায়বদ্ধতায় প্রতিষ্ঠানটি আজ একটি পূর্ণাঙ্গ সেবাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা, আধুনিক ফিজিওথেরাপি, খাদ্য সহায়তা, আবাসন এবং পুনর্বাসন সেবা প্রদান করা হচ্ছে—যা গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
স্থানীয় সূত্রে জানাযায়, প্রায় ৭০ থেকে ৮০ বছর ধরে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে প্রায় দুই হাজার পরিবার ওই এলাকায় বসবাস করছে। জীবন -জীবিকার তাগিদে কেউ ছোট ব্যবসা, কেউ বেকারি কিংবা কলকারখানা গড়ে তুললেও চিকিৎসা সুবিধার অভাব ছিলো দীর্ঘদিনের। এই বাস্তবতায় সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন হয়ে উঠেছে তাদের একমাত্র ভরসার স্থান।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, এখানে আগে অসুস্থ হলে চিকিৎসার কোনো সুযোগ ছিলো না। এখন এই প্রতিষ্ঠান আমাদের বাঁচার শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা উত্তম বিশ্বাস, গৌতম বিশ্বাস ও সুমন বৈরাগী মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রায় ৩০ শতাংশ জমি, বসতঘর ও গাছপালাসহ প্রতিষ্ঠানটিকে দান করেছেন। এলাকাবাসীর জোর দাবি—এই মানবিক প্রতিষ্ঠানটিকে স্থায়ী রূপ দিতে জমিটি সরকারি প্রক্রিয়ায় সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন-এর নামে বরাদ্দ দেওয়া হোক।
প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক সভারঞ্জন শিকদার বলেন, আমি নিজের জন্য কিছু করতে আসিনি—মানুষের জন্য কিছু রেখে যেতে চাই। যারা রাস্তায় পড়ে থাকে, চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়—তাদের জন্যই এই প্রতিষ্ঠান। যত বাঁধাই আসুক, আমি থামবো না।
তিনি আরো বলেন, জায়গাটির স্থায়ী বন্দোবস্তের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছি। এটি যদি সরকারি ভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহলে এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিউনিটি হাসপাতাল গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সেবাগ্রহীতা মেরী বিশ্বাস আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন,
তিনি আমাদের কাছে সৃষ্টিকর্তার পাঠানো মানুষ। এখানে চিকিৎসা, খাবার, থাকার জায়গা—সবই পাচ্ছি।
প্রতিবন্ধী রোগী জোসনা পান্ডে জানান, একটি অ্যাম্বুলেন্স খুব প্রয়োজন। অনেক সময় জরুরি রোগী নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।
নারী সেবাগ্রহীতা রুহিদাস বিশ্বাস বলেন, এই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে আমরা চিকিৎসা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হবো।
চিকিৎসা গ্রহণকারী সমাজসেবক কামাল শেখ বলেন, বর্তমান সমাজে অমানবিকতার মাঝেও সভারঞ্জন শিকদার একজন প্রকৃত মানব সেবক হিসেবে কাজ করছেন। এখানকার চিকিৎসায় আমি অনেকটা সুস্থ হয়েছি।
জলিরপাড় ইউনিয়ন বিএনপির নেতা সুরেশ বৈরাগী জানান, গোপালগঞ্জ-১ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান সেলিম একাধিকবার সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন পরিদর্শন করে রোগী, চিকিৎসক, কর্মী এবং প্রতিষ্ঠাতার খোঁজখবর নিয়েছেন।
তিনি বলেন, আমি মাননীয় সংসদ সদস্যের কাছে মানবিক আবেদন জানাই—এই প্রতিষ্ঠানটির জন্য স্থায়ী জায়গা বরাদ্দ দিয়ে আজীবন চিকিৎসা কার্যক্রম চালু রাখার ব্যবস্থা করা হোক। এটি এখন এলাকার মানুষের জীবনের শেষ আশ্রয় স্থল।
তিনি আরো বলেন, কিছু দুষ্কৃতিকারী ও নামধারী সাংবাদিক অসত্য তথ্য ছড়িয়ে অপপ্রচারের চেষ্টা করছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা উচিত।
এ বিষয়ে জলিরপাড় ইউনিয়ন বিএনপি’র নেতা সুবোধ চন্দ্র মন্ডল বলেন, সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক সভারঞ্জন শিকদার ছোটবেলা থেকেই একজন সত্যিকারের মানব দরদী মানুষ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, আত্মত্যাগ ও মানবিক দায়বদ্ধতায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি আজ অসহায়, প্রতিবন্ধী ও চিকিৎসা বঞ্চিত মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক যে, কিছু দুষ্কৃতিকারী ও নামধারী সাংবাদিক এই মহৎ উদ্যোগকে ধ্বংস করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে, যা শুধু নিন্দনীয়ই নয়—মানবতার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়ার শামিল।
তিনি দৃঢ় কণ্ঠে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, আসুন আমরা সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হই, সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন-কে রক্ষা করি এবং সমাজের অবহেলিত, অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার এই আলোকবর্তিকাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাই।
সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশনের চিকিৎসক ডা. শুভ্রা শিকদার জানান, প্রতিদিন অসংখ্য রোগী আসছেন। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো বাড়ানো গেলে আরো বিস্তৃত ও উন্নত সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে।
সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আগত ভলান্টিয়ার ডো ইল কিম এবং ইউন জং বেক প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে এর কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
বর্তমানে এখানে অর্থোপেডিক, নিউরোলজিক্যাল, পেডিয়াট্রিক, স্পোর্টস ও জেরিয়াট্রিকসহ বিভিন্ন ফিজিওথেরাপি সেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা, অকুপেশনাল থেরাপি এবং ফ্রি কম্পিউটার প্রশিক্ষণও চালু রয়েছে।
ভবিষ্যতে এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন কমিউনিটি হাসপাতাল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে আবাসিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা থাকবে। তবে জায়গা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন আজ এই অঞ্চলের অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয় স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্র ও সমাজ পাশে দাঁড়ালে সভারঞ্জন শিকদারের এই মানবিক উদ্যোগ বদলে দিতে পারে হাজারো জীবনের ভবিষ্যৎ।
আপনার মতামত লিখুন :