• ঢাকা
  • সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ১১:২৯ অপরাহ্ন

এক সময়ের বিনোদনের প্রধান উৎস ছিল সিনেমা হল : খুলনার ১৬টি সিনেমা হল বন্ধ


প্রকাশের সময় : মে ৪, ২০২৬, ৯:৫৮ অপরাহ্ন / ২৩
এক সময়ের বিনোদনের প্রধান উৎস ছিল সিনেমা হল : খুলনার ১৬টি সিনেমা হল বন্ধ

মোঃ রাজিবুল ইসলাম রাজিব, খুলনাঃ এক সময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত খুলনা ছিল সিনেমা হলের শহর।উল্লাসিনী, পিকচার প্যালেস, বৈকালি, সোসাইটি, স্টার, ঝিনুক—এসব হল ঘিরেই গড়ে উঠেছিল নগরবাসীর বিনোদন সংস্কৃতি। পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া ছিল এক ধরনের সামাজিক উৎসব। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই জৌলুস এখন প্রায় বিলীন।

হারিয়ে যাচ্ছে এক ঐতিহ্য খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় খুলনা জেলায় প্রায় ২০টি সিনেমা হল চালু থাকলেও বর্তমানে টিকে আছে মাত্র চারটি—চিত্রালী ডিজিটাল সিনেমা হল, লিবার্টি সিনেপ্লেক্স, সঙ্গীতা ও শঙ্খ। বাকিগুলোর বেশিরভাগই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ; কোথাও ভেঙে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, আবার কোথাও পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।

বন্ধ হয়ে যাওয়া হলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—পিকচার প্যালেস, ঝিনুক, সোসাইটি, স্টার, মিনাক্ষী, বাসরী, সোহাগ, সুন্দরবন, শঙ্খমহল, জনতা, বৈকালি, উল্লাসিনী, গ্যারিসন, শাপলা ও রূপসাগর। এসব হলের অনেকগুলোই প্রায় দেড় দশক ধরে দর্শকশূন্য।

কেন মুখ থুবড়ে পড়ল সিনেমা হল? সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েকটি বড় কারণ একসাথে কাজ করেছে—মানসম্মত বাংলা সিনেমার ঘাটতি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা আধুনিক প্রযুক্তির অভাব ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো উচ্চ বিদ্যুৎ বিল ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি ফলে দর্শক ধীরে ধীরে হলমুখী হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

জীবিকার সংকটে শ্রমিকরা সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে শ্রমজীবী কর্মীদের ওপর। গেটম্যান, প্রজেকশনিস্ট, টিকিট বিক্রেতা, ক্লিনার—যারা বছরের পর বছর এই পেশায় যুক্ত ছিলেন, তারা এখন অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
স্টার সিনেমা হলের সাবেক অপারেটর সিরাজুল ইসলাম বলেন, হল বন্ধ হওয়ার পর তিনি ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। একইভাবে অনেকেই মুদি দোকান, ভ্যান চালানো, হকারি কিংবা দিনমজুরির মতো পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

মিনাক্ষী হলের সাবেক বুকিং ক্লার্ক নূর আলম জানান, একসময় হলে দর্শকের ভিড় থাকলেও ২০০৮ সালের পর ব্যবসা ধসে পড়ে। এখন তিনি ছোট ব্যবসার মাধ্যমে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন।

টিকে থাকার লড়াইয়ে শেষ কয়েকটি হল
বর্তমানে চালু থাকা হলগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। সঙ্গীতা সিনেমা হলের ব্যবস্থাপক জানান, দর্শকসংখ্যা কমে যাওয়ায় আয় দিয়ে খরচই ওঠে না। যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
চিত্রালী ডিজিটাল সিনেমা হলের পরিচালক তপু খান বলেন, ভালো কনটেন্টের অভাব এবং সরকারি সহায়তার অভাবে হল পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি সিনেমা এনে প্রদর্শনের পর অনেক সময় বিনিয়োগের টাকাও ওঠে না।

সংস্কৃতি হারানোর শঙ্কা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সিনেমা হল শুধু বিনোদনের জায়গা নয়—এটি একটি শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। খুলনার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন প্রজন্ম দেশীয় সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

উত্তরণের পথ কী? বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন—মানসম্মত বাংলা সিনেমা নির্মাণ বৃদ্ধি পুরোনো হলগুলো আধুনিক সিনেপ্লেক্সে রূপান্তর সরকারি প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা একযোগে সারা দেশে সিনেমা মুক্তির ব্যবস্থা সঠিক উদ্যোগ না নিলে খুলনার সিনেমা হলগুলো শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে—এমন আশঙ্কাই এখন বাস্তবতা হয়ে উঠছে।