

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকাঃ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবন ব্যবহারের উপযোগী করার লক্ষ্যে গুলশান-২ এর ৬ নম্বর রোডে অবস্থিত সরকারি বাংলোটি সংস্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
২০২৪ সালের ১০ এপ্রিল রাজউক চেয়ারম্যানের দুই বছরের চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার পর এ সংস্কার কার্যক্রমের প্রারম্ভিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। সংস্কার কাজ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে রাজউকের প্রধান নগর স্থপতি মোস্তাক আহমেদকে সভাপতি এবং ডিজাইন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাহাত মুসলিমকে সদস্য সচিব করে একটি বিশেষ সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়।
প্রাথমিকভাবে রাজউকের পরিচালন ও সংস্কার খাত থেকে এই বাংলো মেরামতের জন্য আনুমানিক ৩০ লক্ষ টাকার বাজেট প্রাক্কলন করা হলেও, কাজ শেষে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩ কোটি টাকার চূড়ান্ত বিল দাখিল করে—যা মূল প্রাক্কলিত বাজেটের প্রায় ৭ গুণ। প্রশাসনিক ও আর্থিক অডিট প্রক্রিয়ায় এটি গুরুতর প্রাক্কলন ত্রুটি এবং অনুমোদনবিহীন অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির একটি চরম দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
দরপত্রবিহীন কাজ বণ্টন ও আর্থিক অনিয়মের চিত্রঃ বাংলো সংস্কারের প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি ক্রয় আইন (PPA 2006) এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা (PPR 2008)-এর মূল প্রশাসনিক ও আইনি বাধ্যবাধকতাগুলো সম্পূর্ণ উপহাস করা হয়েছে। অডিট অনুসন্ধানে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের নিম্নে লিখিত গুরুতর দিকগুলো উন্মোচিত হয়েছে।
পিপিআর ২০০৮ লঙ্ঘন করে বিধিবহির্ভূত কার্যাদেশ প্রদান: সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থার কেনাকাটা বা সংস্কার কাজের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র (Open Tendering Method) আহ্বানের স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ কোনো প্রকার দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কমিটির সদস্য সচিব তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাহাত মুসলিমের একক ইচ্ছায় ও প্রশাসনিক কারসাজিতে ‘ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’ নামক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কাজটি পাইয়ে দেওয়া হয়, যা পাবলিক প্রোকিউরমেন্ট আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ নীতির চরম ব্যত্যয় ও অননুমোদিত বাজেট বৃদ্ধি: প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা, যা পাবলিক প্রোকিউরমেন্ট বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট আর্থিক সীমার মধ্যে পড়ে। তবে কোনো প্রকার পূর্বানুমোদন, সংশোধিত প্রাক্কলন বা নতুন প্রশাসনিক মঞ্জুরি ছাড়াই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি কাজ শেষে প্রায় ৩ কোটি টাকার বিল উপস্থাপন করে। ‘আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ’ (Delegation of Financial Powers) নীতি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে প্রাক্কলিত বাজেটের প্রায় সাত গুণ টাকা বাড়িয়ে বিল দাখিল করা রাজউকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা।
অনিয়ম প্রকাশ, চিঠি চালাচালি ও রহস্যজনক চাপঃ প্রশাসনিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৬ জুন রাজউকের তৎকালীন বাস্তবায়ন শাখা-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার বাংলো সংস্কারের এ বিপুল আর্থিক অনিয়ম ও দরপত্রবিহীন কার্যাদেশ প্রদানের বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিক ভাবে বর্তমান রাজউক চেয়ারম্যানকে লিখিত চিঠির মাধ্যমে অবহিত করেন। তবে এই চিঠি চালাচালির মাত্র তিন দিনের মাথায় অর্থাৎ ৯ জুন ২০২৪ তারিখে এক রহস্যজনক পরিস্থিতিতে নির্বাহী প্রকৌশলী কায়সার তাঁর অফিসিয়াল অভিযোগপত্রটি প্রত্যাহার করে নেন।
বাংলো সংস্কার কমিটির সভাপতি প্রধান নগর স্থপতি মোস্তাক আহমেদ, সদস্য সচিব তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাহাত মুসলিম এবং সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও প্রশাসনিক হুমকির মুখেই নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার লিখিত অভিযোগ পত্রটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে রাজউক কার্যালয়ে ব্যাপকভাবে আলোড়িত হয়।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্ত ও কমিটির সুপারিশঃ রাজউকের অভ্যন্তরীণ চিঠিজাল ও অনিয়মের তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর, ২০২৫ সালের ২৯ জুন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ঘটনাটির এক উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করা হয়। মন্ত্রণালয়ের তদন্তেও দরপত্র ছাড়া বেআইনিভাবে কাজ বণ্টন এবং মূল বাজেটের প্রায় সাত গুণ বেশি ব্যয়ে কাজ সম্পাদন করার সত্যতা প্রমাণিত হয়। মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি অনিয়মে সরাসরি জড়িত থাকায় প্রধান নগর স্থপতি মোস্তাক আহমেদ ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাহাত মুসলিমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করে।
তদন্ত প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা ও বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির তৎকালীন আহ্বায়ক জহিরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা যা ওখানে বলেছি আমরা তো আমাদের নিজের থেকে তৈরি করে কোন কিছু বলিনি। আমরা যা তথ্য নিয়েছি সেই তথ্যগুলো তো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা আছে। সেই তথ্যগুলোর ভিত্তিতে যেই সিদ্ধান্ত আসে সেই সিদ্ধান্ত বা যেই মতামত আসে সেই মতামতই আমরা দিয়েছি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তদন্ত প্রতিবেদনে উত্থাপিত তথ্য-প্রমাণ দাপ্তরিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এর ভিত্তিতেই প্রশাসনিক সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও রাজউক চেয়ারম্যানের প্রতিক্রিয়া : অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতাঃ বিভাগীয় তদন্তে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা চরম প্রশাসনিক দায়হীনতা ও জবাবদিহিতা এড়ানোর প্রবণতা প্রদর্শন করেছেন:
মোস্তাক আহমেদ (প্রধান নগর স্থপতি): তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে কথা বলতে রাজউক কার্যালয়ে মোস্তাক আহমেদের নিজ কক্ষে যোগাযোগ করা হলে, তিনি ভেতরে অবস্থান করা সত্ত্বেও তাঁর কর্মচারী দাবি করেন যে তিনি অফিসে উপস্থিত নেই।
রাহাত মুসলিম (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী): অপর অভিযুক্ত কর্মকর্তা রাহাত মুসলিমের সাক্ষাৎকার নেওয়ার চেষ্টা করা হলে, তিনি উপস্থিতি টের পেয়ে কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই দ্রুত নিজ কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে যান।
রাজউক চেয়ারম্যানের বক্তব্য ও বকেয়া বিলের অবস্থাঃ বর্তমান রাজউক চেয়ারম্যান সংস্কার কাজের বর্ধিত বিল এবং প্রশাসনিক তদন্তের বিষয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। বিল পরিশোধ স্থগিতঃ সংস্কার কাজের জন্য দাবি করা অতিরিক্ত বর্ধিত বিলের বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করে চেয়ারম্যান বলেন, আমি আর এক পয়সা বিল পরিশোধ করি নাই।
অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলমানঃ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি রাজউকের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অডিট ও তদন্ত প্রক্রিয়াও বর্তমানে চলমান রয়েছে।
কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার আশ্বাসঃ অপরাধের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ার বিষয়ে ব্যক্ত করে চেয়ারম্যান আশ্বাস দেন, তিনি বলেন, আমাকে তথ্যগুলো দেন। তারা কোন কোন অপরাধের সঙ্গে জড়িত সেগুলো একটু আমারে তথ্য দিবেন। আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।
প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণঃ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির স্পষ্ট সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদ ও রাহাত মুসলিমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিয়ে তাঁদের নিজ পদে বহাল রাখা চরম প্রশাসনিক জবাবদিহিতাহীনতা ও ‘ইনস্টিটিউশনাল ইম্পিউনিটি’ বা প্রাতিষ্ঠানিক বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই প্রকাশ করে।
রাজউকের অভ্যন্তরীণ অডিট ও প্রশাসনিক তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেই প্রাক্কলিত বাজেটের সাত গুণ টাকার অবাস্তব বিল তৈরির অপচেষ্টা চালানো সম্ভব হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত সুপারিশ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও অদৃশ্য কারণ-এর আশ্রয় অব্যাহত থাকলে সংস্থাটির প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও আর্থিক স্বচ্ছতা পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আপনার মতামত লিখুন :