• ঢাকা
  • বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:০৫ পূর্বাহ্ন

মোহাম্মদ আলী হোসেনের কারনে রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সীমাহীন দুর্নীতি : জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারন মানুষ


প্রকাশের সময় : অগাস্ট ২৫, ২০২৬, ৯:২৮ পূর্বাহ্ন / ১৩
মোহাম্মদ আলী হোসেনের কারনে রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সীমাহীন দুর্নীতি : জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারন মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ রোহিতপুর ভূমি অফিসে দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কারনে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত চরম হয়রানি ও আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছে। সেই সাথে ঘুষের রেট ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে অসহায় হয়ে পড়েছে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, রোহিতপুর ভূমি অফিসে যোগদানের পর থেকেই ভুমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেন চরম স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও একের পর এক দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন।

মোহাম্মদ আলী হোসেনের লালিত ওমেদার ও দালালদের মাধ্যমে প্রতিটি কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট ঘুষের রেট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সরকার নির্ধারিত ভূমি খারিজের ফি মাত্র ১১৫০ টাকা। অথচ সাধারণ নামজারি দালালদের মাধ্যমে সর্বনিম্ন ২০-২৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।

এলএ কেইস (অধিগ্রহণমুক্ত) রোহিতপুর মৌজার জমি অধিগ্রহণের অবমুক্ত হওয়া এলএ কেইস জমির নামজারির ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কাছ থেকে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিচ্ছে মোহাম্মদ আলী হোসেনের ওই সিন্ডিকেট।

এছাড়াও কাগজপত্রে সামান্য ত্রুটি থাকলে দাবিকৃত টাকার পরিমাণ তিন থেকে পাঁচগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। টাকা ছাড়া রোহিতপুর ভুমি অফিসে কোনো কাজ হয় না। এমনকি অনেক সময় ঘুষের টাকা দেওয়ার পরও কাজ না হওয়ারও অনেক অভিযোগ রয়েছে। সেই সাথে জাল দলিলে অন্যের নামে জমি নামজারি করে দেওয়া এবং সেবা গ্রহীতাদের মূল নথিপত্র গায়েব করে দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধও ঘটছে অহরহ।

রোহিতপুর ভুমি অফিসে এসে চরম ভোগান্তিতে পড়া কয়েকজন সেবা গ্রহীতা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় ভূমি মালিক জানান, ভুমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেনের দাবিকৃত ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে নানা টালবাহানায় দিনের পর দিন ঘোরানো হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রোহিতপুর ভুমি অফিসে আসা কয়েকজন নারী ভুক্তভোগী বলেন, আমরা দুই তিন মাস ধরে নাম খারিজ করার জন্য ঘুরছি। কয়েকবার আবেদন করেছি। কিন্তু প্রতিবারই তারা কোনো না কোনো ভুল ধরে। এর উপায় জানতে চাইলে অফিসের একজন জানান, ২০ হাজার টাকা দিলে কাজ করে দেওয়া যাবে। তিনি আরো বলেন, আমরা এখন অন্য ভাবে কাজটি করানোর চেষ্টা করতেছি।

রোহিতপুর ভুমি অফিসের ভেতরের এক ওমেদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করে বলেন, ভুমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেনের বেঁধে দেওয়া মাসিক টার্গেট অনুযায়ী নামজারির কাজ এনে না দিলে তাদের অফিসে কাজ করতে দেওয়া হবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয়।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা। ঢাকার কেরানীগঞ্জের রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস। ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেন ভলিয়ম বইতে নথি দেখছেন। তাঁকে ঘিরে জনাবিশেক মানুষের জটলা। সেখানে সেবাগ্রহীতাদের কাগজপত্র যাচাই করছেন মীর হাবিবুর রহমান, জাহিদ হোসেন, জিসান ও রিপন। তাঁরা কেউই ওই অফিসের কর্মচারী নন।

স্থানীয় লোকজনের কাছে উমেদার নামে পরিচিত হলেও মূলত তাঁরা ‘দালাল’। রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে ঘিরে তৎপর এমন দালালের সংখ্যা অন্তত ২০ জন। তাঁদের কাজ ভূমি অফিসের কর্মচারীদের যোগসাজশে সেবা গ্রহীতাদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করা। এমনকি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও থাকে তাঁদের জিম্মায়।

শুধু রোহিতপুর নয়, দেশের প্রায় সব ভূমি অফিসেরই একই চিত্র। ঘুষ ছাড়া সেবা মেলে না কোথাও। সেখানে পা বাড়ালে জমির মালিকদের জন্য পদে পদে অপেক্ষা করে হয়রানি। এ জন্য অনেকে ভূমি অফিস এড়িয়ে চলতে চান। জরুরি প্রয়োজনে দালালেরাই হয়ে ওঠেন তাদের সমাধান। গ্রাম বা শহর এলাকায় জমির কাগজপত্র সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যা সমাধানে প্রথমেই যেতে হয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। পরের ধাপে সেবা দেয় উপজেলা ভূমি অফিস।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন এসব অফিসের দেওয়া সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে, ভূমিহীনদের মাঝে কৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত, খতিয়ানের ভুল সংশোধন, নামজারি ও জমাভাগ, ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণীর আপত্তি-নিষ্পত্তি, দেওয়ানি আদালতের রায় বা আদেশ মূলে রেকর্ড সংশোধন, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের আবেদন নিষ্পত্তি, জমা একত্রকরণ ও বিবিধ কেসের আদেশের নকল বা সার্টিফায়েড কপি প্রদান ইত্যাদি।

এসব সেবা নিতে জমির মালিকদের অনেককেই দালালের দ্বারস্থ হতে হয় বলে স্বীকার করেছেন রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেন।

তিনি বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় আগে থেকে দালাল চক্র জড়িত। কিছু ভূমির মালিক নামজারি করতে দালালদের দায়িত্ব দেন। তা ছাড়া কাজের চাপ পড়লে আমরাও তাঁদের সহযোগিতা নেই।

সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে দালালেরা যে টাকা নেন, তা ভাগ-বাঁটোয়ারাও হয় নানা ধাপে। সরেজমিন অনুসন্ধানে রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ লেনদেন, চরম ভোগান্তি ও দালালের দৌরাত্ম্য চোখে পড়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তৎপর এক দালাল জানান, ঘুষের টাকার ৫০ শতাংশই পান সহকারী কমিশনার (ভূমি), ৩০ শতাংশ কানুনগো, সার্ভেয়ার ও নামজারি সহকারী, আর ২০ শতাংশ পান দালাল।

রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া জমির নামজারি হয় না। কাগজপত্র ঠিক থাকলেও টাকা ছাড়া ফাইল টেবিলে পৌঁছায় না। কাগজপত্রে গরমিল থাকলে গুনতে হয় কয়েকগুণ বেশি টাকা।

রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা মোঃ মাসুম বিল্লাহ বলেন, একটি জমি কিনে নামজারি করতে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অনলাইনে আবেদন করেছিলাম। সরকারি ফি ১ হাজার ২৫০ টাকা হলেও ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে দিতে হয়েছে বাড়তি ৩ হাজার টাকা।

রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নামজারির আবেদন নিষ্পত্তিতে ফাইল প্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হয়। সেখানে সক্রিয় দালাল প্রায় ২০ জন। নামজারির আবেদনের সঙ্গে তাঁদের দিতে হয় বাড়তি ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা।

খাজনার চেয়ে বাজনা বেশিঃ রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জমির খাজনা দিতে এসেছিলেন মোঃ মোখছেদ আলী। ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেন তাঁর কাছ থেকে নিয়েছেন ১৭ হাজার টাকা, কিন্তু রসিদ দিয়েছেন মাত্র ২ হাজার ২০০ টাকার। একই অফিসে জমির খাজনা বাবদ ১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েছিলেন ভূমির মালিক আবুল হোসেন। কিন্তু তাঁকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ২০ টাকার রসিদ।

এ সব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, কার কাছে কত টাকা নিয়েছি সেটা আপনাদের জানার দরকার নাই। আপনাদের কাজ আপনারা করুন, আমাকে আমার কাজ করতে দিন।

আব্দুল লতিফ মোল্লা রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জমির খাজনা দিতে চাইলে তাঁর কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে। বাধ্য হয়ে ৮ হাজার টাকায় তিনি দাখিলা কেটেছেন আর দাখিলায় খাজনা জমা দেখানো হয়েছে মাত্র ২২০ টাকা।

আরেক ভুক্তভোগী হারুনুর রসিদ বলেন, আমার ভিটেবাড়ির নাম খারিজের জন্য প্রায় আড়াই মাস আগে ১ হাজার ১৫০ টাকার ফিসহ সাড়ে ৫ হাজার টাকা দিয়েছি। সরকারি ফি কত টাকা জানতে চাইলে তাঁরা সঠিক তথ্য দেন না। ফলে বাড়তি টাকা দিতে হয়েছে। তারপরও আমি কোন কাগজপত্র পাচ্ছি না।

ডিজিটাল সেবাও ঝুলে থাকে টাকার জন্যঃ ভূমি অফিসের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে অনলাইনে সেবা চালু করেছে সরকার। এর মধ্যে জমির নামজারি, খাজনা ও মিসকেস সেবা অন্যতম।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, অনলাইনে আবেদনের মাধ্যমে বাড়তি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অনলাইনে আবেদনের পর আবার মূল কাগজপত্র নিয়ে ভূমি অফিসে যোগাযোগ করতে হয়। তখন টাকা না দিলে অনলাইনে ঝুলে থাকে ফাইল।

রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আসা অনিক চন্দ্র বলেন, নামজারি জন্য অনলাইনে আবেদন করে কাগজসহ দিয়েছিলাম। সহকারী ভুমি কর্মকর্তা কাগজে ভুল আছে জানিয়ে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। তাঁর কথা অনুয়ায়ী অনলাইনের কপিসহ ৫ হাজার টাকা দিয়েছি। কিন্তু তিনি দিনের পর দিন আমাকে ঘোরাচ্ছেন।

এ সকল বিষয়ে রোহিতপুর ভুমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, আপনারা সাংবাদিক। আমার অফিসে কোন অনিয়ম হলে আপনারা লিখুন তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। আমি এখানে টাকা খরচ করে পোষ্টিং নিয়েছি। আমার উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করা আছে। নিউজ করলে আমার কিছুই হবে না। আপনাদের যা খুশি আপনারা লিখেন। তাতে আমার কিছুই হবে না।

এ প্রসঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ বলেন, আমরা চাই ভুমি অফিসগুলো দালালমুক্ত হোক। ভূমি ভবনের নিচে পরীক্ষামূলক কাস্টমার কেয়ার সেন্টার চালু করা হয়েছে। সেখানে বিনা মূল্যে সব কাজ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ১৬১২২ নম্বরে ভূমি সেবার একটা কল সেন্টার রয়েছে, সেখানে সমস্যার কথা জানাতে পারেন। এই সিস্টেম গুলো জেলা, উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেব। তিনি ইউনিয়ন ভুমি অফিসগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে পদক্ষেপ নিবেন বলেও জানান।

রোহিতপুর ভুমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেনের অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারীতার বিরুদ্ধে তদন্ত পুর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য ভুমি মন্ত্রী, ভুমি প্রতিমন্ত্রী, ভুমি সচিব সহ ভুমি মন্ত্রণালয়ের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী সহ সাধারণ মানুষ।