• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ন

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের এডি তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ


প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৪, ২০২৬, ১১:২২ অপরাহ্ন / ৪
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের এডি তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক (এডি) তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডারবাজি, ঘুষ বাণিজ্য এবং অর্থ আত্মসাতসহ ১৩ দফায় চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার দুর্নীতির ফিরিস্তি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করে বারবার অভিযোগ থেকে খালাস পেয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অবিলম্বে এ বিষয়ে নবাগত মহাপরিচালকের কঠোর হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্ত কামনা করেছেন।

অনুসন্ধান ও প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এডি তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রধান ১৩টি দুর্নীতির অভিযোগগুলো নিম্নরূপ:

ফায়ার লাইসেন্স বাণিজ্যে অর্থ আদায়: ফায়ার লাইসেন্স রি-অ্যাসেসমেন্ট বা নবায়ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অকেজো মালামাল আত্মসাৎ: চট্টগ্রামে যোগদানের পর সরকারি নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নষ্ট ও অকেজো সরকারি মালামাল নিলামে বিক্রি না করে খোলা বাজারে বিক্রি করে দেন এবং সেই বিক্রয়লব্ধ সমুদয় অর্থ আত্মসাৎ করেন।

স্বজনপ্রীতি ও ছোট ভাইকে বিশেষ দায়িত্ব প্রদান: নিয়মনীতি উপেক্ষা করে নিজের ছোট ভাই শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে ফায়ার সার্ভিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করেছেন তিনি।

ইন্সপেক্টরদের জিম্মি করা: চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন স্টেশনের ইন্সপেক্টরদের নিজের ছোট ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে রেখে এক প্রকার ‘জিম্মি’ করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সিলেটে দায়িত্বকালে হটকারী লাইসেন্স প্রদান: সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে মে-জুন ২০২৬ সময়ে ইন্সপেক্টরদের উপর চাপ প্রয়োগ করে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন। অগ্নি নিরাপত্তার বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও মাত্রাতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ৪১২টি লাইসেন্স প্রদান করেন।

পোস্টিং বাণিজ্যে অর্থ লেনদেন: চট্টগ্রামে কাঙ্ক্ষিত পোস্টিং নিতে তৎকালীন ডিজির স্টাফ অফিসার (ডিজিডি) আরমানকে মোটা অঙ্কের ঘুষ প্রদান করেছিলেন তিনি।

রেশনের ডাল কেনায় কারচুপি ও অর্থ আত্মসাৎ: চট্টগ্রামের ই-জিটি টেন্ডারের আওতাধীন রেশনের নিম্নমানের ডাল ইউডি হাশেমের মাধ্যমে চাকতাই থেকে ক্রয় করে শহরের বাইরের বিভিন্ন স্টেশনে সরবরাহ করেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এর প্রতিবাদ জানালে তাদের বদলির ভয় দেখানো হয়। পরবর্তীতে সাংবাদিকদের ম্যানেজ করে এবং স্টাফদের প্রতি কেজি বাবদ মাত্র ৪০ টাকা করে পরিশোধ করে বিষয়টি ধামাচাপা দেন।

বদলির সুপারিশে ঘুষ বাণিজ্য: বদলির সুপারিশ বা স্বাক্ষরের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। ঘুষ না দিলে তিনি ফাইল আটকে রাখেন এবং সুপারিশ করেন না।

বকেয়া বিল প্রদানে ১৫% অগ্রিম ঘুষ দাবি: বিগত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের চট্টগ্রাম বিভাগের ১০৫টি ফায়ার স্টেশনের বিভাগীয় কারিগরি কারখানার গাড়ি ও পাম্পের বকেয়া বিল পরিশোধ না করে নিজের ইচ্ছেমতো নতুন বিল ছাড় করান। এ সময় ‘বাবুল’সহ তিনটি প্রতিষ্ঠানের লোকজন দেখা করতে গেলে তিনি পরিষ্কার জানান যে, ঢাকা অধিদপ্তরে পাঠানোর নাম করে তাকে অগ্রিম ১৫% কমিশন দিতে হবে, অন্যথায় কেউ বিল পাবে না।

কক্সবাজারের ইনানী রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে অবহেলা ও মৃত্যুর অভিযোগ: কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের ইনানী ‘টুপ টুপ রিসোর্টে’ শনিবার ভোরবেলা অগ্নিকাণ্ডের ঠিক পূর্বে রিসোর্টের প্রতিনিধিরা (রহিম ও কামাল) ফায়ার সেফটি বিষয়ে পরামর্শ ও লাইসেন্সের জন্য এডি তৌফিকের সঙ্গে দেখা করেন এবং আপ্যায়ন করান। এ সময় তৌফিক তার রানারকে বিষয়টি দেখার দায়িত্ব দেন এবং রানার লাইসেন্স বাবদ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। ঘুষের টাকা না দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি লাইসেন্স করতে পারেনি এবং পরবর্তীতে ওই রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০টি তাজা প্রাণের মর্মান্তিক অকালমৃত্যু ঘটে। তার এই দায়িত্বহীনতা ও অবহেলাকে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

কুমিল্লায় মন্ত্রীর পিএসকে ব্যবহার ও মসজিদ নির্মাণে দুর্নীতি: কুমিল্লায় কর্মরত থাকাকালীন তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর এপিএস কামালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে মনোহরগঞ্জ নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণকাজে নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ করেন। এছাড়া কুমিল্লা ফায়ার স্টেশন মসজিদ নির্মাণের নামে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নগদ টাকা, রড, সিমেন্ট, বালি, ফ্যান ও টাইলস চাঁদা হিসেবে তুলে তার নিজ বাড়িতে পাচার করেন।

এসব সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য অভিযুক্ত এডি মো. তৌফিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি তার কাছে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো ধরনের উত্তর বা ব্যাখ্যা প্রদান করেননি।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সৎ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এমন পাহাড়সম অভিযোগ থাকার পরও অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে তিনি বহাল তবিয়তে থেকে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। অবিলম্বে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের নবাগত মহাপরিচালক মহোদয়ের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্তপূর্বক কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।