

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ দেশের মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময়ে যে সংস্থাটির প্রধান ভূমিকা রাখার কথা, সেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) নিজেই এখন এক ভয়ংকর ও দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেটের কব্জায়। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় সংস্থাটিতে চলছে লাগামহীন ঘুষ, পদায়ন বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের চক্রান্ত।
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হাসান মারুফ পট পরিবর্তনের পর ভোল পাল্টে একদিকে যেমন নিষিদ্ধ বঙ্গবন্ধু পরিষদ-এর চিহ্নিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসিত করছেন, অন্যদিকে নিজের চেয়ার শক্ত করতে এবং সচিব পদে উন্নীত হতে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর চালাচ্ছে দমন-পীড়ন।
ভোল পাল্টানো ডিজি ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের জাঁকিয়ে বসা ১৮তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. হাসান মারুফ গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মহাপরিচালক হিসেবে যোগদানের পর থেকেই ডিএনসির গতিপথ সম্পূর্ণ উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করে।
অভিযোগ রয়েছে, জনপ্রশাসন সংস্কারের তোয়াক্কা না করে বিপুল অর্থের বিনিময়ে পদ বাগিয়ে নেওয়ার পর তিনি বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলের বিতর্কিত ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী বলয়।
বিগত দেড় দশক ধরে দাপট দেখানো ডিএনসির ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’-এর শীর্ষ নেতারা এখন ডিজির সবচেয়ে আস্থাভাজন। ঢাকা মেট্রো, ঢাকা গোয়েন্দা শাখা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের মতো প্রাইজ পোস্টিং পেতে কর্মকর্তাদের এখন ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ-সভাপতি ও উপ-পরিচালক (প্রশাসন) রাজীব মিনা এবং বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মেহেদী হাসান। বিগত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের সাথেই এখন ডিজির গভীর সখ্য। এছাড়া গুলশান, বনানী, উত্তরা ও নিকেতনের বারগুলো থেকে মাসোহারা তোলার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণও এখন এই চক্রের হাতে।
নিয়োগ বাণিজ্য ও কল রেকর্ড ফাঁসের অভিযোগ উঠেছেঃ গত কয়েক মাসে ডেসপাস রাইডার, অফিস সহায়ক, ওয়্যারলেস অপারেটর ও সিপাহীসহ বিভিন্ন পদে বিপুল সংখ্যক বিতর্কিত লোকবল নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চালানো হয়েছে। নিজ অনুসারী অতিরিক্ত পরিচালক বদরুদ্দীন, উপ পরিচালক রাজীব মিনা ও উপ পরিচালক মেহেদী হাসানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের ভয়ংকর কল রেকর্ড ও আড়িপাতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। অবৈধভাবে এনটিএমসির (NTMC) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কল আড়িপেতে ব্ল্যাকমেইলিং এবং স্বার্থ হাসিলের নজির গড়ছে এই চক্র।
অভিযানের নামে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও মিথ্যা মামলাঃ চলতি বছরের মে মাস থেকে সারাদেশে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানকে নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছেন ডিজি হাসান মারুফ। জেলায় জেলায় ডাটাবেজ পাঠিয়ে মিথ্যা মাদক মামলা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেন আসামিদের জামিন পেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। সচিব পদে প্রমোশনের জন্য ‘এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটি’ দেখাতে এবং সরকারের নজরে আসার বাহানায় তিনি এই সাজানো প্রজেক্ট রান করছেন। অথচ নিজ দপ্তরের ঝুলে থাকা দুর্নীতির ফাইল ও মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তিনি সম্পূর্ণ নীরব।
ফ্যাসিবাদের সময়ে তোষণ, এখন সচিব হওয়ার দৌড়ঝাঁপঃ অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রের মতে, পতিত ফ্যাসিস্ট আমলে ডিজি হাসান মারুফ বিভিন্ন সভা-সেমিনারে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে কটূক্তি করতেন।
সরকারি কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার সেজে পোস্টিং বাগিয়ে নেওয়া এই কর্মকর্তা এখন সচিব পদের তদবিরে ব্যাকুল। দাপ্তরিক কাজ ফেলে সারাদিন সচিবালয়ে প্রমোশনের তদবিরে দৌড়ঝাঁপ করাই এখন তার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার এসব দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসনের প্রতিবাদে গত ১০মে ডিএনসি কার্যালয়ের সামনে সচেতন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানববন্ধন করে মারুফের পদত্যাগের জোর দাবি জানান।
যেখানে বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে, সেখানে শত কোটি টাকার দুর্নীতি ও বদলি বাণিজ্যে লিপ্ত ডিজি হাসান মারুফ এবং তার পোষা ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ সিন্ডিকেট পুরো মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার ও চাঁদাবাজির আখড়ায় পরিণত করেছে।
এ ব্যাপারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফের সাথে কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সচেতন মহল অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের অপসারণ এবং এর নেপথ্যে থাকা অবৈধ সম্পদের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছে।
আপনার মতামত লিখুন :