

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকাঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)’র দেড় হাজার টাকা বেতনের সাবেক ক্যাশিয়ার সরদার সরদার মাহবুবুর রহমান এখন শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। বর্তমানে সদর দপ্তরের অর্থ শাখার সাবেক উপ-পরিচালক সরদার মাহাবুবু রহমানে ঘুষ গ্রহণ যেন নেশায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তিনি বিআরটিএ’র অডিট শাখার প্রধান হিসাবে দ্বায়িত্বে রয়েছেন।
ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার আওয়ামী লীগে সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সহযোগিতায় সরদার মাহবুবুর রহমান রাজধানী ঢাকা, খুলনা, নড়াইল, গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নামে বেনামে একাধিক বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট বাড়ি সহ অঢেল সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।
তার সহকর্মীরা বলছেন, বিআরটিএ’র এই দুর্নীতিবাজ ও প্রভাবশালী কর্মকর্তা সরদার মাহবুবুর রহমানের হাতে জাদুর চেরাগ ছিল। শুধু তিনিই নন, তার অন্যতম সহযোগিদের মধ্যে বিআরটিএ’র উপ-পরিচাক (ইঞ্জিনিয়ার) মো. সানাউল হক ও মটরযান পরিদর্শক, সিলেট সার্কেল মো. দেলোয়ার হোসেন অন্যতম। তারা দু’জনই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পালিয়ে যাওয়া মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বিআরটিএ থেকে অবৈধ আয় যোগানের অন্যতম সহযোগি ছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরদার মাহাবুবুর রহমান ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) তে ক্যাশিয়ার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি বিআরটিএ’র উপ-পরিচালক এমর্পোরমেন্ট পদে কর্মরত।
চাকরির শুরুতে সরদার মাহবুবুর রহমানের বেতন ছিল সর্ব-সাকুল্যে দেড় হাজার টাকা। পর পর কয়েক দাপে পদোন্নতি পেয়ে ২০২৩ সালে উপ-পরিচালক (ডিডি অর্থ) হন তিনি। এখন তার বেতন প্রায় ৭০ হাজার টাকা। সরকারি এই কর্মকর্তা রাজধানী ঢাকায় একাধিক বহুতল ভবন ও ফ্ল্যাটের মালিক। আর ক্রয় করেছেন দামি গাড়ি। আবার গোপালগঞ্জ জেলা শহরে ১৪ তলার ভবন নির্মাণ করছেন। অথচ তার সারা জীবনের চাকরি হতে আয়কৃত অর্থের পরিমাণ হিসাব করলে প্রায় ৯৫ লাখ টাকার মত হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার পরিচিতজনেরা জানান, বিএরটিএ’র এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা সরদার মাহবুবুর রহমানের প্রয়াত কৃষক বাবার কৃষি জমি রয়েছে অল্প কিছু। এখন তার অঢেল সম্পত্তি গড়ে তোলার খবর গ্রামের লোকজনের মাঝে নানা প্রশ্ন জেগেছে। তারা বলছেন, সরদার মাহাবুবুর রহমানের কাছে কি এমন জাদুর কাঠি আছে ?
সরদার মাহবুবুর রহমানের গ্রামের বাড়ি নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার ডুমুরিয়ায় এলাকায়। সরদার মাহবুবুর রহমানের গ্রামের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার বাবার রেখে যাওয়া কৃষি জমি এখনো অক্ষত রয়েছে। যা এখনো তাদের কোন শরীক বিক্রি করেননি।
সরদার মাহবুবুর রহমানের স্ত্রীর নাম মিন্নি বেগম। তিনি পেশায় একজন গৃহিনী। তাদের তিন ছেলে-মেয়ে এখনো পড়াশোনা করছেন।
সরদার মাহবুবুর রহমান তার শ্বশুরবাড়ি থেকেও কোন প্রকার আর্থিক সুবিধা পাননি। তাহলে এতো সম্পদের মালিক হলেন কি ভাবে ? সেই প্রশ্নের জবাবে তার পরিচিতজনেরা বলেছেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পালিয়ে যাওয়া মন্ত্রী, এমপিদের সহযোগিতায় ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ আয়ের মাধ্যমেই তিনি অল্পদিনে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন।
একাধিক সূত্র জানায়, বিআরটিএ’র জেলা ও সার্কেল অফিসগুলোর জন্য বার্ষিক বরাদ্দ করা হয়। আর সেই বরাদ্দের অর্থ তার একক ক্ষমতা বলে নির্ধারণ করতেন এই সরদার মাহাবুবুর রহমান। তিনি বাজেট বাড়িয়ে সংশ্লিষ্ট সার্কেল থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করতেন। আর কমিশন ছাড়া ক্রয়ের কোন ভাউচার পাস করতেন না। এ ছাড়া বিআরটিএ’র বেসরকারি ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের বিল পাস করাতে ঘুষ নিতেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাজেট সংক্রান্ত কমিটি হওয়ায় তার ক্ষমতা অনেকাংশে খর্ব হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সরদার মাহাবুবুর রহমানের বাবা আব্দুর রাশেদ সরদার গত প্রায় ৩০ বছর আগে মারা যান। তিনি কৃষি কাজ করতেন। পৈতৃক ভাবে একটি টিনের বাড়ি ছিল। তা এখন ভেঙে একতলা পাকা বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে।তারা দুই ভাই ও দুই বোন। তার ভাই পুলিশ কর্মকর্তা বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ঢাকা উদ্যানে সরদার মাহবুবুর রহমানের একটি আটতলা অট্টালিকা ব্লক-এ, রোড-২, বাড়ি নম্বর-২১ গড়েছেন। বাড়ির ছাদের ওপরেও ফ্ল্যাট করা হয়েছে। বাড়ির নিচতলায় দোকান ভাড়া দেওয়া আছে।
বাড়িটির ম্যানেজার ও একাধিক ভাড়াটিয়া জানিয়েছেন, গত ৭ থেকে ৮ বছর আগে বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ওই বাড়িতে তিনি কখনো বাস করেননি। বাড়িটির বাইরের দিকে নির্মাণ শেষ করা বা রং করা হয়নি। প্রত্যেক তলায় দুটি করে ইউনিট করা হয়েছে।
এছাড়া, গোপালগঞ্জের থানাপাড়া জামে মসজিদের পাশে ২০১৪ সালে ৬৫ লাখ টাকায় তার স্ত্রীর নামে সাড়ে ৬ শতাংশ জমি ক্রয় করা হয়। যেখানে ১৪ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।
সম্প্রতি ৯ তলার কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। ভবনের প্রতি তলায় তিনটি করে ইউনিট। স্থানীয়রা এবং নির্মাণ শ্রমিকরা বাড়ির মালিক হিসেবে সরদার মাহাবুবুর রহমান বলে জানেন এবং রাজধানীতে বিআরটিএ’র বড় কর্মকর্তা তিনি। ভবন নির্মাণে প্রতি বর্গফুটের খরচ করা হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৩শ’ টাকা। সরদার মাহাবুবুর রহমানের শ্বশুর বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর এলাকায়। যার কারনে তিনি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক ক্ষমতা খাটিয়েছিলেন। শেখ সেলিম, শেখ হেলাল সহ শেখ পরিবারের সাথে ছিলো তার সখ্যতা। গোপালগঞ্জে বিয়ে করার সুবাধে তিনি মাঝে মাঝে শেখ পরিবারের জামাই হিসাবেও পরিচয় দিতেন।
সরদার মাহবুবুর রহমানের শ্বশুর প্রয়াত মোহাম্মদ আলী একজন পুলিশের কর্মকর্তা ছিলেন। নব্বই দশকে তিনি চাকরি থেকে অবসরে যান। এরপর গোপালগঞ্জ শহরের মিয়াপাড়ায় জমি কিনে ছাপড়া ঘর তুলে বসবাস করতেন। তার সাত মেয়ে ও চার ছেলে। গোপালগঞ্জ শহরে তার মুদি ব্যবসা ছিল। তার মেয়ের জামাইয়ের টাকায় জমি কিনেই সেখানে বাড়ি করা হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
বিআরটিএ’র অপর সূত্র জানায়, সরদার মাহাবুবুর রহমান মিরপুরের উত্তর টোলারবাগের ১৯/সি-২ নম্বর ভবনে পরিবার নিয়ে থাকতেন।
ভবনের পাশের ফ্ল্যাটের এক বাসিন্দা জানান, একই হোল্ডিংয়ে পাশাপাশি দুটি ছয়তলা ভবন। প্রথম ভবনের ৩/এ ফ্ল্যাটের মালিক মাহবুবুর রহমান। গত ২০১০ সালে ভবন নির্মাণের পর সরদার মাহবুবুর ফ্ল্যাটটি নিজে কিনে বসবাস করলেও বেশ কয়েক বছর আগে সেখান থেকে তিনি উত্তরায় চলে যান। বর্তমানে তিনি ধানমন্ডি এলাকায় তার ক্রয়কৃত একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন। শুধু বাড়ি নির্মান আর ফ্ল্যাটই নয়, দামি প্রাইভেটকার রয়েছে। যা তার পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করছেন। তার গাড়ির কোন বেতনভুক্ত চালক নেই, সেলিম নামে সরকারি গাড়ির চালককে দিয়ে তার ব্যক্তিগত গাড়ি চালাচ্ছেন বলেও একাধিক সূত্রটি জানিয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সরদার মাহাবুবুর রহমানের সম্পদের বিবরণীর বিষয়ে গণমাধ্যমে বলেছেন, তার বৈধ আয়ের সঙ্গে কোনো সামঞ্জস্য নেই। তিনি যে পর্যায়ের কর্মচারী, সেই পর্যায়ে তো প্রশ্নই ওঠে না এত সম্পদ করার। বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারী হিসেবে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে কোনো পর্যায়ের ব্যক্তির পক্ষে বৈধ উপায়ে বিশাল সম্পদ অর্জন করার সুযোগ নেই। যোগসাজশমূলক দুর্নীতির মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পদ গড়েছেন। তাকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আর সম্পদের হিসাব নিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়া সাপেক্ষে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
এ বিষয়ে বিআরটিএ’র উপ-পরিচালক এমর্পোমেন্ট সরদার মাহাবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি সরকারি চাকরি করি। আমার যা সম্পদ রয়েছে, তার সবই সরকারি ট্যাক্সফাইলে ওঠানো আছে। সেই আয় থেকেই সব করেছেন বলে জানান তিনি।
সরদার মাহবুবুর রহমানের আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনে ব্যাপারে সড়ক উপদেষ্টা, দুদক চেয়ারম্যান ও দেশের গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছে সাধারণ মানুষ।
আপনার মতামত লিখুন :