

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ বাংলাদেশ রেল ওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তিনি প্রকল্প পরিচালক থাকাকালীন সময়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
শেখ হাসিনার ফুফাত ভাইয়ের ছেলেদের ছত্রচ্ছায়ায় লুটপাটের নীল নকশা। অন্তর্বর্তী সরকার এসেই সাশ্রয় করেন ১,৮৬০ কোটি টাকা। একটা স্টেশনেই কমানো হয় ১৪ কোটি টাকা। তবুও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে মহাপরিচালক হিসাবে! খোলা মাঠের মাঝখানে বিপুল টাকায় তিনতলা বিশিষ্ট ভাঙা স্টেশনটি নির্মাণ করা হয়েছে। যার কোন প্রয়োজন ছিলনা বলে এলাকাবাসী মনে করেন।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রক পরিচালক ছিলেন রেলওয়ের বর্তমান মহাপরিচালক আফজাল হোসেন। এর আগে তিনি শেখ হাসিনার আমলে প্রকল্প পরিচালক পদে খুলনা-মংলা রেললাইন প্রকল্প, ঢাকা-টংগীর মধ্যে তৃতীয়-চতুর্থ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করেন। একজন দক্ষ প্রকৌশলী হিসেবে তার যেমন খ্যাতি রয়েছে, তেমনি ঘুষ, দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের মাস্টার মাইন্ড হিসেবে তার বদনামেরও কমতি নেই।
আফজালের বিরুদ্ধে যত অভিযোগঃ অভিযোগ আছে, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ঋণ চুক্তির সময় ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) উল্লেখ ছিল না, এমন কিছু কাজ যুক্ত করে তিনি ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৯৪৭ কোটি টাকা) খরচ করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছেন।কেননা, এই বাড়তি টাকার ঋণ দিতে চীন ইতোমধ্যেই অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
চীনের অস্বীকৃতির কারণঃ চীনের দাবী, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে যেসব খাতে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে, সেগুলো ঋণচুক্তির আওতায় ছিল না। যেমন, ভাঙ্গায় ছোট স্টেশনের পরিবর্তে আইকনিক স্টেশন নির্মাণ, টিটিপাড়া আন্ডারপাস নির্মাণ, এসি কোচের সংখ্যা বৃদ্ধি, বায়ো টয়লেট সংযোজন, এসি কোচের খুচরা যন্ত্রাংশ কেনা, সিসি ক্যামেরা বসানো, বরিশাল রুটের জন্য ইয়ার্ড লাইন নির্মাণ, সেন্ট্রাল ট্রাফিক কন্ট্রোল ভবন তৃতীয় তলা থেকে উঁচু করা, প্ল্যাটফর্মের দৈর্ঘ্য বাড়ানো, ঢাকা (কমলাপুর) থেকে গেন্ডারিয়া পর্যন্ত দুই লাইনের পরিবর্তে রেলের তিনটি লাইন করা, তুলারামপুর রেলওয়ে সেতু নির্মাণ, ঢাকা-গেন্ডারিয়া রুটে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ এবং শিবচর স্টেশনে এক্সেস রোড নির্মাণ করা।
ডিপিপি-তে এগুলোর উল্লেখ না থাকলেও তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেন এই বাড়তি কাজ গুলো সংযোজন করে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করেছেন। এতে করে সরকার কিছুটা বেকায়দায় পড়লেও তিনি নিজে কিন্তু লাভবান হয়েছেন ঠিকই। ঘুরিয়ে নিচ্ছেন নিজের ভাগ্যের চাকা।
বাজেট বৃদ্ধি করণঃ ২০১৬ সালে প্রকল্পটি নেওয়ার সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে ব্যয় সংশোধনের পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। সর্বশেষ সংশোধনী ও এরপর কাটছাঁটের ফলে ব্যয় দাঁড়িয়েছে এখন ৩৮ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ৭ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে, যা নিয়ে তীব্র আলোচনা সমালোচনা আছে রেল মন্ত্রণালয়ের ভিতরেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকল্পে ব্যয়ের পরিমাণটা একটু বেশিই হয়েছে এবং এখান থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা নয়ছয় করা হয়েছে- যার দায়ভার এড়াতে পারেন না প্রকল্প পরিচালক।
রেলওয়ের একটি সূত্র জানায়, ভাঙার নতুন স্টেশনটির পাঁচ কিলোমিটার পরে ভাঙা জংশন এবং ১২ কিলোমিটার আগে মাদারীপুরের শিবচর স্টেশন। পুরোনো জংশনটি প্রকল্পের আওতায় মেরামত ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। দুটি (ভাঙা জংশন ও শিবচর) স্টেশনের মাঝখানে এমন কোনো শহর বা উল্লেখ করার মতো কোনো স্থাপনা নেই। অনেকটা মাঠের মাঝখানে বিপুল টাকায় তিনতলা বিশিষ্ট ভাঙা স্টেশনটি নির্মাণ করা হয়েছে- যার কোন প্রয়োজন ছিলনা বলে এলাকাবাসী মনে করেন।
সূত্র মতে, শুরুতে এখানে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল না।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, সংসদের তৎকালীন চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী ওরফে লিটন চৌধুরী এবং তাঁর ভাই ভাঙার সাবেক সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী ওরফে নিক্সন চৌধুরী (গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে) এবং তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেন (শেখ হাসিনার দোসর, খুবই বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন) এদের পরস্পরের যোগসাজসেই স্টেশন নির্মাণের বিষয়টি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মূলত প্রকল্প থেকে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার নীল নকশায়।
বাড়তি কাজ কার স্বার্থেঃ অভিযোগে আরো জানা যায়, নিক্সন চৌধুরী ও তার ভাই লিটন চৌধুরীর সাথে যোগসাজস করে প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেন এই বাড়তি কাজ করে প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের একটি বড় ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করে শেখ হাসিনাসহ ওই দুজনের পাশাপাশি নিজে লাভবান হয়েছেন।
কিনেছেন রাজধানী ঢাকার গুলশান, বনানী, উত্তরায় একাধিক ফ্ল্যাটসহ মিরপুরে (স্ত্রীর নামে) বাড়ি। যদিও মিরপুরের একটি বাড়ি ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত বলে তিনি দাবি করেন। সব মিলিয়ে এখন তিনি প্রায় কয়েক শ’ কোটি টাকার সম্পদের মালিক।
অন্যদিকে, অন্তবর্তী সরকারের রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত সরকারের আমলে নেওয়া প্রকল্পের ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছেন। নতুন প্রকল্প ও কেনাকাটায় সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী, ইতিমধ্যে কিছু কিছু সাশ্রয়ও হয়েছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন এক স্টেশনেই ব্যয় কমেছে প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। এ জন্য স্টেশন ভবনের রং, টাইলস, কমোডসহ কিছু পণ্যের ধরন পরিবর্তন করা হয়। আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা (এসি) বাদ দিয়ে লাগানো হয় বৈদ্যুতিক পাখা। ঠিকাদারের সঙ্গে দর-কষাকষি করেও কিছু ব্যয় কমানো হয়েছে।
প্রকল্পের একটি নথি অনুযায়ী, নকশা ও জরিপ ফি, সংকেত ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন, পরিবেশগত সুরক্ষা, রেলক্রসিং গেট নির্মাণ, নদী শাসন ও পাথরবিহীন রেলপথ নির্মাণে প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। এ ছাড়া পণ্যের মূল্য সমন্বয় থেকে এবং কাজ বাড়তে পারে, এমন বিবেচনায় রাখা টাকাও সাশ্রয় হয়েছে। সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা ব্যয় কমানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে রেলওয়ে মহাপরিচালক আফজাল হোসেনের সাথে কয়েকদফা যোগাযোগ করা হলেও তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রেলওয়ে মহাপরিচালক আফজাল হোসেনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছে রেলওয়ের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
আপনার মতামত লিখুন :