

নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনাঃ খুলনা নগরীতে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান গুলো। গত ১৭ দিনের ব্যবধানে চাঁদার দাবিতে অন্তত তিনটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও সশস্ত্র মহড়া চালানোর অভিযোগ উঠেছে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। একটি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
একই সঙ্গে সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে নগরীর একটি ফার্মেসি বন্ধ করে দিয়েছেন মালিক।
একের পর এক এমন ঘটনায় চিকিৎসক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান মানসম্মান ও জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে কিংবা আইনের আশ্রয় নিতে সাহস পাচ্ছে না বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ অক্টোবর রাতে নগরীর বাবুখান রোডে অবস্থিত সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। অভিযোগ রয়েছে, নগরীর এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর ঘনিষ্ঠ সহযোগীর শ্বশুরের চিকিৎসাসংক্রান্ত সহযোগিতা না পাওয়াকে কেন্দ্র করে এ হামলার সূত্রপাত। হামলাকারীরা প্রতিষ্ঠানের দুটি চিকিৎসকের কক্ষ, কাউন্টার ও একটি টেলিভিশন ভাঙচুর করে। আতঙ্ক ছড়াতে সেখানে গুলি বর্ষণের ঘটনাও ঘটে।
এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন সকালে একই মালিকের আরেকটি প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র মহড়া দেয় দুর্বৃত্তরা। এ সময় সেখানে উপস্থিত এক চিকিৎসকের ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব ঘটনায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ থানায় কোনো অভিযোগ করেনি। মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও এ বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রের দাবি, শুধু এসব প্রতিষ্ঠান নয়, নগরীর আরও কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। চাঁদা দিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
এরপর গত ৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর সামসুর রহমান রোডে অবস্থিত আব্দুল্লাহ প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুর চালায় দুর্বৃত্তরা। প্রথম দিকে ক্যান্সার পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহসংক্রান্ত বিরোধকে হামলার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরবর্তী সময়ে চাঁদাবাজির বিষয়টি সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে।
সর্বশেষ গত ৭ নভেম্বর শনিবার দুপুরে নগরীর খানজাহান আলী রোডে অবস্থিত এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে হামলার ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য এর আগে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপককে হুমকি দিয়েছিল। কথোপকথনের একপর্যায়ে বাহিনীর প্রধানকে চেনেন কি না, এমন প্রশ্ন করা হয়। ব্যবস্থাপক তাকে চেনেন না জানালে এক মাস পর এ হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের। তবে আতঙ্কের কারণে তারাও থানায় অভিযোগ করেননি।
অন্যদিকে নগরীর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের চয়নিকা ফার্মেসির ব্যবস্থাপককে মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতায় ব্যবস্থাপক আত্মগোপনে চলে যান। পরে মালিকপক্ষ ফার্মেসিটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।
খুলনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. লোকমান হোসেন জানান, ডায়াগনস্টিক সেন্টার গুলোতে হামলার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। ওই মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, শনিবার খানজাহান আলী রোডের এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলার ঘটনায়ও কর্তৃপক্ষ থানায় অভিযোগ করেনি। তবে এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া কয়েকজন আবারও নগরীতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে খুলনা নগরীতে চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে চিকিৎসাসেবা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক পরিবেশ আরও হুমকির মুখে পড়বে।
আপনার মতামত লিখুন :