

এম রোমানিয়া, খুলনাঃ খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাডুলী গ্রামের নাম শুধু উপমহাদেশের প্রখ্যাত রসায়ন বিজ্ঞানী আচার্য (স্যার) প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জন্মস্থান হিসেবেই নয়, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
এই গ্রামের ঐতিহাসিক পৈতৃক বাড়িটি একসময় স্বাধীনতাকামী নেতাদের বৈঠক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ফলে বাড়িটি আজ বিজ্ঞানচর্চা, নবজাগরণ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য স্মারক হিসেবে পরিচিত।
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যখন ভারতবর্ষ জুড়ে অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন ও লবণ সত্যাগ্রহের মতো কর্মসূচি চলছিল, তখন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও মতবিনিময়ের জন্য রাডুলীর এই বাড়িতে বহু দেশপ্রেমিকের সমাগম ঘটত বলে গবেষণাগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসসহ তৎকালীন জাতীয় নেতাদের আন্দোলনের ধারার সঙ্গে এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক যোগাযোগের বিষয়টি ইতিহাসে আলোচিত।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জীবন ও কর্মভিত্তিক গবেষণা এবং রনজিৎ কুমার মণ্ডল রচিত “আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়” গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, রাডুলীর এই বাড়ি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের স্মৃতি বহন করে।
বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আধুনিক সংরক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে নতুন রূপ পেয়েছে। সংস্কারের সময় ভবনের মূল স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে দেয়াল, বারান্দা, প্রবেশপথ ও আশপাশের পরিবেশ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, যাতে ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন থাকে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, খুলনার প্রকাশনা “বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বসতবাড়ি” অনুযায়ী, সদর মহলের উত্তর-পশ্চিম পাশে নারীদের বসবাসের জন্য নির্মিত অন্দরমহলেই ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জন্ম হয়।
সংস্কার শেষে ভবনটি এখন ইতিহাসপ্রেমী, শিক্ষার্থী, গবেষক ও পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৮৫০ সালের দিকে আচার্যের পিতা হরিশচন্দ্র রায় রাডুলী গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে এই বসতবাড়ি নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে এর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সালের ৭ নভেম্বর প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটের মাধ্যমে বাড়িটিকে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে এবং বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ১৮৯৬ সালে মারকিউরাস নাইট্রাইট (Mercurous Nitrite) আবিষ্কারের মাধ্যমে ভারতীয় রসায়ন গবেষণায় নতুন যুগের সূচনা করেন। তিনি শুধু একজন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীই নন, ছিলেন শিক্ষাবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা ও সমাজসংস্কারক। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস ভারতীয় শিল্পায়নের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা রাডুলীর এই ঐতিহাসিক বাড়িতে আসছেন। তাদের কাছে এটি কেবল একজন বিজ্ঞানীর জন্মভিটা নয়, বরং বাঙালির নবজাগরণ, বিজ্ঞানচর্চা, দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার ইতিহাসের এক মূল্যবান নিদর্শন।
ইতিহাসবিদদের মতে, রাডুলীর এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে ঘিরে গবেষণা, সংরক্ষণ এবং পর্যটন সম্ভাবনা আরও বিকশিত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশের বিজ্ঞান ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ পাবে।
আপনার মতামত লিখুন :