বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকাঃ জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও ফার্মসমূহের রেজিস্ট্রার এ কে এম নুরুন্নবী কবিরের বিরুদ্ধে বিগত দুই বছরে কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীরা তাঁকে দুর্নীতির মহারাজা বলে আখ্যা দিয়ে সম্প্রতি রেজিস্ট্রারের কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় পোস্টার সাঁটিয়েছিলেন, যা পরদিনই সরিয়ে ফেলা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, অফিসের সহকারীসহ কয়েকজন কর্মচারীও তাঁকে এসব অনিয়মে সহায়তা করছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, ঘুষ দিলে নতুন কোম্পানি, সোসাইটি বা সংগঠনের নিবন্ধন এক থেকে দুই দিনের মধ্যে পাওয়া যায়। সাধারণত ১ থেকে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে। বিপরীতে, ঘুষ না দিলে আবেদন যতই নিয়মসম্মত হোক না কেন, নিবন্ধন আটকে থাকে বলে রয়েছে অভিযোগ।
কারওয়ান বাজার টিসিবি ভবনে অবস্থিত জয়েন্ট স্টক কোম্পানির কার্যালয়ে প্রায় ৯৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি বা দালাল চক্রের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেনে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। ভবনটির আশপাশে শতাধিক দালাল কনসালটেন্সি ফার্ম নাম দিয়ে কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকেন এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করিয়ে দেন।
টিসিবি গলির এসি ভবনে বসা দালাল মেরাজ ভূঁইয়ার বরাত দিয়ে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকে তিনি কয়েকশ সোসাইটি ও কোম্পানির নিবন্ধনের আবেদন করিয়েছেন যার মধ্যে অবকাঠামোগত অস্তিত্বহীন নামেও নিবন্ধন পাওয়ার নজির রয়েছে।
প্রকৃত সরকারি ফি ২০ হাজার ৫০০ টাকা হলেও দালালের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে মোট প্রায় ৩৫ হাজার টাকা আদায় করা হয় বলে জানা গেছে।
মেরাজ ভূঁইয়ার নিজের জবানিতেই উঠে এসেছে, বাংলাদেশ মার্চেন্টস সোসাইটি নামের একটি সংস্থার নিবন্ধনের জন্য তিনি ৭০ হাজার টাকা ঘুষ লেনদেনে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে একজন সাংবাদিকের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেন যে লাইসেন্স হয়ে গেছে।
নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা সজল জানান, বরিশালের একটি গ্রামীণ উন্নয়ন সোসাইটির নিবন্ধনের জন্য বহু হয়রানির পর নিবন্ধকের সহকারী আবুল খায়েরকে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে অনুমোদন পান।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আবুল খায়ের হোয়াটসঅ্যাপে বিষয়টি অস্বীকার করেন।
আরেক ভুক্তভোগী মো. শামসুদ্দিন শামস অভিযোগ করেন, রেজিস্ট্রার নুরুন্নবী কবির, উপ-নিবন্ধক রণজিৎ কুমার রায়, সহকারী নিবন্ধক যাদব কুমার পোদ্দার এবং আবুল খায়েরসহ একাধিক কর্মকর্তা সরাসরি অর্থ দাবি করেছেন।
তাঁর ভাষ্য, রেজিস্ট্রার স্যারের নির্ধারিত খাম ছাড়া নিবন্ধন সম্ভব নয় বলে জানানো হয়েছে। তিনি বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে যাওয়া এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের রেফারেন্সেও রেহাই নেইঃ সাংবাদিক ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আলম জানান, তাঁর সংগঠনের নিবন্ধনের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের টিও শাখায় আবেদন করার পর চার মাস হয়রানির শিকার হয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব আশরাফুল সিদ্দিক স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পান, যাতে রেজিস্ট্রারের কাছে যেতে বলা হয়। এরপর রেজিস্ট্রার নুরুন্নবী তাঁকে সহকারী আবুল খায়েরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। এবং আবুল খায়ের ১৪ লাখ টাকা দাবি করেন। মন্ত্রণালয়ের চিঠি নিয়ে যাওয়ার পরও গুরুত্ব না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ফয়সাল আলম।
ফয়সাল আলম আরও অভিযোগ করেন, বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার সচিবের দুর্নীতিতে সহায়তা করেন এবং নিজ কার্যালয় সব সময় ভেতর থেকে তালাবদ্ধ রাখেন, যা অস্বাভাবিক বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও মহাপরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা কথা বলা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গত ২০ আগস্ট রেজিস্ট্রার নুরুন্নবী কবির সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে কথা বলার আশ্বাস দেন।
উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান।
সূত্রের দাবি, অবসরের পরপরই তিনি বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। এর আগে তিনি শিক্ষাগত সনদ হারানোর কথা উল্লেখ করে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দেন, যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত তথ্যাদি প্রকাশ পায়। বিজ্ঞাপনে দেখা যায় এ, কে, এম, নুরুন্নবী কবির (৫৮), পিতা: মো: জয়ন উদ্দিন, মাতা: মোসা: নুরজাহান বেগম, ঠিকানা (বর্তমান)-কাওরান বাজার টিসিবি ভবন, গ্রাম-কাওরান বাজার, ইউনিয়ন/ওয়ার্ড-ওয়ার্ড নং-নতুন-২৬ (পুরাতন-৩৯), থানা-তেজগাঁও, জেলা-ঢাকা। এস.এস.সি, সাল ১৯৮২, রোল নং – ৫৯৯০৯, রেজি: নং – ৪১২৫৯, এইচ.এস.সি সাল ১৯৮৪, রোল নং-১২৯২৬, রেজি: নং- ২৪১৪ উভয় ঢাকা বোর্ড এবং বি.এস.সি. (সম্মান), রসায়ন বিভাগ, সাল-১৯৮৭ এবং এম.এস.সি. সাল-১৯৮৮, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তেজগাঁও থানা জিডি নং: ১৮৬৯ তারিখ: ২৯/০৬/২০২৬। তার সরকারি সার্ভিস আইডি নং ৫৯১৪ ভোটার আইডি-১৯৬৭৫৬১১০৭৬৭০৭২৫৮।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জয়েন্ট স্টকের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) অত্যন্ত অসন্তোষজনক এবং কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এলে তা যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করে দেখার সুযোগ রয়েছে।
জয়েন্ট স্টকে কর্মরত আইনজীবী ও স্টেকহোল্ডাররা রেজিস্ট্রার নুরুন্নবী কবিরসহ সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।