নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ রাজস্ব অজমা নিয়ে চালক ও কন্ডাক্টরদের নামে মিথ্যা অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়নি ১ যুগেরও বেশি সময় ধরে। লিখিত জবাব, তদন্ত ও শুনানীর ১২ বছরেও আলোর মুখ দেখিনি তদন্ত রিপোর্ট। রাজস্ব অজমার তদন্ত রিপোর্ট ১ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রশাসন শাখায় আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট নথি, বিআরটিসি সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাজস্ব অজমার সর্বশেষ তদন্ত রিপোর্ট ডিজিএম শুকদেব ঢালী কর্তৃক গত বছরের প্রথম দিকে প্রশাসন শাখায় জমা হলেও প্রশাসনের ম্যানেজার রাজিবুল হাসান তা আটকে রেখে ভুক্তভোগী চালকদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অজুহাতে উৎকোচ নেন। দীর্ঘদিন ফাইল পুটআপ না দেওয়ায় চালকেরা বিষয়টি উর্ধ্বাতনের নজরে আনেন।
এ সময় চালকেরা ম্যানেজার প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করলে আজ-কাল করতে করতে বছর ঘুরিয়ে ফাইলের জটিলতা তৈরী করে তদন্ত ব্যতীত আরেকটি ফাইল নথিতে সংযুক্ত করেন। যে কারণে পরিচালক প্রশাসনের টেবিল থেকে ওই ফাইল আবারও ফেরত আসে। শুরু হয় দীর্ঘসূত্রতা। নতুন ভাবে ফাইল পুটআপ দিয়ে পরিচালক প্রশাসনের টেবিলে পাঠানো হলেও তিনি আর ফাইলে স্বাক্ষর করেননি যা সংশ্লিষ্ট নথি ও বিআরটিসির সূত্র থেকে জানা যায়।
ফাইল আটকে রেখে চালকদের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহনের বিষয়ে কথা বলতে ম্যানেজার প্রশাসন রাজিবুল হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে পরিচয় পেয়ে ফোন কেটে দিলেও পরে মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকার কথা বলেন। এরপর আর ফোন রিসিভ করেননি।
ফাইল আটকে রাখার বিষয় কথা হয় পরিচালক প্রশাসন রাহেনুল ইসলামের সাথে প্রতিবেদককে তিনি জানান, ফাইল আটকে রাখার বিষয়ে লিখিতভাবে কোন অভিযোগ না পেলেও মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে ম্যানেজার প্রশাসন রাজিবুল হাসানকে শোকজ করা হয়েছে। অজমা রাজস্বের তদন্ত প্রতিবেদন নথিতে স্বাক্ষর প্রসঙ্গে পরিচালক প্রশাসন বলেন, ফাইলে কোন কোয়ারি থাকলে ফেরত পাঠানো হতে পারে, তবে স্বাক্ষর না থাকলে স্বাক্ষর করার কথা জানান এ কর্মকর্তা।
ফাইল আটকে রাখার বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, ডকুমেন্টসহ লিখিত অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। কেননা যে কেউ কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করতে পারে। এ কর্মকর্তার অন্য দপ্তরে বদলী প্রসঙ্গে সংস্থা প্রধান বলেন, রিপ্লেসমেন্ট পাওয়া না গেলে সেক্ষেত্রে আগের কর্মস্থলে কাজ করার নির্দেশনা থাকে। এটা অফিস প্রসিডিউর।
সংশ্লিষ্ট নথি, ওই সময়কার পত্রিকার রিপোর্ট ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে থেকে জানা যায়, গোলাম ফারুক বগুড়া বাস ডিপোতে যোগদানের পর বহিরাগত লীজ পার্টি দিয়ে গাড়ী পরিচালনা করতেন। বিআরটিসির নীতিমালা অনুযায়ী বহিরাগতদের দিয়ে সরাসরি গাড়ী পরিচালনার কোন সুযোগ না থাকায় তা চালক/কন্ডাক্টরদের নামে দেখিয়ে বহিরাগতদের দিয়ে পরিচালনা করা হয়।
তবে ওই সকল গাড়ী পরিচালনায় যদি কোন রাজস্ব অজমা থাকে সেই অজমা রাজস্বের দায় লীজ পার্টিকেই বহন করতে হবে মর্মে অঙ্গীকার নামা নেওয়া হয়। এই মর্মে ২০১৩ সালের ১৫ এপ্রিল লীজ পার্টির কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা নেন ম্যানেজার গোলাম ফারুক।
অঙ্গীকারনামায় ডিপোর যে সকল চালক/কন্ডাক্টরের নামে লীজ পার্টি গাড়ী পরিচালনা করবে তার সকল রাজস্ব লীজ পার্টি ক্যাশে জমা করার কথা থাকলেও ম্যানেজারের যোগ সাজসে রাজস্ব ক্যাশে জমা না করে তা নিজেদের মাঝে ভাগ-ভাটোয়ারা করে লুটপাট করায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অজমা পড়ে। এক পর্যায়ে অজমা রাজস্বের পরিমাণ কোটি টাকার উপরে ছড়িয়ে পড়লে রাজস্ব লুটপাটের খবর বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় প্রকাশ হয়। পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি হেড অফিসের নজরে আসে এবং ম্যানেজার গোলাম ফারুককে বগুড়া বাস ডিপো থেকে দ্রুত অপসারণ করেন। এর আগে ম্যানেজার গোলাম ফারুক অজমা রাজস্ব আদায়ে ২০১৪ সালের ৩০ অক্টোবর পত্র নং ৩৬/বগ/প্রঃ/২১৩৫ স্বারকে শফিকুল ইসলাম বাচ্চু ও পত্র নং ৩৬/বগ/প্রঃ/২১৩৩ স্বারকে আপেল মাহমুদকে (লীজ পার্টি) অজমাকৃত রাজস্ব জমা করণের চিঠি দেন। লীজ পার্টি তার চিঠিতে কর্ণপাত না করায় এবং অজমা রাজস্ব জমা না করায় নিজের ও লীজ পার্টির লুটপাট আড়াল করতে ভুক্তভোগী চালক/কন্ডাক্টরদের নামে অজমা রাজস্বের চিঠি দেন।
অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া অজমা রাজস্বের দায় থেকে মুক্তি পেতে চালক/কন্ডাক্টররা দারস্থ হন উর্ধ্বাতনের। শুরু হয় তদন্ত ও শুনানী। দীর্ঘ ১ যুগের ও বেশি সময় ধরে অজমা রাজস্ব নিয়ে তদন্ত ও শুনানির নামে কালক্ষেপণ করছেন বিআরটিসি’র কিছু অসাধু কর্মকর্তা। এই অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজসে বছরের পর বছর চলছে তদন্ত ও শুনানী।
ভুক্তভোগী চালকদের অভিযোগ শুনানীর নামে বারবার হেড অফিসে ডেকে নিয়ে সারাদিন বসিয়ে রেখে সন্ধ্যার পরে বলা হয়েছে আপনাকে আবার ডাকা হবে। কোন কোন সময় সারাদিন বসিয়ে রেখে তদন্ত কর্মকর্তা অফিস সহকারীর মাধ্যমে লিখিত বক্তব্যে নিয়ে বিদায় দেওয়া হয়েছে। এভাবে দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও কোন সমাধান মিলছে না মিথ্যা এ অভিযোগের।