নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ বার বার ঘুরে ফিরে ঢাকাতেই বহাল তবিয়তে রয়েছেন মহা দুর্নীতিবাজ সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ।
এর আগে ঢাকার খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালনকালে প্রভাব খাটিয়ে বদলি-বাণিজ্য এবং অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনসহ ২০২৬ সালে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা থেকে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি-পদায়নকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য প্রকাশ্যে আসে।
একের পর এক ভুরি ভুরি অভিযোগের পরও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ক্ষোভের সৃষ্টি হলে মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বদলি আদেশ জারি করা হয়। কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতার বলে তিনি ঢাকার পার্শ্ববর্তী টঙ্গি এলাকার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেই পদায়ন বাগিয়ে নেন।
খিলগাঁওসহ পূর্ববর্তী কর্মস্থলে থাকাকালীন মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, সরকারি পদায়ন-বদলিতে অর্থ লেনদেন, অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন এবং স্বজনদের নামে সম্পত্তি গচ্ছিত রাখার মতো গুরুতর বিষয় উঠে আসে।
তিনি এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন যে, একটি জাতীয় দৈনিকে তাঁর অপকর্মের কাহিনী প্রকাশিত হলে মধ্যরাতে একদল সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে উক্ত পত্রিকা অফিসে হানা দেন। তাঁর সঙ্গে থাকা মাস্তান বাহিনী অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে সংবাদ প্রত্যাহারের জন্য চাপ প্রয়োগ করে।
বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে তিনি ২০ থেকে ৩০ জনের একটি মাস্তান বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন, যাদের মাধ্যমে পুরো কমপ্লেক্স নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করতেন। তাঁর এমন দাপট ও অপকর্মের কারণে পুরো রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের ভাবমূর্তি দারুণ ভাবে ক্ষুণ্ন হয় এবং সেখানে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। যার ফলে কমপ্লেক্সের ভেতরে-বাইরে তাঁকে অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোরালো দাবি ওঠে।
বিশেষ অনুসন্ধানে দেখা যায়, খিলগাঁওয়ে দায়িত্ব পালনকালে বন্দর স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মালিকানাধীন ৮১ শতাংশ জমি আবাসন প্রতিষ্ঠান শেলটেক প্রাইভেট লিমিটেডের কাছে ৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকায় সাফ-কবলা হস্তান্তরের (দলিল নং ২৫০৯, ১০ মার্চ ২০২৬) ঘটনা ঘটে। ‘শেলটেক লিগ্যাসি প্লাজা’ নির্মাণের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত এই দলিলের আগের রাতে সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক উমেদারের নিকেতনের বাসায় ২ কোটি টাকা ঘুষ পৌঁছে দেওয়া হয়।
এই বড় লেনদেনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব, স্ট্যাম্প শুল্ক ও নিবন্ধন ফি ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, যার সাথে সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মধ্যস্থতাকারীদের যোগসাজশ ছিল।
এছাড়াও ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনের বদলি-বাণিজ্যে জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা লেনদেন এবং পছন্দসই কর্মস্থলে অবস্থান ধরে রাখতে মাসিক প্রায় ২০ লাখ টাকা চাঁদা নেওয়ার মূল হোতা ছিলেন এই মাইকেল।
তার অর্জিত প্রায় এক হাজার কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, আফতাব নগরে একটি ভবনে তাঁর মালিকানাধীন ২৯টি ফ্ল্যাট রয়েছে (প্রতিটির আনুমানিক মূল্য পাঁচ কোটি টাকা), গুলশান-১ এর একটি ভবনে দুই ফ্লোরজুড়ে আবাসনসহ একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পত্তি রয়েছে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বিপুল সম্পত্তি রয়েছে, এছাড়া নিজের বা স্বজনদের (স্ত্রী ও শ্যালক) নামে গুলশান, নিকেতন, ধানমন্ডিসহ ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতে ফ্ল্যাট ও জমি এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষিজমি, মাছের ঘের ও খামার রয়েছে।
মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে এসব দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবীর পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।