বিশেষ প্রতিবেদক, খুলনাঃ খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) এস্টেট অফিসার গাজী সালাউদ্দীনের বিরুদ্ধে নিয়োেগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, শিক্ষাগত সনদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন, সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পুকুর, দোকান, বাজার ও ঘাট ইজারা-বরাদ্দে অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন কেসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় সচেতন মহলের একটি অংশ।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কেসিসির সম্পত্তি-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা গাজী সালাউদ্দীনের ভূমিকা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
১৯৯৫ সালে চাকরিতে যোগদান, ২০০৬ সালে পদোন্নতিঃ কেসিসির নথিসূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, গাজী সালাউদ্দীন ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ‘ট্যাক্স আদায়কারী’ পদে কেসিসিতে চাকরিতে যোগ দেন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি ‘সহ-সুপারিনটেনডেন্ট অব ট্যাক্স’ পদে পদোন্নতি পান। তাঁর পদোন্নতির ক্ষেত্রে তৎকালীন নিয়োগবিধি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও অন্যান্য শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। এ কারণে মূল নিয়োগ ও পদোন্নতির নথি যাচাই করে বিষয়টি স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।
শিক্ষাগত সনদ নিয়েও প্রশ্নঃ গাজী সালাউদ্দীনের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর এসএসসি ও এইচএসসি সনদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের সংরক্ষিত মূল রেকর্ডের সঙ্গে কেসিসিতে জমা দেওয়া সনদ যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। তবে সনদ জাল বা ভুয়া—এমন অভিযোগ এখনো কর্তৃপক্ষের কোনো চূড়ান্ত তদন্ত বা প্রামাণ্য নথির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও কেসিসির মূল নথি যাচাই প্রয়োজন।
সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগঃ কেসিসির এস্টেট শাখা নগর করপোরেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব-সংশ্লিষ্ট বিভাগ। নগরীর বিভিন্ন মার্কেট, দোকান, পুকুর, ঘাট ও অন্যান্য সম্পত্তির ইজারা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এ শাখার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পত্তির ইজারা ও বরাদ্দে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে করপোরেশনের রাজস্ব ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। বিশেষ করে গত কয়েক বছরের ইজারা প্রক্রিয়া, টেন্ডার বা বরাদ্দের নথি, আদায়কৃত রাজস্ব এবং বকেয়া অর্থের হিসাব নিরীক্ষার দাবি জানানো হয়েছে।
জোড়াগেট পশুর হাটসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ততাঃ প্রকাশ্য সংবাদসূত্র ও কেসিসির বিভিন্ন কার্যক্রমে গাজী সালাউদ্দীনকে সম্পত্তিবিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। কেসিসির ঐতিহ্যবাহী জোড়াগেট পশুর হাট পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিবসহ বাজার ও ফুটপাত-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমেও তাঁর সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছে।
অভিযোগকারীদের মতে, এসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, রাজস্ব আদায় এবং ইজারা-বরাদ্দের নথিপত্রও যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রভাবশালী পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগঃ অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয় ব্যবহার করে গাজী সালাউদ্দীন দীর্ঘদিন ধরে কেসিসিতে প্রভাব বিস্তার করেছেন। বিশেষ করে জাতীয় সংসদের সাবেক এক হুইপের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব খাটাতেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছাড়া অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।
যে বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনার দাবিঃ অভিযোগের প্রকৃত চিত্র এবং কেসিসির সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে নিচের বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে—কেসিসির বিভিন্ন পুকুর ও ঘাটের ইজারা প্রক্রিয়া ও প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের হিসাব; মার্কেট ও দোকান বরাদ্দের নথি, ইজারা মূল্য এবং বকেয়া রাজস্ব; সরকারি সম্পত্তি ইজারা ও বরাদ্দে প্রচলিত বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না;
গাজী সালাউদ্দীনের মূল নিয়োগ ও পরবর্তী পদোন্নতির নথিঃ এসএসসি ও এইচএসসি সনদের সত্যতা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের মূল রেকর্ডের সঙ্গে যাচাই;
জোড়াগেট পশুর হাটসহ তাঁর দায়িত্বে থাকা অন্যান্য
কার্যক্রমের আয়-ব্যয়ের হিসাবঃ কেসিসির রাজস্ব ক্ষতির কোনো প্রমাণ থাকলে তার পরিমাণ নিরূপণ।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিঃ সচেতন মহলের মতে, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিয়োগ, পদোন্নতি, শিক্ষাগত সনদ এবং সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠলে বিষয়গুলো প্রশাসনিকভাবে যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত; আবার অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
এ কারণে কেসিসির অভ্যন্তরীণ তদন্তের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় অথবা সংশ্লিষ্ট নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।