বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকাঃ প্রায় ১৯ বছর ধরে একই বিভাগে একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তার সময়ে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের অভিযোগ।
১৯টি লিফটে অতিরিক্ত বরাদ্দ ৩১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, সংখ্যা কমলেও বেড়েছে কয়েক খাতের ব্যয়।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) মোহাম্মদপুর এলাকার ‘দোলনচাঁপা-কনকচাঁপা’ আবাসন প্রকল্পে লিফটসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রো মেকানিক্যাল (ইএম) সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনীতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি লিফট কেনার বরাদ্দ প্রায় তিন গুণ করা হয়েছে। এতে শুধু লিফট খাতেই অতিরিক্ত বরাদ্দ বেড়েছে ৩১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা।
মোহাম্মদপুরের এই প্রকল্পে ৪৩০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৪৬৯ কোটি ১৯ লাখ ১১ হাজার টাকা। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫৪১ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পটির মোট ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৭২ কোটি ৩ লাখ টাকা, যা মূল ব্যয়ের প্রায় ১৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ। প্রকল্পের মূল প্রস্তাবে ১৯টি লিফট কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭ কোটি ২০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। প্রথম সংশোধনীতে এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৮ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ফলে লিফট কেনার ব্যয় বেড়েছে ৩১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের মোট ব্যয় বৃদ্ধির প্রায় ৭২ কোটি টাকার মধ্যে শুধু লিফট খাতেই অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩১ কোটি টাকার বেশি।
লিফটের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন খাতেও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। মূল প্রস্তাবে ১০টি সাবস্টেশনের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬ কোটি ১০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। সংশোধনীতে সাবস্টেশনের সংখ্যা ১০টি থেকে কমিয়ে ৮টি করা হলেও ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮ কোটি ৩৯ লাখ ১১ হাজার টাকা। এতে এ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ২৮ লাখ ১৭ হাজার টাকা।
একই চিত্র দেখা গেছে বৈদ্যুতিক জেনারেটরের ক্ষেত্রেও। মূল প্রস্তাবে ১০টি জেনারেটরের জন্য ২ কোটি ৯১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও সংশোধনীতে সংখ্যা কমিয়ে ৮টি করা হয়েছে। অথচ ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪ কোটি ৭৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। ফলে জেনারেটর খাতে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। পাম্প-মোটরের ক্ষেত্রেও প্রতি সেটের দাম ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে এ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৬ লাখ ২১ হাজার টাকা।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত অগ্নিনিরোধক ব্যবস্থাপনা খাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। মূল প্রস্তাবে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬ কোটি ৫০ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। সংশোধনীতে জবের সংখ্যা ১০টি থেকে কমিয়ে ২টি করা হলেও ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৯ কোটি ৮২ লাখ ১৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ কাজের সংখ্যা কমলেও এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৩২ হাজার টাকা।
এ ছাড়া ফোর্স ভেন্টিলেশন খাতে মূল প্রস্তাবে ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৯ হাজার টাকা। এতে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ ৯ হাজার টাকা।
জাগৃকের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, এসব ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে ইলেক্ট্রো ও মেকানিক্যাল বিভাগের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ভূমিকা রয়েছে।
তাদের দাবি, প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপিতে তুলনামূলক কম ব্যয় নির্ধারণ করে পরবর্তী সময়ে সংশোধনীর মাধ্যমে বিভিন্ন সরঞ্জামের দাম বাড়ানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, জাগৃকের নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএম) মো. মিরাজ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রকল্পের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল বিভাগের কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত।
কর্মকর্তাদের দাবি, গত প্রায় দেড় যুগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০টি প্রকল্পের ইএম বিভাগের কেনাকাটায় তার সম্পৃক্ততা ছিল।
কর্মকর্তাদের আরও অভিযোগ, এসব প্রকল্পে ডিপিপিতে নির্ধারিত অর্থের চেয়ে বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে এবং অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ ঠিকাদারদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
জাগৃকের কর্মকর্তারা জানান, ২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর ইএম বিভাগে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ১৯ বছর ধরে একই বিভাগে রয়েছেন মিরাজ হোসেন। দীর্ঘ সময় একই বিভাগ ও পদে থাকার বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের ভেতরে প্রশ্ন রয়েছে বলে দাবি তাদের।
তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে এমন প্রকল্প গুলোর মধ্যে স্বপ্ননগর আবাসিক প্রকল্প-১ ও ২, মিরপুর ৩৬০ ফ্ল্যাট প্রকল্প, লালমাটিয়া ৮৮ ও ৫৪ ফ্ল্যাট প্রকল্প, লালমাটিয়া অফিসার্স কোয়ার্টার, লালমাটিয়া বাণিজ্যিক মার্কেট, যশোর বাণিজ্যিক প্রকল্প, মিরপুর গ্রেনেড হামলা প্রকল্প, চট্টগ্রামের কয়েকটি ফ্ল্যাট প্রকল্প, কক্সবাজার, বগুড়া ও দিনাজপুর ফ্ল্যাট প্রকল্প, সেগুনবাগিচা গৃহায়ন ভবন এবং যশোর ফ্ল্যাট প্রকল্পের নাম উল্লেখ করেছেন কর্মকর্তারা।
তাদের দাবি, এসব প্রকল্পের ডিপিপি ও বাস্তব ব্যয়ের তথ্য পর্যালোচনা করলে অনুমোদিত ব্যয় ও প্রকৃত ব্যয়ের পার্থক্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে এসব কেনাকাটায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে তারা জানান।
সর্বশেষ যশোর বাণিজ্যিক প্রকল্পে লিফট কেনাকে কেন্দ্র করেও মিরাজ হোসেন আলোচনায় এসেছেন বলে কর্মকর্তারা জানান।
তাদের অভিযোগ, সেখানে ১০ কোটি টাকার লিফট ১৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে।
লিফট কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, সদস্য এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমেও মিরাজ হোসেন নিজের প্রভাব ধরে রেখেছেন বলে কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন।
তাদের আরও দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অর্থে জাগৃক ও গৃহায়ন-গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা বিদেশ সফর করেছেন। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাগৃকের নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম ডিভিশন) মো. মিরাজ হোসেন বলেন, প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে ‘বি’ ক্যাটাগরির লিফট ধরা হয়েছিল। পরে মন্ত্রণালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটি ‘এ’ ক্যাটাগরির লিফট ধরার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের (পিডব্লিউডি) শিডিউল অনুযায়ী ‘এ’ ক্যাটাগরির লিফটের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
লিফটের দাম এত বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যে ক্যাটাগরির লিফট ধরা হয়েছে, সেগুলোর দাম আগের তুলনায় বেশি এবং দ্বিগুণেরও বেশি। পিডব্লিউডির শিডিউলে পরিবর্তনের পর নির্ধারিত নতুন দরই প্রকল্পে ধরা হয়েছে।
দুর্নীতির সুযোগ থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে মিরাজ হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয়ে সমন্বয় সভা হয়, প্রকল্প পরিচালক রয়েছেন, তার অধীনস্থ কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিষয়টির সঙ্গে যুক্ত। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
দীর্ঘদিন একই পদে বহাল থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাকে দেবে কোথায়, যাওয়ার তো জায়গা নাই।