• ঢাকা
  • সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৩৭ অপরাহ্ন

সুগন্ধা নদীতে অগ্নিকাণ্ড : অনুমতি না নিয়েই বদলে ফেলা হয় লঞ্চের ইঞ্জিন


প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ২৫, ২০২১, ১২:১৯ অপরাহ্ন / ১৪৯
সুগন্ধা নদীতে অগ্নিকাণ্ড : অনুমতি না নিয়েই বদলে ফেলা হয় লঞ্চের ইঞ্জিন

ঢাকা : ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান-১০ লঞ্চে যেভাবে আগুন লাগতে পারে, তা নিয়ে কথা বলেছেন লঞ্চটির মালিক ও কর্মীরা। ইঞ্জিন কক্ষে অগ্নিকাণ্ড থেকে এমন বড় ঘটনা ঘটতে পারে বলে কয়েকজন লঞ্চকর্মী মনে করছেন। লঞ্চটির মালিক বলছেন, গত অক্টোবর মাসে ইঞ্জিন বদলানো হয়েছিল। তবে সে জন্য নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নেওয়া হয়নি।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকার সদরঘাট থেকে বরগুনার উদ্দেশে রওনা হয় এমভি অভিযান-১০ নামের লঞ্চটি। দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ঝালকাঠি শহরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর সুগন্ধা নদীতে থাকা অবস্থায় তিনতলা লঞ্চটিতে হঠাৎ আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুতই আগুন পুরো লঞ্চে ছড়িয়ে যায়। শীতের রাতে লঞ্চের বেশির ভাগ যাত্রী তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৮ জন। প্রায় শতাধিক যাত্রী দগ্ধ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস বলছে, লঞ্চে এত বড় অগ্নিকাণ্ডের পেছনে ইঞ্জিন কক্ষে অগ্নিকাণ্ড একটি কারণ হতে পারে। ইঞ্জিন কক্ষে কাজ করেন—এমন কয়েকজন লঞ্চকর্মী জানান, লঞ্চের ইঞ্জিন কক্ষে ছোটখাটো আগুন লাগা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। এমন ঘটনা ঘটে। বেশির ভাগ সময় লঞ্চের কর্মীরা তা নিভিয়েও ফেলেন। কিন্তু লঞ্চের ইঞ্জিনসংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, অভিযান-১০ লঞ্চের ইঞ্জিনে অত্যধিক তাপমাত্রা উৎপন্ন হয়ে থাকতে পারে। সেখান থেকেই আগুন লাগতে পারে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, আগুন লাগার পর লঞ্চটিকে তীরে ভেড়াতে ৪৫ মিনিটের বেশি সময় লাগে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই লঞ্চটিকে তীরে ভেড়ানো সম্ভব হলে প্রাণহানি এড়ানো যেত বলে মনে করছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন লঞ্চমালিক বলেন, বেশির ভাগ লঞ্চে রিকন্ডিশন্ড বা পুরোনো ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। এগুলো মূলত সমুদ্রগামী জাহাজের জেনারেটর ইঞ্জিন। ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দিলে ও তা না সারাতে পারলে প্রচুর তাপমাত্রা উৎপন্ন হয়।

এ ব্যাপারে অভিযান-১০ লঞ্চের মালিক হামজালাল শেখ বলেন, আগের ইঞ্জিন দুটিতে ত্রুটি থাকায় গত অক্টোবর মাসে ইঞ্জিন বদলানো হয়। ডকইয়ার্ডে উঠিয়ে ৭২০ অশ্বক্ষমতার দুটি ইঞ্জিন লাগানো হয়।

এভাবে ইঞ্জিন লাগানো যায় কি না, জানতে চাইলে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সার্ভেয়ার মাহবুবুর রশিদ বলেন, লঞ্চের কাঠামোগত পরিবর্তন বা ইঞ্জিন পরিবর্তন করতে হলে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে। অভিযান-১০ লঞ্চের ইঞ্জিন পরিবর্তনের আগে আমাদের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়নি।

এ ধরনের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি লঞ্চের মালিক হামজালাল শেখ।

এমভি অভিযান-১০–এর ফিটনেস সনদে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এতে ২০টি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ছিল। মালিক হামজালাল শেখ বলেন, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পরায় এসব কোনো কাজে আসেনি।ফিটনেস সনদ অনুযায়ী, এমভি অভিযান-১০ লঞ্চটি ২০১৯ সালে নির্মাণ করা হয়। এটির দৈর্ঘ্য ৬৪ মিটার ও গভীরতা ২ দশমিক ৮০ মিটার। বাংলাদেশ নৌপরিবহন অধিদপ্তরে লঞ্চটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ০১-২৩৩৯।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, আগুন লাগার পর লঞ্চটিকে তীরে ভেড়াতে ৪৫ মিনিটের বেশি সময় লাগে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই লঞ্চটিকে তীরে ভেড়ানো সম্ভব হলে প্রাণহানি এড়ানো যেত বলে মনে করছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

ঢাকা-বরগুনা নৌরুটে বর্তমানে ছয়টি লঞ্চের রুট পারমিট রয়েছে। মেসার্স আল আরাফ অ্যান্ড কোম্পানির এমভি অভিযান-১০ ছাড়া বাকি লঞ্চগুলো হচ্ছে মেসার্স খান ট্রেডার্স ও মেসার্স সুরভী পরিবহনের যৌথ মালিকানায় রাজারহাট-বি, পূবালী-১, শাহরুখ-২ ও রাজহংস-৮, এমভি ফারহান–৮। এমভি ফারহান–৮ লঞ্চটির মালিক জাতীয় পার্টির সাংসদ গোলাম কিবরিয়া।

যাত্রীদের অভিযোগ, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ও অধিক মুনাফার জন্য মালিকেরা রোটেশন পদ্ধতিতে লঞ্চ পরিচালনা করেন। এ পদ্ধতির কারণে যাত্রীর চাপ থাকলেও প্রতিদিন উভয় প্রান্ত থেকে মাত্র দুটি লঞ্চ চালানো হয়।

ফায়ার সার্ভিসের বরিশাল বিভাগের উপপরিচালক কামাল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, লঞ্চটির ইঞ্জিন কক্ষ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। একই রকম বক্তব্য দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী বরগুনার যাত্রী জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাত পৌনে একটায় বরিশাল নৌবন্দর ত্যাগ করার পর লঞ্চটির পুরো ডেক উত্তপ্ত হয়ে যায়। শীত ও কুয়াশার কারণে ডেকের চারপাশ ত্রিপল দিয়ে আটকানো ছিল। রাত আড়াইটার দিকে লঞ্চটি ঝালকাঠি স্টেশন থেকে দেউরী এলাকায় আসতেই আগুন লাগে। কিছুটা দূরে এলে ইঞ্জিন কক্ষে আগুন ধরে যায়। এরপর আগুন পুরো লঞ্চের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর দাবি, লঞ্চের নিচতলার ইঞ্জিন কক্ষের পাশে ডিজেলভর্তি ড্রাম, দুটি মোটরসাইকেল ও রান্নার জন্য কয়েকটি গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। আগুন ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এসব দাহ্য পদার্থের ভূমিকা ছিল।

ইঞ্জিন কক্ষে তিনটি তেলের ট্যাংকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার লিটার তেল ছিল জানিয়ে হামজালাল শেখ বলেন, আগুন নিভে যাওয়ার পরও তেল থাকার কারণে ইঞ্জিন রুমের আগুন আরও দুই ঘণ্টা জ্বলে।

অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএর বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনার কারণ তদন্ত করার জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি করেছে। এই দুই কমিটি প্রতিবেদন দিলে বোঝা যাবে, কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর আগে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।

লঞ্চটির মালিকপক্ষ বলছে, লঞ্চে ২০টি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ১টি বালুর বাক্স, ১৫টি ফায়ার বাকেট ও ১টি পানির পাম্প ছিল। তবে লঞ্চের কর্মীদের অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ছিল কি না, তা বলতে পারেননি লঞ্চমালিক হামজালাল শেখ।