• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৫ Jul ২০২৪, ০৬:৫৬ পূর্বাহ্ন

সমীক্ষাহীন সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচপ্রকল্প : কৃষকের অনীহা : অকেজো হচ্ছে ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প


প্রকাশের সময় : এপ্রিল ১, ২০২৩, ১২:০৪ অপরাহ্ন / ৬০
সমীক্ষাহীন সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচপ্রকল্প : কৃষকের অনীহা : অকেজো হচ্ছে ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প

বিশেষ প্রতিনিধি : সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া প্রকল্প নেয়ার কারণে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় হচ্ছে। পৌনে চার বছর আগে নেয়া সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্পে কৃষকের আগ্রহ আনতে পাচ্ছে না বিদ্যুৎ বিভাগ। ফলে ব্যর্থতায় পর্যবাসিত হতে বসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নের ৪০৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি। আড়াই বছরের এই প্রকল্পটি দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও কৃষকের আগ্রহ টানতে পারছে না। এখন প্রকল্পের মেয়াদ সাড়ে ছয় বছরে উন্নীত ও ব্যয় ১৮৭ কোটি বৃদ্ধির প্রস্তাবে পরিকল্পনা কমিশন আগ্রহহীন। তারা এই প্রকল্পটি অসমাপ্ত রেখেই শেষ করার সুপারিশ করেছে বলে শিল্প ও শক্তি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, দুই হাজারটি পাম্প স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত আগ্রহী গ্রাহক বা কৃষক না পাওয়ায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ বাধার সম্মুখীন হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, কৃষি সেচের জন্য সোলার ফটোভোন্টিক পাম্পিং সিস্টেমের বিস্তার, সেচ মৌসুমে গ্রিডের ওপর বিদ্যুতের হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ হ্রাস করা এবং ডিজেল চালিত পাম্প পরিহারের মাধ্যমে দূষিত পদার্থের নির্গমন হ্রাসে সৌর বিদ্যুৎ চালিত সেচপাম্প ব্যবহারের জন্য উদ্যোগ নেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। যার বাস্তবায়নের দায়িত্ব বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (পবিবো)। এই লক্ষ্যে বাপবিবো কর্তৃক এডিবির ঋণসহায়তায় প্রকল্পটি গত ২০১৮ সালের ১৯ মে, মোট ৪০৭ কোটি ২০ লাখ ১৩ হাজার (জিওবি ৩৭.৯৪০৯ কোটি, প্রকল্প ঋণ ৩৬৭.৬২৫৭ কোটি এবং নিজস্ব ১.৬৩৪৭ কোটি টাকা) টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই, ২০১৮ থেকে ডিসেম্বর, ২০২০ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। পরে গত ২০২১ সালের ২১ মে কমিয়ে মোট ৩৯৩ কোটি ৭৪ লাখ ৯২ হাজার টাকা (জিওবি ৬৬.৯০৬০ কোটি, প্রকল্প ঋণ ৩২৪.১৫৫৮ কোটি এবং সংস্থার নিজস্ব ২.৬৮৭৪ কোটি) প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। যা জুলাই, ২০১৮ থেকে ডিসেম্বর, ২০২২ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পের প্রথম সংশোধন প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। বর্তমানে প্রকল্পের অঙ্গভিত্তিক ব্যয়ের হ্রাস বা বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তনসহ প্রকল্পের মেয়াদ আরো দুই বছর বর্ধিত করে মোট ৫৯৪ কোটি ৫৬ লাখ ২২ হাজার (জিওবি ৯৭.৮৮১৪ কোটি, প্রকল্প ঋণ ৪৭৮.৪৬৬০ কোটি এবং সংস্থার নিজস্ব ১৮.২১৪৮ কোটি) টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। দ্বিতীয় সংশোষিত আরডিপিপির ব্যয় অনুমোদিত প্রথম সংশোধিত আরডিপিপির তুলনায় ২০০ কোটি ৮১ লাখ ৩০ হাজার টাকা (৫১%) বেশি। প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হলো, প্রকল্প এলাকায় পাঁচ ক্যাটাগরির (২.২ কিলোওয়াটের ৫০০টি, ৪.০ কিলোওয়াটের ৫৩০টি, ৫.৫ কিলোওয়াটের ৫০০টি, ৭.৫ কিলোওয়াটের ৩২০টি এবং ১১.০ কিলোওয়াটের ১৫০টি) মোট দুই হাজারটি সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচপাম্প স্থাপন।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, এ প্রকল্পটি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের জন্য একটি ভিন্নধর্মী প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় দুই হাজারটি সৌর বিদ্যুৎ চালিত পাম্প স্থাপনের জন্য আগ্রহী গ্রাহকের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন করতে হবে। যা প্রকল্পের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ। এ কাজের সফলতার ওপর প্রকল্পের সামগ্রীক সাফল্য নির্ভরশীল। আগ্রহী গ্রাহক বা কৃষক সংগ্রহের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহায়তায় প্রকল্প এলাকার জনসাধারণের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্প স্থাপনের সুফলতা তুলে ধরে গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি, মাঠপর্যায়ে গ্রাহক উদ্বুদ্ধকরণ এবং গ্রাহক নির্বাচনের জন্য এক হাজারের বেশি মোটিভেশন সভা করা হয়। গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গ্রাহক উদ্বুদ্ধকরণের জন্য জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, প্রকল্প বিষয়ে ভিডিও প্রচার, মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রকল্পের তথ্যপ্রচার করা হয়েছে। যার ফলে ইতোমধ্যে ২ হাজার ৮৪৯ জন গ্রাহক সেচ কমিটির ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছেন। যার মধ্যে ১ হাজার ১৯৬ জন গ্রাহক সেচ কমিটির ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ পর্যন্ত ৬৩৩ জন গ্রাহক বা কৃষক প্রকল্পের আওতায় পাম্প গ্রহণের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। ২ হাজারটি পাম্প স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত আগ্রহী গ্রাহক বা কৃষক না পাওয়ায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ বাধার সম্মুখীন হয়েছে। অগ্রগতি সম্পর্কে জানা গেছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৩৫ শতাংশ। যার পেছনে অর্থ ব্যয় হয়েছে পৌনে চার বছরে সাড়ে ১৭ শতাংশ বা ৬৯ কোটি টাকা। যেখানে প্রকল্পের প্রাক্কলন ৪০৭ কোটি টাকা। পৌনে চার বছরে মোট ১৮০টি পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে আরো ১২০টি সাইটে পাম্প স্থাপন কাজ চলমান রয়েছে। পকিরল্পনা কমিশনের বিদ্যুৎ উইং বলছে, শুরুতে উপকারভোগী তথা কৃষকরা আগ্রহ দেখালেও বর্তমানে কৃষকরা আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তাই নতুন উপকারভোগী খুঁজে পেতে সময়ের প্রয়োজন বিধায় প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবনা করা হয়েছে। যেহেতু প্রকল্পের সরাসরি উপকারভোগীরাই অনীহা প্রকাশ করছে সেহেতু প্রকল্পটি এখানেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হবে কিনা তা নিয়ে আলোচনা করা দরকার। প্রয়োজনে মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনপূর্বক বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির উপযোগিতা বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য আইএমইডিকে অনুরোধ করা যেতে পারে। বর্তমানে কৃষকদের অনাগ্রহে প্রতীয়মান হয় যে প্রারম্ভে সঠিকভাবে সমীক্ষা করা হয়নি। এ ছাড়া প্রস্তাবিত দ্বিতীয় সংশোধনীতে নতুনভাবে কোনো সমীক্ষা করাও হয়নি। এ দিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের গত ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের ৫৫ নম্বর স্মারক মোতাবেক তিন ফসলি জমিতে সোলার প্যানেলসহ অন্যান্য উন্নয়ন-অবকাঠামো স্থাপন/নির্মাণ না করার নির্দেশনা রয়েছে।

ব্যয় বৃদ্ধির ব্যাপারে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ ভাইরাস সংক্রমণ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মাঠপর্যায়ের নির্মাণকাজ বন্ধ থাকা; মালামাল উৎপাদন, জাহাজায়ন ও আমদানি ব্যাহত হওয়া; বিভিন্ন সামগ্রী ও অন্যান্য মালামালগুলোর মূল্য বৃদ্ধিসহ উৎপাদন এবং জাহাজায়নের ওপর তথা বিশ্বের সরবরাহ চেইনের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। প্রকল্পের রাজস্ব অঙ্গে (প্রশাসনিক, পেট্রল লুব্রিকেন্ট, প্রিন্টিং স্টেশনারি, সম্মানী ও মেরামত রক্ষণাবেক্ষণ) ব্যয় ৬৬ লাখ টাকা হ্রাস এবং প্রকল্পের মেয়াদকাল বৃদ্ধিতে বেতন-ভাতাদি, ভ্রমণ ব্যয়, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত সেবা অঙ্গে ব্যয় ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের মেয়াদকাল বৃদ্ধি, চলমান বৈশ্বিক সঙ্কটের কারণে বিশ্ববাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মার্কিন ডলার বিনিময় হার বৃদ্ধি পাওয়ায় মেশিনারি ও ইকুইপমেন্ট অঙ্গে মোট ১৫৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সিডি-ড্যাট ও ট্যাক্স অঙ্গে ৩০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া প্রাইস কন্টিনজেন্সি অঙ্গে ৯.৩২ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে মোট ২০০ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। মেয়াদ বৃদ্ধি ও প্রকল্প চলমান রাখায় আপত্তি জানিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছে, প্রকল্পটি ১ জুলাই, ২০১৮ থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০ মেয়াদে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা থাকলেও পরে প্রথম সংশোধনের সময় প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বৃদ্ধি করা হয়। এই দীর্ঘ সময়ে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশ। ফলে প্রতীয়মান হয় যে প্রকল্পটি সঠিক পথে অগ্রসর হচ্ছে না। প্রকল্পটির আর কোনো উপযোগিতা নেই।