• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:২০ অপরাহ্ন

সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মূলহোতা সোহাগ দেওয়ান যেন আরেক রিজেন্ট সাহেদ


প্রকাশের সময় : জুলাই ২৭, ২০২১, ১০:০৫ পূর্বাহ্ন / ২১৯
সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মূলহোতা সোহাগ দেওয়ান যেন আরেক রিজেন্ট সাহেদ

খুলনা অফিসঃ খুলনার কথিত সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ান। বিশেষ কিছু ছবির ক্ষমতাবলে রাতারাতি জিরো থেকে হিরো বনে যাওয়া এক দূর্ধর্ষ ব্যাক্তিত্ব। সাংবাদিকতার কার্ড ব্যাবহার করে দিনকে রাত ও রাত কে দিন করা যার কাছে খুবই তুচ্ছ বিষয়। গনযোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত প্রশাসনের কিছু উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগনের সাথে সোহাগের তোলা ছবি ও পরিচয়জ্ঞাপক  কার্ডে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে তোলা ছবি যেন মনে করিয়ে দেয় রিজেন্ট হাসপাতালের শাহেদের কান্ডের ঘটনা। তবে  গ্রামবাংলার একটি উক্তি “পাপ ছাড়ে না নিজের বাবাকেও” এ কথাটা হয়ত একেবারেই ভুলতে বসেছিলেন সোহাগ দেওয়ান।
ধরে নেওয়া যাক সোহাগ দেওয়ান একটি সিনেমার নায়ক। সিনেমার প্রথম দৃশ্যপটে দেখা যায় সুন্দরবনের গহীন জঙ্গলে কর্দমক্ত অবস্থায় র‍্যাব সদস্যদের সাথে ঘুরে ঘুরে বনদস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোয় সহযোগিতা করবার চিত্র। রাষ্ট্রীয় কাজে সহযোগীতা করে পেয়েছেন সম্মাননা । প্রশংসনীয় এ কাজের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তৎকালীন র‍্যাব মহাপরিচালকের নিকট থেকে রাষ্ট্রীয় পদকও পান তিনি। সম্মাননার এই বিশেষ মুহূর্তগুলো ও সুন্দরবনে অভিযান চলাকালীন সময়ে র‍্যাব সদস্যদের সঙ্গে তোলা ছবি স্মরণীয় করে রাখতে সোহাগ এসব ছবি গনযোগাযোগ মাধ্যমে  পোস্ট করে একটি মহলে জায়গা করে নেয়। তবে কিছু দিন যেতে না যেতেই সোহাগ দেওয়ান বিভিন্ন মহলে এসকল ছবির নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ও বেসরকারী টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রকাশ পায় তার খলনায়কীয় রূপ। জানা যায় কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। সম্প্রতি একুশে টিভির একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, পূর্ব বসবাস স্থান মোংলায় একসময় জলদস্যুদের  হয়েও চাঁদা গ্রহণ করতেন সোহাগ। সেখানকার কিছু ব্যাক্তি  জানান , নিন্ম আয়ের মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও ডাকাত দলের হয়ে নিয়মিত অর্থ গ্রহণ করতেন তিনি। নিয়মিত চাঁদা না দিলে মারধোর ও করতেন বলে জানান তারা। এসকল ঘটনা টিভি চ্যানেলে প্রকাশ হলে সোহাগের ভিতরের চেহারা ফাঁস হয়ে যায়। নায়কের চরিত্র থেকে বনে যান খলনায়ক। বেরিয়ে আসে সুন্দরবন জয়ের পেছনের গল্প। যে সোহাগ দেওয়ান ডাকাত ও বনদস্যুদের হয়ে নিয়মিত চাঁদা তুলতেন, সেই সোহাগ দেওয়ানই বনদস্যুদের আত্মসমার্পণ করিয়ে পেয়েছে বিশেষ সম্মাননা। কেউ কেউ ভাবছেন, প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের নজরে আসার জন্যেই হয়ত সুন্দরবনে বনদস্যু জয়ের গল্পটি নিজ হাতে লিখেছেন তিনি।
জানা যায়,নিজ এলাকা মোংলা থেকে খুলনা এসে প্রথমে চার্জিং ব্যাটারী ও বৈদ্যুতিক বাল্ব  ভাড়া দিয়ে কোন রকমে জীবনযাপন করতেন সোহাগ দেওয়ান। বিভিন্ন সড়কে ফেরি করে বেড়ানো সবজি বিক্রেতাগন এই ব্যাটারী ও বাল্ব ভাড়া নিতেন সোহাগ দেওয়ানের কাছ থেকে। সেখান থেকে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। কোন এক মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন খুলনার সংবাদকর্মীদের সাথে। সেখান থেকেই সমাজের উচ্চ ও বিত্তবান মানুষের সাথে পরিচয় এবং এই আবাধ বিচরণ।
এর কিছুদিন পূর্বে সোহাগ দেওয়ানের বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ শারিরীক নির্যাতন ও অর্থ আত্মসাতের কিছু ভিডিওচিত্র দৃশ্যমান হয় স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল” আর টিভি” তে। নিখোঁজ শিশু সন্তানকে খুঁজে দেয়ার নামে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে সেই ভিডিও ভাইরাল করে দেওয়ার ভয়ভীতি প্রদানের অভিযোগ সোহাগের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী দেওয়া তথ্যমতে, প্রশাসনের ভীতি প্রদর্শন করে দলবলসহ ধর্ষণের ভিডিওগুলো ভাইরাল করার হুমকিসহ সোহাগ দেওয়ানের সকল অনৈতিক কার্যকলাপ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরই এগুলো ধামাচাপা দেওয়ার জন্য একের পর এক মিথ্যা অপপ্রচার ছড়িয়েছেন বিভিন্ন গনমাধ্যমে।
এই মিথ্যা অপপ্রচারের প্রতিবাদে সোমবার (১২ই এপ্রিল) খুলনা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করেন সোহাগ দেওয়ানসহ সহোযোগী এডভোকেট মেহদী হাসানের নিকট নির্যাতনের স্বীকার ভুক্তভোগী। তিনি জানান সোহাগ দেওয়ানের সাথে তার পরিচয় হয় ২০১৭ সালে। সে সময় তার তার ছেলে মৌসুম হাসান নীল হারিয়ে গেলে খুলনা প্রেসক্লাবে এসে সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনের লিখিত কপিতে নাম ও মোবাইল নম্বর নিয়ে ফোনালাপ শুরু করেন সোহাগ দেওয়ান। একপর্যায়ে নিজেকে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন সাংবাদিক এবং র‍্যাব ও পুলিশ বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিয়ে হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ্য, ঢাকায় অবস্থানকালে ভুক্তভোগী নিকট থেকে সন্তান উদ্ধারের কথা বলে স্ট্যাম্পের চুক্তি অনুযায়ী ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার টাকা নেয় সোহাগ দেওয়ান। কিছুদিন পরেই “ছেলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে”, এরুপ একটি সংবাদ দিয়ে ভারতে যাওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। ছেলেকে পাওয়ার আশায় মরিয়া হয়ে ভারতে যেতে দ্বিধাবোধ করেন নি ভুক্তভোগী নারী ।
ভুক্তভুগী ধর্ষিতানারীর তথ্যমতে, ছেলের সন্ধানে ভারতে গিয়ে সোহাগ দেওয়ান বন্ধু বান্ধবীদের নিয়ে ভিন্ন কামরায় ফূর্তিতে মেতে থাকতেন সর্বদা। ছেলের প্রসঙ্গে কথা বললে, বিভিন্ন আশানুরূপ কথা বলে সোহাগ বলেন আরো একবার ভারত আসতে হবে, এবার পাওয়া যাই নাই। একথায় ভুক্তভোগী মনি বুজতে সক্ষম হন সোহাগ প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন এবং তখনই একা বাংলাদেশে ফেরত আসেন ও উকিল নোটিশের মাধ্যমে চুক্তির টাকা ফেরত চান। পরে খুলনা থানায় একটি জিডি করলে, জিডি তোলার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন সোহাগ দেওয়ান এবং কিছু টাকা দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন তিনি। জিডি তোলার প্রসঙ্গে খুলনা থানার তদন্ত কর্মকর্তা অনুরোধ করলে জিডিটি উত্তোলন করে নেন ভুক্তভোগী ।
পরবর্তীতে টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্দেশ্যে সোহাগ দেওয়ান তার নিজস্ব বাসায় নিয়ে যান । সে সময় সোহাগ দেওয়ানের সহযোগী এ্যাডভোকেট মেহেদী পূর্বেই উপস্থিত ছিলেন । বাসায় তার স্ত্রীর অনুপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ভুক্তভোগী মনিকে শরবতের সাথে চেতনানাশক ঔষধ মিশিয়ে আপ্যায়ন করেন। একপর্যায়ে মনি চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করেন এবং শরীরের সকল শক্তি হারিয়ে যায়। এর পরে শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। বেশ কিছুক্ষন অচেতন অবস্থায় থাকার পর সোহাগ ও মেহেদী শরীরে পানি ঢেলে দেওয়ায় জ্ঞান ফিরে পায় এবং উপলব্ধি করতে পারেন তার শরীরে কোন কাপড় নেই। তখন তিনি বুঝতে সক্ষম হন যে ধর্ষণের স্বীকার হয়েছেন ।
তিনি আরো জানান, কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর, সোহাগ দেওয়ান ও মেহেদী হাসান বলেন, ” টাকা দিতে পারব না, যা পারিস তাই কর। এই দেখ তোর খোলামেলা ভিডিও, ধর্ষণের সব ভিডিও রেকর্ড করেছি। সকল ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল করব। টাকা চাইলে তোর জীবন শেষ করে ফেলব, এখন থেকে যা বলব তাই করবি । পুলিশ প্রশাসন সব আমার হাতের মুঠোয়, তোকে গাজা দিয়ে ধরিয়ে দিব ।”
ভুক্তভূগী জানান, “অচেতন অবস্থায় শারীরিক নির্যাতনের কারনে শরীরে কম্পন হতে থাকে। এমতাবস্থায় আমি সোনাডাঙা থানায় যাই এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে না পেয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি। তারা বিভিন্ন হুমকী ও ভীতি প্রদর্শনের এক পর্যায়ে আত্মসম্মানের কথা চিন্তা করে আমি তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করি। পরবর্তীতে মামলা না করেই আমি সোনাডাঙ্গা থানা ত্যাগ করি। একদিকে ছেলে হারানোর চাপা কষ্ট অন্যদিকে টাকা আত্মসাৎ, তার পরে আবার নিজের সর্বশরীর বিলীন হয়ে যাওয়া ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসি।
জানা যায়, এত কিছুর পরেও স্বাদ না মেটা ক্ষমতার মগডালে বসবাসকারি কথিত সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ান ও এ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান ক্ষ্যান্ত হন নি । এরপর প্রায়ই ভুক্তভোগীকে ভিডিও ফাসের ভয় দেখিয়ে ঢাকায় গিয়ে শারিরীক মেলামেশা করেন সোহাগ ও তার সহযোগী মেহেদী হাসান। দীর্ঘদিন এই কষ্ট সহ্য না করতে পেরে একপর্যায়ে মুগদা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ সংশোধনী ২০০৩ এর ৯(৩)/১০/৩০ একাধিক ব্যাক্তি কর্তৃক ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানি ও সহায়তা করার অপরাধে একটি মামলা দায়ের করি, যার নং – জি আর ৪১/১৫৭.
জানা যায়, মামলা টি করবার পরে আরো বেপোরোয়া হয়ে ওঠে সোহাগ দেওয়ান। প্রশাসনের আস্থা অর্জনকারী সোহাগ দেওয়ান প্রশাসনেরই নাম ভাঙ্গিয়ে এখনো নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে ভুক্তভোগীকে।
ভুক্তভূগী অভিযোগ করেন, তার এসকল কর্মকান্ড ঢাকার জন্য বিভিন্ন অপপ্রচারও চালান সোহাগ ।  বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টালে ভুক্তভোগী ও তার ভাই বিরুদ্ধে মাদক ও ইন্ডিয়ান ঔষধ বিক্রির বিভিন্ন অপপ্রচার চালান তিনি। তিনি আরো জানান, ফেসবুক মেসেঞ্জারে সোহাগ দেওয়ান এসব মামলা উঠিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেন।
সন্তানকে ফিরে পেতে ধর্ষণের স্বীকার ভুক্তভোগী সুবিচারের আশায় দীর্ঘদিন বিভিন্ন মহলে ঘুরলেও ক্ষমতাবলে সোহাগ ও তার অন্যান্য সহযোগীরা আইনের চোখ ফাকি দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। অনেক কাঠখড় পোহানোর পর বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) ভোরে যাত্রাবাড়ি এলাকা থেকে সিআইডির একটি বিশেষ টিম সোহাগ দেওয়ানকে গ্রেপ্তার করে। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মুক্তা ধর জানান, ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষন ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আসামীর সম্ভাব্য লুকিয়ে থাকার সকল স্থানে অভিযান চালানো হয়। পরে সিআইডির একটি চৌকস দল আসামীর অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে।