• ঢাকা
  • শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৭:৪০ অপরাহ্ন

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যস সংকট চলছে


প্রকাশের সময় : এপ্রিল ৭, ২০২৩, ১১:২৩ অপরাহ্ন / ৪৯
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যস সংকট চলছে

এম রাসেল সরকার, ঢাকাঃ রমজান মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যস সংকট চলছে। বিশেষ করে সেহরি ও ইফতারের সময় গ্যাসের সংকটের কারণে রান্নায় সমস্যা হচ্ছে। এতে বেড়েছে দুর্ভোগ। এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে, এর মধ্যে গ্যাস সংকট যেন মরার ওপার খাঁড়ার ঘা। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সংগতি না থাকায় বাইরের থেকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে ইফতার কিনে খাওয়ায় তৈরি হচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। শুধু রমজান মাস নয়, সারাবছরই কমবেশি এ সংকট লেগে থাকে।

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। বাড়তি চাহিদা পূরণে গ্যাস উৎপাদনকারী বিদেশি কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা যেমন বাড়ছে, একইসঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির দিকেও ঝুঁকছে দেশ। নিজেদের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর দৌড়ে দেশি কোম্পানিগুলো অনেকাংশেই পিছিয়ে রয়েছে। মাত্র বিশ-পঁচিশ বছর আগেও দেশে গ্যাস উৎপাদনের পুরোটাই ছিল দেশি কোম্পানিগুলোর হাতে। কিন্তু দুই দশকের ব্যবধানে এ খাতের অর্ধেকেরও বেশি দখলে নিয়েছে বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি। গ্যাস উৎপাদনে এই বিদেশনির্ভরতা নিকট ভবিষ্যতেই ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশীদ মোল্লাহ বলেন, রমজানে গ্রাহকদের গ্যাস সংকটে পড়তে হচ্ছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি আবার শুরু হলেও তা আগের তুলনায় কম। এ ছাড়া ঢাকা ও আশপাশের এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেশি হওয়ায় আগের চেয়ে গ্যাসের চাহিদাও বেড়েছে। এ ছাড়া রমজানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকেও (পিডিবি) গ্যাস দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, তিতাসের এলাকাগুলোতে দৈনিক ২১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা আছে। কিন্তু আমরা এখন পাচ্ছি ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এখনো ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি। গ্যাসের এই সংকট পুরো গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত থাকবে। এদিকে শুধু আবাসিক খাতেই নয়, একই অবস্থা চলছে শিল্প কল-কারখানাতেও।

বৈশ্বিক বাজারে জালানির মূল্য অস্থিরতা এবং এলএনজি আমদানির কারণে বাংলাদেশে এর প্রভাবের কথা বলে জ¦ালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গত ১৮ জানুয়ারি শিল্পখাতে গ্যাসের দাম ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায়। চলতি বছরের শুরু থেকে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দামও তিন দফায় ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তারপরও গ্রাহক চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস-বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। শিল্প-কারখানার মালিকরা বলেছেন, আগামী ঈদ টার্গেট করে প্রতিটি কারখানায় এখন বিপুল পরিমান অর্ডার আছে। দেশি বিদেশী এসব অর্ডার যথা সময়ে শেষ করতে হলে এখন দিনরাত ফ্যাক্টরী চালানোর কথা। কিন্তু দিনের বেলায় অনেক এলাকার কারখানার চাকা ঘুরছে না গ্যাস সংকটে। দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সার কারখানা, সিএনজি স্টেশন, আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকেরা এমনিতেই ক্রমবর্ধমান গ্যাস সংকটে জর্জরিত।

রমজানে গ্যাসের চাহিদা বাড়ায় সংকট আরও বেড়েছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণাসূত্রে জানা যায়, দেশে গ্যাসের প্রকৃত চাহিদা বর্তমানে দৈনিক চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু নিজস্ব উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে জোগান দেওয়া হচ্ছে মাত্র তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এতে বিদেশ থেকে অনেক টাকায় গ্যাস আমদানি করেও চাহিদা পূরণ যাচ্ছে না। বড় একটি অংশ ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। কিন্তু গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর ওপর গবেষণা করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় উত্তোলন করা গেলে, নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমেই শতভাগ গ্যাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব। বর্তমানে নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা থেকে চাহিদা পূরণের সক্ষমতার ৭৫ শতাংশ মেটানো হচ্ছে।

এটিকে দ্বিগুণ করার মাধ্যমে শুধু সক্ষমতা নয়, ঘাটতিও মেটানো যেতে পারে। এদিকে উৎপাদন ঘাটতি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে সক্ষমতার ঘাটতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই জালানি নিশ্চিত করতে নিজস্ব উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। যে গ্যাসক্ষেত্রগুলো রয়েছে, সেগুলো থেকে উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে। অফশোর গ্যাস ফিল্ডগুলোতে উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে। সীমান্ত এলাকায় ভারত ও মিয়ানমার অনেক বছর ধরে গ্যাস উৎপাদন করছে।

বাংলাদেশ এখনো অফশোর থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরুই করতে পারেনি। বর্তমানে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের যে সক্ষমতা, অফশোরে উত্তোলন সক্ষমতা বাড়াতে অর্থ বিনিয়োগও বাড়াতে হবে। ম্যান, মেশিন, টেকনোলজি- এ তিনের সমন্বয় করতে হবে। জানা গেছে, দেশে মোট চাহিদার মধ্যে বাপেক্স ১০৫ মিলিয়ন, বিজিএফসিএল ৬৪০ মিলিয়ন আর সিলেট দিচ্ছে ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এসব রাষ্ট্রীয় গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে ৮১৫ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ফিল্ডগুলো যেমন শেভরন দিচ্ছে ১ হাজার ৪১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। নিজস্ব সক্ষমতার মাধ্যমে দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলোর উৎপাদন বাড়াতে পারলে দৈনিক চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভর হতে হবে না। গবেষণাসূত্রে জানা যায়, নিজস্ব উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা পূরণে সর্বোচ্চ ১০ বছর সময় লাগবে।

নিজস্ব গ্যাস ফিল্ডগুলোর উন্নয়ন করে ২০৩০ সালের মধ্যে নিজস্ব সক্ষমতায় তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্য নির্ধারণ করলে তখন অফশোর থেকেও গ্যাস উত্তোলনের তাগিদ আসবে। ২০৩০ থেকে ২০৪০ সাল সময়কালকে লক্ষ্য হিসেবে নিলে সব মিলিয়ে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন সম্ভব। এজন্য নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে মনযোগী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন জালানি বিশেষজ্ঞরা।