• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৪ মার্চ ২০২৩, ০২:১৯ পূর্বাহ্ন

মুন্সিগঞ্জে খাল ভরাট করে বাড়ি-ঘর ও স্থাপনা তৈরি 


প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ৬, ২০২৩, ৭:১০ অপরাহ্ন / ১৭
মুন্সিগঞ্জে খাল ভরাট করে বাড়ি-ঘর ও স্থাপনা তৈরি 

নিজস্ব প্রতিবেদক,মুন্সিগঞ্জঃ খালটি দিয়ে এক সময় নৌকাচলত। বর্ষা মৌসুমে জোয়ার-ভাটার পানি আসত। পানির সঙ্গে পলি এসে বাড়াত জমির উর্ভরতা। এ খাল বেয়েই সরত আশপাশ এলাকার বৃষ্টির পানি। তবে গত কয়েক বছর ধরে স্থানীয় ব্যাক্তিরা খাল দখল করে ভরাট করে ফেলেছে।সেখানে করেছেন বাড়ি-ঘর,রাস্তা। ফলে অস্তিত্ব হারিয়ে গেছে এ খালের। খালটি মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার দেওভোগ ও শিলমন্দি মৌজায় অবস্থিত।

মুন্সিগঞ্জ পৌরসভা ভূমি অফিস সুত্রে জানা যায়, খালটি মুন্সিগঞ্জের সদর উপজেলার দেওভোগ মৌজার আর এস ম্যাপে ২৯৩ ও শিলমন্দি মৌজার আর এস ২৯২দাগে মধ্যে অস্থিত। তবে মৌজা দুটির সিএস ও এস এ প্ররচায় ব্যাক্তি মালিকানা।খালটি কাটাখালি নামে অন্য একটি খাল থেকে উৎপত্তি হয়ে উত্তর দিকের দেওভোগ মৌজা হয়ে শিলমন্দি মৌজায় এসে মিশেছে।সেখান থেকে মুন্সিগঞ্জ মৎস্য অফিসের দিকে গেছে। খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় এক কিলোমিটার।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় আবুল হোসেন,নজরুল ইসলাম, হারুন অর রশিদ গাজী, ইউসুব আলী হাওলাদার, মফিজল হক হালদার, ইয়াসিন মাদবর, গোলাম নবীন নামে কয়েকজন খালটি ভরাট করে নিয়েছেন। এদের মধ্যে আবার হারুন অর রশিদ গাজী ও নজরুল ইসলামরা তাদের পৈত্রিক সম্পদের সঙ্গে খালও বিক্রি করে দিয়েছেন।

রোববার সরেজমিনে গেলে দেওভোগ অংশে খালের অস্তিত্ব চোখে পড়ে। ২৫-৩০ ফুট চওড়া খালটির দুপাশ ভরাটের কারনে এখন ১০-১৫ ফুট নালার মত রয়েছে। তবে শিলমন্দি মৌজার সব টুকু খাল একেবারেই দখল হয়েগেছে।কোন কোন অংশে হয়েছে বাড়ি-ঘর। দুই মৌজার সংযোগ স্থলে আবুল হোসেন খাল ভরাট করে দেয়াল নির্মান করে রেখেছেন।

খাল দখলের বিষয়ে আবুল হোসেন বলেন, এটি শুধু মাত্র আরএসএ খাল ছিল।এ খাল আমি একা নই,অসংখ্য মানুষ দখল করেছে। খালটি নাল হয়ে গেছে।কেউ কেউ নামজারি করে বিক্রিও করে দিয়েছেন। সরকার যদি সবারটা উচ্ছেদ করে আমিও ছেড়ে দেব।

আবুল হোসেনের দখল থেকে খালের সীমানা ধরে উত্তর দিকে সামনে এগুতেই দেখা গেল ভরাট করা খালের উপরেই ইউসুব আলী হাওলাদারদের বাড়ি ঘর। মো.শাহ আলম নামে আরো এক ব্যাক্তি বহুতল পাকা ভবন নির্মান করেছেন।

ইউসুব আলী হাওলাদারদের স্ত্রী বলেন, ৬-৭ বছর ধরে তারা এখানে বাড়ি করে থাকছেন।তাঁরা কোন খাল দখল করেননি।যে জায়গায় তাদের বাড়ি এটা তার স্বামী পৈত্রিকভাবে পেয়েছেন।

মো.শাহ আলম বলেন, তার খালের উপর বাড়ি করেননি।হারুন অর রশিদ গাজিদের কাছ থেকে জমি জমি কিনেছেন।সেখানেই তাদের দালান করা হয়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানান,খালটি বৃটিশ শাসন আমলের।২৫-৩০ ফুট চওড়া খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় দেড় কিলোমিটার। মাত্র ১০-১২ বছর আগে এ খাল দিয়ে নৌকা চলত।দেওভোগ, শিলমন্দি, কাটাখালি ও মুন্সিরহাট এলাকার লোকজন নৌকায় করে এ খাল দিয়ে যাতায়াত করত।দেওভোগ মৌজায় নালারমত খালের একটি অংশ আছে, শিলমন্দি প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে।

মুন্সিগঞ্জ পৌরসভা ভূমি কর্মকর্তা আবদুল ওয়াহেদ প্রথম আলোকে বলেন,এটি দৃশ্যমান খাল ছিল। আর এস ম্যাপেও খাল। তবে এটি রেকেডিও দভাবে মালিকানা সম্পদ। হয়তো এ বলে আগের ভূমি কর্মকর্তার নামজারি দিয়েছেন। অনেকে নামজারি করে নিয়েছেন। তবে কীভাবে এটি ম্যাপে খাল হওয়া সত্ত্বেও নাল হল এটি আমার জানা নেই।

খাল দখল হওয়া কৃষি কাজে বিরম্বনাঃ খালটি দখল হওয়ায় শিলমন্দি ও দেওভোগ এলাকার অন্তত ২০০ একর তিন ফসলি কৃষিজমি চাষাবাদ করতে গিয়ে বিরম্বনার শিকার হচ্ছেন কৃষকরা।

খালটির প্রসঙ্গ তুলতেই দেওভোগ এলাকার কৃষক আব্দুস সাত্তার মুন্সি (৬৫) বলেন, জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দেওভোগ মৌজায় নিজেদের জমিতে কৃষিকাজ করছি। বাপ-দাদারাও এ কাজ করত। জমিতে তিন পর্যায়ে আলু, শাকসবজি, ধান, পাটের চাষাবাদ করতাম। ফসল আবাদে এ খালটি আমাদের একমাত্র ভরসা ছিল। খালের বিভিন্ন অংশ দখল হওয়ায় বৃষ্টির পানি নামতে পারেনা।এতে আবাদ করা কৃষিপণ্য নষ্ট হয়।

শিলমান্দি এলাকার আলমগীর মোল্লা বলেন, কৃষি ছিল প্রধান পেশা।দুই বছর আগেও নিয়মিত শিলমন্দির চকে(মাঠে) সাড়ে চার একর জমিতে আলু আবাদ করতাম।খাল ভরাট হওয়ায় পানি নিস্কাশন বন্ধ হয়ে যায়।বৃষ্টির সময় জমিতে আধাহাত পানি জমে থাকত।এতে অনেক টাকা লোকসান গুনতে হয়।এর পর বাধ্য হয়ে জমির চাষাবাদ ছেড়ে দিয়েছি ।

আরো এক ভুক্তভোগী কৃষক মো. সোহেল বলেন, বর্ষার পর জমি থেকে পানি সরে না। সেলো মেশিন ভাড়ায় এনে জমি থেকে পানি নিস্কাশন করতে হয়।এবার আলু লাগানোর মৌসুমে আলুর আবাদ করতে পারিনি।

এর আগে এ খাল রক্ষায় ২০১৮ সালে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারক লিপি দেন স্থানীয় শতাধিক কৃষক।এর পরও খাল উদ্ধারে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি জেলা ও উপজেলা প্রশান।

নদী বাঁচাও ও পরিবেশ আন্দোলন মুন্সিগঞ্জ শাখার সভাপতি এডভোকেট মুজিবুর রহমান জানান, খাসজমি-খাল দখল এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রভাবশালীরা স্বেচ্ছাচারী ভাবে এগুলো দখল করে নিচ্ছে। প্রশাসন থেকে খাল দখল উচ্ছেদের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকায় দখলদারিত্ব দিন দিন আরো বাড়ছে। ফসলি জমি রক্ষার জন্য খালটি উদ্ধারে প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া খু্ব জরুরি।

খাল খনন ও উচ্ছেদের বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)স্নেহাশীষ দাশ প্রথম আলোকে বলেন, যেসব স্থানে খাল দখল রয়েছে। সেখানে উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়া হবে। খালটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।