• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০৩:৪১ পূর্বাহ্ন

বিরোধী শিবিরে আন্দোলনের ছক, থেমে নেই ভোটের প্রস্তুতিও


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৯, ২০২২, ৫:০৬ অপরাহ্ন / ২০
বিরোধী শিবিরে আন্দোলনের ছক, থেমে নেই ভোটের প্রস্তুতিও

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, ঢাকা:  বর্তমান সরকারের পতন ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিরোধী দলগুলো আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের দিকেও হাঁটছে। বিএনপিসহ চরম বাম ও ডান মিলে সাতদলীয় গণতান্ত্রিক জোট এবং অন্যান্য ছোটখাটো বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের পাশাপাশি দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য সংগঠনের শক্তিবৃদ্ধি করতে তৎপর হয়ে উঠেছে। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে দলের প্রার্থী বাছাই কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে তারা। বিরোধী দলগুলোর একাধিক নেতার সঙ্গে আলোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা জাতীয় সরকার কিংবা নির্বাচনকালীন সরকার, অর্থাৎ যে নামেই ডাকা হোক না কেন এই দাবি আদায়ের জন্য যুগপৎ আন্দোলন করবে বিরোধী দলগুলো। কিন্তু যুগপৎ আন্দোলন নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক কমিটমেন্ট বা রূপরেখা কোনোটাই এখনও পরিষ্কার হয়নি। ফলে যুগপৎ আন্দোলন কবে থেকে শুরু হবে তা নিয়ে ধোঁয়াশায় অন্যান্য বিরোধী দলগুলো। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে যুগপৎ আন্দোলন নিয়ে মাঠে থাকার লক্ষ্য বিরোধী দলগুলোর। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতিতে ডিসেম্বরে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করতে পারছে না তারা। ডিসেম্বরে বিএনপির মহাসমাবেশের পর আন্দোলনের ধরন কেমন হবে তা স্পষ্ট হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সূত্র বলছে, বিএনপি আন্দোলনের মাঠে রয়েছে, অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের শক্তি-সমর্থন নিয়ে পৃথকভাবে মানববন্ধন-বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে। বিএনপি ছাড়া বেশিরভাগ দল সাংগঠনিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকায় এককভাবে বড় ধরনের কর্মসূচি পালন করতে পারছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির আন্দোলন দৃশ্যমান। কিন্তু অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন দৃশ্যমান হচ্ছে না। এসব ছোটখাটো দল ও জোটগুলো শেষ পর্যন্ত উজানে হাঁটবে না। জোয়ারের দিকে পাল তুলে দিবে। বাম ডান মিলে সাত দলীয় গণতান্ত্রিক জোটও জোয়ারে পাল তুলে সামনে এগুবে। এসব ছোটখাটো দল ও জোট নির্বাচনমুখী হবে। সে জন্য তারাও নিজ নিজ দলের মধ্যে যোগ্যপ্রার্থী যাচাই বাছাই শুরু করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের সময় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপিসহ সকল দল অংশগ্রহণ করেছিল। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনেও এরকম ফ্রন্ট সৃষ্টি হবে না তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হলে অনেক দলই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে। সরকারের পক্ষ থেকেও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে—বিএনপির একটি অংশ নির্বাচনে অংশ নেবে। তারাও তাদের দলীয় প্রার্থী যাচাই-বাছাই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার এ ব্যাপারে বলেন, নির্বাচনের বাকি এখনও ১ বছর ৪ মাস। এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে যা দেখছি তা ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া। নির্বাচন যখন ঘনিয়ে আসবে তখন টু দ্য পয়েন্টে কেউই থাকবে না। পরিবর্তন হবে। বর্তমানে যা চলছে তা অস্বাভাবিক নয়, স্বাভাবিক।

৭ দলীয় গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা বলছেন, বিএনপির লক্ষ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারের পতন ঘটিয়ে সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে ক্ষমতায় যাওয়া। আমাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, সংবিধানের পরিবর্তন ইত্যাদি। বিএনপির সঙ্গে আমাদের নীতি-আদর্শের অনেক ক্ষেত্রেই মিল নেই। মিল আছে শুধু সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ইস্যুটিতে। তাদের মতে, বিএনপি সরকার গঠন করলে সেই সরকার রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থাসহ সংবিধানের পরিবর্তন ইত্যাদি মেনে নিবে কিনা, সে অঙ্গিকার জাতির সামনে করেনি। ফলে বিএনপির সঙ্গেও তাদের অনেক ইস্যুতে অমিল রয়েছে।

অপরদিকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য জাতীয় পার্টিসহ বাম রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ প্রস্তুত। তারা চায় ইভিএম পদ্ধতি বাতিল। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের একাধিকবার বলেছেন, জাতীয় পার্টি তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি মানে না। তার ভাষায়, দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচন হতে পারে। সে জন্য আন্তরিকভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে বেগম রওশন এরশাদ এক্ষেত্রে বলেছেন, ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণের পক্ষে তিনি। এ থেকেই মনে করা হচ্ছে, জি এম কাদের নির্বাচনে অংশ না নিলেও, রওশন এরশাদ নির্বাচনে অংশ নেবেন। বর্তমান জাতীয় পার্টির দলীয় সংসদ সদস্যরা তার সঙ্গেই থাকবেন। উল্লেখ্য, জাতীয় পার্টি ইতোমধ্যে ৫২টি আসনে প্রার্থীও চূড়ান্ত করেছে।

এদিকে এ সব বিষয় নিয়ে গণফোরাম মন্টু গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না। এই প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। পাশাপাশি নির্বাচনের জন্য যোগ্য প্রার্থী বাছাই করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনের জন্য দুই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি। তার মধ্যে এককভাবে নির্বাচন করলে গণফোরাম সারাদেশে ৫০ থেকে ৬০ জন প্রার্থী দেবে। আর জোটে থেকে নির্বাচনে অংশ নিলে আলোচনা সাপেক্ষে প্রার্থী দেওয়া হবে। নির্বাচনের জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।

গত নির্বাচনেও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করার দাবি উঠেছিল। ওই সময় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপিসহ সকল দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। আগামী নির্বাচনেও এমনটি হতে পারে বলে মনে করেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, আমাদের অবস্থান হলো দলীয় সরকারের অধীনে নো ইলেকশন। গত নির্বাচনে দেশে যাতে হানাহানি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভূমিকা রেখেছিল। আগামী নির্বাচনে গতবারের মতো কোনো পদক্ষেপ কেউ নেবে তা মনে হচ্ছে না। তারপরও সরকারের তৎপরতা থাকবে। পরিস্থিতি কী হয় তা এখনো পরিষ্কার নয়। বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যাবে না।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, নির্বাচনের জন্য সব দলের প্রার্থী থাকে। আমাদের নতুন দল। সে হিসেবে আমাদেরও প্রার্থী আছে। আন্দোলনের পাশাপাশি আমরা প্রার্থী বাছাইয়ের কাজটিও করছি।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (রব) এক নেতা নাম গোপন রাখার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, যুগপৎ আন্দোলন করার বিষয়টি থমকে আছে। বিএনপির কাছ থেকে সুস্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায়নি। বিএনপির সঙ্গে আমাদের মতে অনেক পার্থক্য রয়েছে।আমরা সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন বিবেচনায় নিচ্ছি না। আমরা সরকার পতনের পর শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনসহ সংবিধানের পরিবর্তন চাচ্ছি। নির্বাচনকালীন জাতীয় সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চাচ্ছি। বিএনপি এসব ক্ষেত্রে পরিষ্কার কিছু বলছে না। এসব বিষয় নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আবারো সংলাপ হবে। এরপর যুগপৎ আন্দোলন করব কি করব না তা ঠিক করা হবে। তিনি জানান আন্দোলনের পাশাপাশি তার দল থেকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রার্থী যাচাই-বাছাই এর কাজ অব্যাহত রয়েছে।