• ঢাকা
  • সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:০০ অপরাহ্ন

পুরো রমজান জুড়ে তীব্র গ্যাস-সংকট


প্রকাশের সময় : এপ্রিল ৩, ২০২৩, ৪:৩২ পূর্বাহ্ন / ৬৭
পুরো রমজান জুড়ে তীব্র গ্যাস-সংকট

এম রাসেল সরকার, ঢাকাঃ পুরো রমজান মাস জুড়ে রাজধানীতে গ্যাস সংকট চলছে । ইফতার আর সেহরির সময় এই সংকট আরো তীব্র। সংশ্লিস্টরা বলেছেন, দেশজুড়ে চলমান গ্যাস সংকটের নিরসন সহজে হচ্ছে না। আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভর করে সংকট নিরসনের আশা দেখানো হয়েছিল। কিন্ত ডলার সংকটের কারণে সেটাও কার্যকর হচ্ছে না। দেশে বিদ্যমান কিংবা নতুন কোনো ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ থাকলেও আপাতত সেখানে সুফল মিলছে না।

সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রমজান মাসের প্রথম দিন থেকেই রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। সেহরি বা ইফতারী তৈরির সময় এসব এলাকায় গ্যাস একদমই থাকছে না। শুধু রাজধানী নয় আবাসিক গ্যাস সংযোগ রয়েছে এমন জেলাগুলোতে একই অবস্থা। এতে ইফতার তৈরিসহ রান্নার কাজে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রাজধানীর বাসিন্দাদের। বাধ্য হয়ে বাইর থেকে ইফতার বা সেহরি সামগ্রী কিনে খেতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, সারাদিন সিয়াম-সাধনা শেষে ইফতারের অপেক্ষা করেন রোজাদারেরা। কিন্তু গ্যাসের অভাবে রাস্তার পাশের ফুটপাতের দোকান থেকে অস্বাস্থ্যকর ইফতার কিনতে হচ্ছে। অনেকে হোটেলের খাবার খেয়ে রোজা রাখছেন।

একই অবস্থা চলছে শিল্প কল-কারখানাতেও। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা এবং এলএনজি আমদানির কারণে বাংলাদেশে এর প্রভাবের কথা বলে জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গত ১৮ জানুয়ারি শিল্পখাতে গ্যাসের দাম ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায়। চলতি বছরের শুরু থেকে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দামও তিন দফায় ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তারপরও গ্রাহক চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস-বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। শিল্প-কারখানার মালিকরা বলেছেন, আগামী ঈদ টার্গেট করে প্রতিটি কারখানায় এখন বিপুল পরিমান অর্ডার আছে। দেশি বিদেশী এসব অর্ডার যথা সময়ে শেষ করতে হলে এখন দিনরাত ফ্যাক্টরী চালানোর কথা। কিন্তু দিনের বেলায় অনেক এলাকার কারখানার চাকা ঘুরছে না গ্যাস সংকটে।

দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সার কারখানা, সিএনজি স্টেশন, আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকেরা এমনিতেই ক্রমবর্ধমান গ্যাস সংকটে জর্জরিত। রমজানে গ্যাসের চাহিদা বাড়ায় সংকট আরও বেড়েছে। পৈট্রোবাংলা জানায়, দেশে এখন দিনে গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুট। সর্বোচ্চ সরবরাহ করা হয় ৩০০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসে ২২৫ থেকে ২৩০ কোটি ঘনফুট। আর বাকিটা এলএনজি আমদানি করে মেটানো হয়। ২০৩০ সালে দিনে গ্যাসের চাহিদা হবে ৫৬০ কোটি ঘনফুট। এর কতটা আমদানি করে মেটানো হবে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি পেট্রোবাংলা।

বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ধানমন্ডি জিগাতলা, মিরপুর, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর মুগদা মানিকনগরসহ বেশ কিছু এলাকায় গ্যাসের সংকট চলছে। এবিষয়ে গ্রাহকরা আমাদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এই সমস্যা সমাধানের জন্যে তিতাস কর্তৃপক্ষ যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আর কী করার আছে! এখানে গ্যাসের সিস্টেম লসের নামে তিতাস যদি চুরিটা বন্ধ করতে পারতো, তাহলেও এই সংকট এতো তীব্র হতো না।

গত সপ্তাহে এক অনুষ্ঠানে জ্বালানী উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেছেন, চলমান সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়িয়েছে। একারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখন সহনীয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি সামনের দিনে জ্বালানির বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব না ফেললে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি এখনকার মতোই ভালো থাকবে।

এদিকে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে রাজধানীর টিকাটুলি, মালিবাগ, শাহজাহানপুর, মগবাজার, আজিমপুর, লালবাগ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, আদাবর, মধুবাজার, হাজারীবাগ, মিরপুর, এলিফ্যান্ট রোড, মতিঝিল, সেগুনবাগিচা, মানিকনগর, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, শনিরআখড়া, ওয়ারিসহ পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকায় বাসিন্দারা রমজানের প্রথম দিন থেকেই গ্যাস সংকটের কথা বলছেন।

মধুবাজার এলাকার বাসিন্দা মিজান জানান, রমজানে সেহরি ও ইফতারে রান্নার কাজে প্রয়োজনীয় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে ইফতারের সময় সামান্য আচে রান্না করতে হয়। ফলে ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলেও রান্না শেষ হয় না। ফলে ইফতারে প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য বাইরে থেকেই কিনে আনতে হচ্ছে। রায়েরবাগের বাসিন্দা ওমর ফারুক বলেন- ‘আমার এখানে গ্যাসের অনেক সমস্যা হচ্ছে। দুপুরের পর গ্যাস চলে যায়, আসে ইফতারের পর।

লালমাটিয়ার বাসিন্দা শেখ আবিদুর রহমান জানান, ‘প্রায় এক মাস ধরেই দুপুরের পরে প্রায়ই গ্যাস থাকে না। তাই রোজার আগে আগে সিলিন্ডার কিনেছি। এখন দুপুরে গ্যাস যায় আসে ইফতারের পরে। সিলিন্ডারের চুলায় ইফতারের ব্যবস্থা করছি।

পেট্রেবাংলার সুত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহে গ্রিডে গড়ে গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৮৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট। লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রায় ২৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি প্রয়োজন। তবে গত সপ্তাহে সরবরাহ আরও ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট বেশি ছিল। কিন্তু এরপরও রান্নাঘরে চুলায় গ্যাসের তাপ নেই বলে অভিযোগ তুলেছেন গৃহিনীরা।

তিতাস জানায়, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ আগের চেয়ে ভালো হলেও সব জায়গায় সমান গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে রাজধানীর কিছু কিছু এলাকায় গ্যাসের সমস্যা। যা অচিরেই কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিতাসের এক কর্মকর্তা বলেন, কারখানা আর বিদ্যুতে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন যদি বিঘিœত হয় তবে সেটি সুখকর হবে না। আর একটু গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি করা হলে গৃহস্থালিতেও সংকট থাকতো না। বিষয়টি নির্ভর করছে পেট্রোবাংলার ওপর। সরকারের তরফ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করার নির্দেশ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, গ্রীষ্ম মোকাবিলায় এলএনজির সরবরাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে পেট্রোবাংলা। আগামী জুন অবধি প্রতি দিন গ্রিডে ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হবে।

তিতাস মেট্রো দক্ষিণের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) প্রকৌশলী সামসুদ্দিন আল আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, ডিমান্ড-সাপ্লাইয়ের মধ্যে গ্যাপ (পার্থক্য) থাকার কারণে আগের থেকে সিস্টেমে একটু সমস্যা ছিলো। রমজান মাসে ইফতারিসহ অন্যান্য কাজে বেশি গ্যাস ব্যবহার হওয়ার কারণে গ্যাসের চাপ কমতে পারে। তবে আশার কথা হলো, সামনে গ্যাস আমদানি হবে এবং তখন গ্রাহকরা বেশি মাত্রায় গ্যাস পাবে।