• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০৩:০৩ পূর্বাহ্ন

দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা : বদলে যাচ্ছে জীবন-জীবিকা


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৬, ২০২২, ১২:১৬ পূর্বাহ্ন / ২৬
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা : বদলে যাচ্ছে জীবন-জীবিকা

মুস্তাইন বীন ইদ্রিস,খুলনা: নিজেকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার আশায় ১০ বছর ধরে হাঁস-মুরগির খামার করছেন স্বপ্না সানা। প্রায় প্রতি বছরই ঘূর্ণিঝড়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যায় তার খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেইসঙ্গে পুঁজি হারিয়ে অর্থ সংকটে পড়েন।স্বপ্না সানা খুলনার দাকোপ উপজেলার তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের গড়খালী সত্যপীর গ্রামের বাসিন্দা। স্বামী দিবস সানা দিনমজুরের কাজ করেন। ২০০২ সাল থেকে শিবসা নদীর পাড়ে তাদের বসবাস। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রতি বছর। প্রাকৃতিক দুর্যোগে খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করতেন স্বপ্না। এতে জীবিকা চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তবু টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।

শুধু স্বপ্না নন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুঁজি ও সম্পদ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে উপকূলীয় দাকোপ উপজেলার হাজারো পরিবার। আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাকে সঙ্গী করে চলতে হয় তাদের।

নিজেকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার আশায় ১০ বছর ধরে হাঁস-মুরগির খামার করছেন স্বপ্না
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতি বছরই দাকোপ উপজেলায় আঘাত হানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এতে সম্পদ, কৃষি ও খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখানের বাসিন্দারা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। হুমকিতে পড়ে জীবন-জীবিকা। প্রতিবারই পিছিয়ে পড়তে হয়। বেঁচে থাকার জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করতে হয়। জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে তাদের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তোলে। সেইসঙ্গে বদলে যায়, জীবন-জীবিকা নির্বাহ। ফলে দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে চলতে হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে কৃষিখাতে। গত কয়েক বছরে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নানা প্রকারের দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে যেমন—অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়। এতে সম্পদ ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। প্রতি বছর নষ্ট হয় কোটি কোটি টাকার সম্পদ।

আশার কথা হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দাকোপ ও কয়রার অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে লোকাল গভর্নমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (লজিক)। প্রকল্পের আওতায় জলবায়ু সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের স্বাবলম্বী করা ও পরিস্থিতির সঙ্গে টিকে থাকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে সংস্থাটি। এতে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন নারীরা।

স্বপ্না সানা বলেন, ‌জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। কৃষিজমি ও খামারে লবণাক্ত পানি প্রবেশ, দুর্যোগে খামারের হাঁস-মুরগি মারা যাওয়ায় আমার জীবন-জীবিকা হুমকিতে পড়ে। খামার করেছি লাভের আশায়, উল্টো পুঁজি ও সম্পদ হারিয়েছি। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সময় পুকুরের মাছ ভেসে গেছে, যা ছিল তা লবণাক্ত পানিতে মরে গেছে। মুরগির খামার লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। তিন বছর আগে আমার পাশে দাঁড়ায় লজিক। তাদের সহায়তায় এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছি।

যা বলছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা: পরিবেশ বিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন ও মিথেনসহ নানা ধরনের ক্ষতিকারক গ্যাস বৃদ্ধি পায়। এই গ্যাসগুলো বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে চলেছে। ফলস্বরূপ মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে, যার কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সমুদ্রের নিকটবর্তী নিম্ন অঞ্চলগুলো প্লাবিত হচ্ছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ায় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানিপ্রবাহ শুকনো মৌসুমে স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে না। ফলে নদীর পানির বিপুল চাপের কারণে সমুদ্রের লোনাপানি যতটুকু এলাকাজুড়ে আটকে থাকার কথা ততটুকু থাকে না, পানির প্রবাহ কম থাকার কারণে সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে লবণাক্ততা বেড়ে যায় উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায়।জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের দাকোপসহ দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্র ভূ-ভাগের অনেক ভেতর পর্যন্ত লোনাপানি ইতোমধ্যে ঢুকে পড়েছে। বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা দিনে দিনে আরও প্রকট হয়ে উঠবে।

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের প্রধান ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোস্তফা সারোয়ার বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে কেউ মুক্ত নয়। তবে এ অভিঘাতের বেশি শিকার উপকূলীয় নারীরা। তাদের সেনসিটিভিটি হাই। ফিজিক্যাল ও সামাজিক কারণেই এ অবস্থা। সামাজিক সিস্টেমের কারণে নারীদের দায়িত্ব পালন একটু ভিন্নতর। গ্রামীণ নারীরা পানি ও জ্বালানি সংগ্রহ করে থাকেন। এখন উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানি ও জ্বালানি দুষ্প্রাপ্য। সেই কাজটি নারীরাই করে থাকেন। এজন্য ব্যক্তিগত ও প্রজনন স্বাস্থ্যগত বিষয়ে নারীরা ক্ষতিগ্রস্ত। উপকূলের পানি ও মাটির পরিবর্তন লবণাক্ততার কারণে। লবণাক্ত পানি পানি অন্তঃসত্ত্বা নারীরা হাইপার টেনশনে ভোগেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে উপকূলীয় জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ও পরিবর্তন এসেছে। ফলে পরিবারের জন্য পুরুষ সদস্যকে বাড়ির বাইরে বেশি সময় দিতে হয়। এ কারণে নারীকে বাড়ির সব কাজ সামলাতে হয়। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, প্লাবন ও নদীভাঙনসহ সব দুর্যোগ নারীকে সামনে থেকে মোকাবিলা করতে হয়। দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে নারীর জন্য ব্যক্তিগত বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের উপকূলীয় আশ্রয়কেন্দ্র আধুনিক হলেও নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা এখনও হয়নি। ফলে দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আগে ও পরে নারীকে ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

লজিকের প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের অর্থায়নে রয়েছে ইইউ ও সুইডেন। কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ইউএনডিপি ও ইউএনসিডিএফ। ২০১৮ সালে খুলনায় প্রকল্প শুরু হয়। ২০১৯ সালে প্রকল্পের সিআরএফ (কমিউনিটি রেজিলেন্স ফান্ড)-এর কার্যক্রম শুরু হয়। এর আওতায় দাকোপ ও কয়রারর ৩৮টি ওয়ার্ডের সাত হাজার ৫২ নারীকে নিয়ে ৩৭৭টি গ্রুপে কাজ চলছে। জনপ্রতি ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এই টাকা দলগতভাবে কৃষিকাজে লাগানো হচ্ছে। এর মধ্যে ৮৬টি গ্রুপ মাছ ও তরমুজ চাষ করে ২০২১ সালে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাতে প্রায় ৮৭ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে বাকি গ্রুপগুলো একইভাবে চাষাবাদ করে লাভবান হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় ১৯৫টি গ্রুপে তিন হাজার ১৪২ জন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে ৮৬টি গ্রুপের এক হাজার ৩০৫ সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে কয়রার ৭২টি গ্রুপের এক হাজার ৮৪ সদস্য মাছ চাষে এবং দাকোপের ১৪টি গ্রুপের ২২১ সদস্য তরমুজ চাষে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তবে সামগ্রিকভাবে ১৯৫টি গ্রুপের হিসাবে ক্ষতি নেই, বরং এক কোটি ৫৫ লাখ ২৩ হাজার ১১৩ টাকা লাভ হয়েছে। বর্তমানে কয়রার ১১৬টি গ্রুপের মধ্যে ৬০টি গ্রুপ মাছ চাষ করছে। বাকি ৫৬টি গ্রুপ হাঁস-মুরগি, ভেড়া পালন, কাঁকড়া, ধান ও সবজি চাষ করছে। দাকোপের ৭৯টি গ্রুপ একই কাজের পাশাপাশি তরমুজ চাষ ও শূকর পালন করছে।

প্রকল্পটির দেখভাল করছেন খুলনা জেলা জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সমন্বয়কারী শেখ ফয়সাল শাহ রিপন। তিনি বলেন, ‘গ্রুপের ক্ষতিগ্রস্তদের চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ক্ষতি হওয়া অর্থ পূরণ নয়, ক্ষতির পর গ্রুপের যে অর্থ আছে, তা দিয়ে নতুনভাবে কাজ নির্ধারণ করা এবং নতুন উদ্যমে কাজ শুরুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, তারা ঘুরে দাঁড়াবেন।

আশাবাদী স্থানীয় প্রশাসন: দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিন্টু বিশ্বাস বলেন, ‘উপজেলায় যত প্রকল্প চলমান আছে, এর মধ্যে লজিক প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি কাজই সফলভাবে চলছে। এটি স্থানীয় সরকারের আওতায় চলা সরকারি জলবায়ু প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় অসচ্ছলরা উপকৃত হচ্ছেন। তরমুজ চাষে একটি গ্রুপ তিন লাখ টাকা বিনিয়োগ করে আট লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করেছেন। তবে গত বছর তরমুজ চাষে কয়কটি গ্রুপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেটা তারা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।