• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ০১:৩৪ পূর্বাহ্ন

ঢাকা-যশোর-নড়াইল রুট : দূরত্ব কমলেও ভাড়া একই, আছে দুর্ঘটনার শঙ্কাও


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৫, ২০২২, ১১:৪৬ অপরাহ্ন / ২৯
ঢাকা-যশোর-নড়াইল রুট : দূরত্ব কমলেও ভাড়া একই, আছে দুর্ঘটনার শঙ্কাও

মুস্তাইন বীন ইদ্রিস,নড়াইল থেকে ফিরে : গত ১০ অক্টোবর মধুমতী নদীর ওপর দেশের প্রথম ছয়লেনের মধুমতী সেতু উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লোহাগড়া উপজেলার মধুমতী নদীর অংশে এ সেতু নির্মাণে কমেছে যশোর-নড়াইলের দূরত্ব।তবে যাতায়াতে প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত যশোর অঞ্চলের মানুষ। রয়ে গেছে ভাড়া না কমার খড়্গ। অপ্রশস্ত রাস্তায় আছে দুর্ঘটনার শঙ্কাও।কিছু দিন আগেও নড়াইল-যশোর থেকে ফরিদপুর-পাটুরিয়া ঘাট হয়ে রাজধানীতে ঢুকতো যশোর-নড়াইলের ঢাকাগামী পরিবহনগুলো। এ রুটে নড়াইল থেকে দূরত্ব ছিল ২২৫ কিলোমিটার; যশোর থেকে ২১২ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ভাঙ্গা-মধুমতী সেতু হয়ে নড়াইলের দূরত্ব ছিল ১৩৯ কিলোমিটার, যশোরের ১৭০ কিলোমিটার। সেতু হওয়ার পর নড়াইলের দূরত্ব কমেছে ৮৬ কিলোমিটার, যশোরের ৪০ কিলোমিটার।দূরত্ব কমলেও এ রুটের ভাড়া কমেনি। এ রুটে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ২ দশমিক ২০ টাকা করে ধরলে নড়াইল পর্যন্ত ভাড়া আসে ৩০৫ টাকা। এর সঙ্গে পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু এক্সপ্রেসওয়ে ও মধুমতী সেতুর টোল যোগ করলে ভাড়া দাঁড়ায় ৩৭৫ টাকা। অর্থাৎ, টোল দিতে হয় ৭০ টাকা।

অপরদিকে, পথ কমে যশোরের দূরত্ব ১৭০ কিলোমিটার হওয়ায় ভাড়া আসার কথা ৩৭৪ টাকা। সেতু-এক্সপ্রেসওয়ের টোল ৭০ টাকা যোগ হলে ভাড়া হয় ৪৪৪ টাকা। কিন্তু যশোর থেকে পরিবহনগুলো ভাড়া নিচ্ছে ৬৫০ টাকা করে। অর্থাৎ, পরিবহনগুলো ২০০ টাকা বেশি ভাড়া আদায় করছে।

যাত্রীদের অভিযোগ, তেলের দাম বৃদ্ধির পরে থেকে যশোর থেকে পাটুরিয়া হয়ে ঢাকাগামী রুটে ৬৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছিল। মধুমতী সেতু চালু হওয়ার পর পথ ৪০ কিলোমিটার কমলেও আগের ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে। আগে ঢাকা থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লাগতো যশোরে। মধুমতী ও পদ্মা সেতু হওয়ায় সময় প্রায় তিন ঘণ্টা কমে গেছে। সময় কমে গেলেও ২০০ টাকার বেশি ভাড়া আদায় অত্যাচারের শামিল। পরিবহন মালিকদের এমন ‘অসৎকাণ্ডে’ যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশও করেছেন।

এ রুটে চলাচলকারী নড়াইল এক্সপ্রেসের বাস ভাড়া ৪৫০ টাকা। অন্যান্য পরিবহনের টিকিটের মূল্যও নাকি একই। বিলাসবহুল বাসে ভাড়া বেশি। কিন্ত যশোর-ঢাকা রুটে আগের ভাড়া আদায়ের কথা স্বীকার করেন যশোর সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি ও ঈগল পরিবহনের সত্ত্বাধিকারী পবিত্র কাপুড়িয়া তিনি বলেন, আগের ৬৫০ টাকাই ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এটি সরকার নির্ধারিত। যশোর-নড়াইল-ঢাকা রুটে মধুমতী সেতুসহ আরও দুয়েকটি সেতুর ও এক্সপ্রেসওয়ের টোলের কারণে পরিবহনের এ ভাড়া অব্যাহত রাখা হয়েছে।

নড়াইল জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজী জহির পরিবহনের সংখ্যা বাড়লে এ রুটে ভাড়া কমবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

সেতু হওয়ায় ঢাকা থেকে যশোর-নড়াইল রুটে পরিবহনের চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে দুর্ঘটনার শঙ্কা। কারণ, অপ্রশস্ত রাস্তা। নড়াইলের পরিবহন সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, আগে কালনা ফেরি হয়ে এ রুটে শুধু দিগন্ত পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ঈগল পরিবহন, একে ট্রাভেলস ও নড়াইল এক্সপ্রেসের বাস চলাচল করতো। নড়াইল এক্সপ্রেসের ট্রিপ চলতো ২৫টি, ঈগলের ১৩টি।সেতু হওয়ার পর এখন ২৪ ঘণ্টায় নড়াইল এক্সপ্রেসের ট্রিপ চলে ৮০টি। ঈগল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা নড়াইল থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ৭২টি বাস ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ছাড়া সোহাগ পরিবহন, দেশ ট্রাভেলস, আপন পরিবহন, শিবচর ডিল্যাক্স, একে ট্রাভেলসসহ ২৫টি কোম্পানির বাস চলছে মধুমতী সেতু দিয়ে। এতদিন কালনা ও মাওয়া ফেরির কারণে এ রুটে বিলাসবহুল বাস চলেনি। এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে সেটিও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নড়াইলের ঈগল পরিবহনের ম্যানেজার বিলাল হোসেন জানান, যশোর-বেনাপোল ও নড়াইল থেকে আগে ২৪ ঘণ্টায় আমরা ১৩টি গাড়ি ছাড়তাম। কালনা ফেরির জন্য এতদিন নড়াইল থেকে আমাদের কোনো লাক্সারি বাস ঢাকায় যেত না। মধুমতী সেতু হওয়ায় নড়াইল লাক্সারি বাসসহ ২৪ ঘণ্টায় ৭২টি গাড়ি নড়াইল থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে।

নড়াইল জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজী জহির বলেন, নড়াইল থেকে আগে মাত্র তিনটি কোম্পানির বাস যেত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে। মধুমতী সেতু হওয়ায় নতুন আরও পাঁচটি পরিবহন কোম্পানি নড়াইলে কাউন্টার নিয়েছে। শিগগিরই এ রুটে পরিবহনের সংখ্যা বাড়বে। এর ফলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে।

কিন্ত মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আছে রুটের কিছু অপ্রশস্ত রাস্তা। এর মধ্যে একটি হলো মধুমতী সেতু থেকে যশোরের মণিহার মোড় পর্যন্ত রাস্তাটি। এ পথের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার; কিন্তু অতিরিক্ত যানবাহন চলাচলে অনুপযুক্ত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন দিন-রাত এত বেশি বাস চলাচল করছে, দুর্ঘটনা হতে পারে যেকোনো সময়। কারণ অপ্রশস্ত রাস্তাগুলো এমন, একটি বাস অপরটিকে ওভারটেক করে যাওয়ার মতো নয়। দুই লেনের রাস্তা বলা হলেও আদতে তা নয়। দুই লেনের রাস্তার আন্তর্জাতিক মান ২৪ ফুট হলেও এ সড়ক মাত্র ১৮ ফুটের। ফলে সাবলীলভাবে এ রাস্তায় দুইদিক দিয়ে দুটি পরিবহন চলতে পারে না।

এ ছাড়া সেতুতে ভ্যান-রিক্সা-ইজিবাইক চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এসব হালকা যান দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এ রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীরা বলছেন, পরিবহনের সংখ্যা বাড়ায় দুর্ঘটনার শঙ্কা বাড়ছে। কারণ, কিছু সড়ক ভারী পরিবহন চলাচলের উপযুক্ত নয়। বাহনগুলোও দ্রুত যেতে পারে না। তাই সময় বাঁচবে কথাটি বলা হলেও অনেকাংশে সত্য নয়। যশোর পর্যন্ত যেতে এখন সোয়া তিনঘণ্টা সময় লাগলেও রাস্তা প্রশস্ত থাকলে আরও ৩০-৪০ মিনিট সময় সাশ্রয় হতো।

এদিকে, ভাঙ্গা থেকে যশোর হয়ে বেনাপোল পর্যন্ত ৬ লেনের রাস্তা তৈরির বিষয়টি এ বছর শুরু হবে। শেষ হতে সময় লাগবে অন্তত ৫ বছর। সড়ক নির্মাণ কর্মকর্তারা এ আশা করলেও শঙ্কার কথাও জানান তারা। শঙ্কা মূলত সময়ক্ষেপণ নিয়ে। সড়ক নির্মাণে সময় যত বেশি গড়াবে তত বেশি ভোগান্তি বাড়বে।

নড়াইলের সড়ক বিভাগ জানিয়েছে, ভাঙ্গা-যশোর-বেনাপোল জাতীয় মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণে ১১ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি হয়েছে। রোডের নকশার কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এর মধ্যে আছে পাঁচটি ফ্লাইওভার। নড়াইল ও যশোর অংশে পৃথক দুটি বাইপাস হবে। প্রকল্পের মধ্যে নড়াইল শহরের বাইপাস সড়কও রয়েছে। আপাতত, কালনা থেকে যশোর পর্যন্ত দুই পাশে ৩ ফুট চওড়া করার কাজ চলছে। শহর বাইপাস এলাকায় ৩ ফুট রাস্তা বেড়ে হবে ১৮ ফুট।

নড়াইল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ভাঙ্গা-যশোর-বেনাপোল জাতীয় মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করণ প্রকল্পের কাজ অনুষ্ঠানিকভাবে চলমান রয়েছে। আপাতত চাপ সামলাতে কালনা থেকে যশোর পর্যন্ত বর্তমান সড়কটি আরও ছয় ফুট পিচ ঢালাই করে চওড়া করা হবে। দেড় বছরের মধ্যে এর কাজ শেষ হবে। ৬ লেনে উন্নীতকরণের কাজ শুরু হলে সময় লাগবে ৫ বছর। তারপর এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

নড়াইলের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে ফোন করা হলে এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ছয় লেন প্রকল্পের নড়াইল অংশে ২৭৪ একর জমির অধিগ্রহণের হিসাব ২০২০ সালে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের অর্থায়ন জিটুজি পর্যায়ে রয়েছে। অর্থায়ন নিশ্চিত হলেই কাজ শুরু হবে। আশাকরি দ্রুতই কাজ শুরু করা যাবে।অপ্রশস্ত সড়কের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, প্রতিটি কাজের একটি পরিকল্পনা থাকে। সড়কে যাত্রীদের ভোগান্তি কারই কাম্য নয়। যেসব প্রস্তাব বা প্রকল্প চলমান, সেগুলো বাস্তবায়ন করার পর বাকি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা আমরা করবো।