রবিবার, ১৪ অগাস্ট ২০২২, ০৬:১৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
নড়াইলের কালিয়ায় চেয়ারম্যানের উদ্যোগে ১৯৭১টি গাছ রোপন রাজধানী সবুজবাগে পিকআপের ধাক্কায় অটোচালকের মৃত্য রাজধানী শ্যামপুর থেকে চোরাই মোটর সাইকেলসহ গ্রেফতার-১ সাংবাদিক অমিত হাবিবের মৃত্যুতে ডিইউজের শোক সাংবাদিক অমিত হাবিবের মৃত্যুতে তথ্যমন্ত্রীর শোক নড়াইলে সন্তানকে অপহরণের ভয় দেখিয়ে মাকে ধর্ষণ, মামলা দায়ের নরসিংদীতে স্বামীকে না জানিয়ে ভূয়া ঠিকানা ব্যবহার করে সৌদি আরব যাওয়ার চেষ্টা গোপালগঞ্জে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্ব মূলক প্রকল্পের আওতায় সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা যশোরের শার্শা টু কাশিপুর সড়ক যেন মৃত্যু ফাঁদ : সড়কের অজুহাতে বাড়তি ভাড়া আদায় যে বিদ্যালয়ে অনিয়মই যেন নিয়ম অফিস কক্ষে নেই বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি

টক অফ দা টাউন যখন কিশোর গ্যাং

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ২৫ জুলাই, ২০২২
  • ৭১ Time View

এস এম রুবেল, চাঁপাইনবাবগঞ্জঃ বাংলাদেশ এ কিশোর গ্যাংয়ের বেড়ে চলা যেন লাগাম না টানতেই ঘোড়া দৌড়। এ যেন এক অন্ধকারাচ্ছন্ন রাজনৈতিক ছত্রছায়ার আড়ালে জেগে ওঠা মাকড়সার জালের মত অপরাধ প্রবনতার বেড়ে ওঠা। জনমনে শঙ্কা ও ভীতিকর নির্জনতার ছাপ। দিনের পর দিন কিশোর গ্যাং এর একাধিক হত্যাকান্ড কিশোর অপমৃত্যুর ঘটনায় দেশবাসী স্তম্ভিত।

গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু মাত্র ঢাকায় শতাধিক কিশোর গ্যাং রয়েছে। রাজধানীতে এ ধরনের সস্ক্রিয় ভয়ংকর কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ৭৮টি এবং সদস্য সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। ঢাকা বাদে সারাদেশে আরও কমপক্ষে ৩৫টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। পুলিশের খাতায় তালিকাভুক্ত একেকটি কিশোর গ্যাংয়ের নাম দেখলে রীতিমতো অবাক হতে হয়। অদ্ভুত এবং ভয়ংকর সব নাম। অনেক গ্রুপের নামের সঙ্গে আবার সরাসরি খুনখারাবি অথবা মারধরের ট্যাগ যুক্ত।

জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের হিসাবে বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীদের সংখ্যা ৩ কোটি ৬০ লাখ। পুলিশ সদর দপ্তরে কিশোর অপরাধের রেকর্ড পাওয়া গেছে ২০১২ সাল থেকে। সে বছর ৪৮৪ মামলায় আসামি ছিল ৭৫১ জন শিশু-কিশোর। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ৮২১ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ১৯১ জন। ২০১৭ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে জানায় গত ১৭ বছরে ঢাকায় কিশোর অপরাধীদের হাতে ১২০ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে গত ২০২০ -২১সালে খুন হয়েছে ৩৪ জন।

ঢাকাসহ সারাদেশে কিশোর গ্যাং স্টারদের তালিকা না থাকায় তারা একের পর এক দুর্ধর্ষ অপরাধ করে নির্বিঘ্নে পার পেয়ে যাচ্ছে। আবার কখনো এ চক্রের দু’চারজন গ্রেপ্তার হলেও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা গডফাদাররা স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে কিংবা রাজনৈতিক দাপট দেখিয়ে তাদের অনায়াসেই ছাড়িয়ে নিচ্ছেন। এ সময় তারা অভিযুক্ত অপরাধীদের কাউকে দলীয় কর্মী, আবার কাউকে মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে জাহির করছেন। পুলিশের হাতে তাদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকায় স্থানীয় চাপে অনেক সময় তাদের তা মেনে নিতে হচ্ছে। এতে চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত ও ইন্ধনদাতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে। উদ্বিগ্ন এ পরিস্থিতিতে কিশোর অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের গডফাদারদের সামাল দিতে ডাটাবেজ তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

সারা দেশে কিশোর গ্যাং কালচার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ।হিরোইজম’ প্রকাশ করতেও পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে। । সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অপরাধের ধরনও পাল্টে যাচ্ছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার,মারামারি , সিনিয়র-জুনিয়র দন্দ,প্রেম নিয়ে বিরোধের জেরে অহরহ সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, চুরি-ছিনতাই থেকে শুরু করে খুনাখুনিসহ নানান অপরাধে কিশোর-তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে। মাদক ব্যবসা এবং দখলবাজিতেও তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে । নারীনেশাও যেন তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাংয়ের প্রচার-প্রচারণার নেটওয়ার্ক রয়েছে। তারা গ্যাং সংগঠন নিয়ে গর্ববোধ করে এবং গ্যাং সদস্য হিসাবে পরিচিত হয়ে তৃপ্তি অনুভব করে। ক্ষেত্রবিশেষে গ্যাংয়ে একই রকমের জামাকাপড় পরার স্টাইল দেখা যায় এবং কেউ কেউ অথবা সবাই জুয়েলারি ও অলংকার পরিধান করে থাকে। এ ছাড়া আধিপত্য বিস্তারের জন্য তারা অস্ত্র যেমন- ছুরি, রামদা, হকিস্টিক, বন্দুক ইত্যাদি সংগ্রহে রাখে।

এসবের অন্যতম কারন হলো ব্যক্তি পর্যায়ে অপরাধ জগতে যুক্ত হওয়ার মানসিকতা, দুর্বল চিত্তের ব্যক্তিত্ব, হিরোইজম দেখানোর প্রবণতা, অনুকরণপ্রবণতা, অল্প বয়সে যৌন আসক্তি বা যৌন আসক্তি হওয়ার ক্ষেত্র ও সুযোগ তৈরি হওয়া। কিশোরদের অপরাধপ্রবণ হওয়ার পেছনে সাধারণত যে ছয়টি বিষয় পরিলক্ষিত হয় তা হলো—দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাব, পারিবারিক সমস্যা, নিম্নমানের জীবনযাপনের পদ্ধতি, অপর্যাপ্ত শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার।

জার্মান-আমেরিকান মনস্তত্ত্ববিদ এরিক এরিকসন ১৯৬৩ সালে তাঁর ‘চাইল্ডহুড অ্যান্ড সোসাইটি’ বইটিতে কিশোর অপরাধের কারণ লিখতে গিয়ে বয়ঃসন্ধিকালের দুটি সমস্যার কথা আলোচনা করেছিলেন। তাঁর সাইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট থিওরির পঞ্চম ধাপ ‘ইগো আইডেনটিটি’ আর ‘রোল কনফিউশন’ নিয়ে আলোচনার ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, বয়ঃসন্ধিকাল মানুষের পরবর্তী জীবনের ব্যক্তিগত আইডেনটিটিকে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ, এই কিশোর বয়সেই তারা স্বাধীনতাকে আবিষ্কার করে, যা নিজের সত্তা নির্মাণে সহায়তা করে। উপযুক্ত অনুপ্রেরণা এবং ইতিবাচক অভিজ্ঞতা যেমন একজন কিশোর বা কিশোরীর ব্যক্তিসত্তাকে গঠন করে, আবার এর অভাবে তাদের মধ্যে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ন্ত্রন করে।

ক্ল্যাসিক্যাল ক্রিমিনোলজির স্রষ্টা সিজার বেকারিয়া ও জেরেমি বেনথাম মনে করেছেন, মানুষ তার যে কোনো কাজের প্রতিক্রিয়া বা ফলাফল মেপে তার আচরণ নির্ধারণ করে। তাদের ‘চয়েস থিওরি’ বলে, কোনো অপরাধ কর্মের ‘লাভ’ এবং ‘লোকসান’ এর সতর্ক পরিমাপ এরপরই কেবল কেউ আইন ভঙ্গ করে বা অপরাধ করে। প্যারেন্টিং’কে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার বন্ধুসুলভ সম্পর্ক স্থাপন, স্কুল ও কলেজে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা, পাড়া বা কমিউনিটিতে পর্যাপ্ত খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চাই পারে কিশোর অপরাধকে প্রতিরোধ করতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরে খুন-ধর্ষণসহ প্রায় দুই শতাধিক ভয়ঙ্কর অপরাধের ঘটনার সঙ্গে কিশোর অপরাধীদের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হলেও পুলিশ তাদের কারাগারে না পাঠিয়ে সংশোধন কেন্দ্রে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে। কেননা বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছর বা এর কম বয়সি শিশু-কিশোর অপরাধীদের জেলে পাঠানোর পরিবর্তে উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যাতে তারা সংশোধন হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।
অথচ এসব উন্নয়ন কেন্দ্রে উন্নত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় সেখানে সংশোধনের পরিবর্তে অনেকে আরও ভয়ঙ্কর অপরাধী হয়ে উঠছে। সংশোধন কেন্দ্র থেকে ফিরে আসার পর বেশিরভাগ কিশোর আগের মতোই বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করছে। ফলে গত কয়েক বছর ধরে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রাণন্ত চেষ্টা চালালেও তারা তাতে ব্যর্থ হয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ বিষয়টি নিঃসংকোচে স্বীকার করেছেন।

সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিশোররা কেন অপরাধে জড়াচ্ছে, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা থাকলেও সরকারের বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর তাতে আগ্রহ নেই। তাই ভালো ভালো আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও সেসবের বাস্তবায়ন হচ্ছে না।এদিকে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান অবকাঠামোতে শিশু বা কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য অনেক সময় পদক্ষেপ নেওয়া হলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বেশিরভাগ সময়েই তা সম্ভব হয় না।

সমাজকে ভেতরে ভেতরে উইপোকার মতো খুবলে খেয়ে ফেলছে এই অশুভ চর্চা। উঠতি বয়সের, স্কুল-কলেজগামী কিশোরদের একটি অংশ লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে ওই দিকেই ঝুঁকছে। ফলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সুড়ঙ্গের অপরপ্রান্তে জমা হচ্ছে নিকষকালো অন্ধকার। যারা এই জাতিকে আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবে তারা যদি এই আগ্রাসী কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির চর্চা করে বেড়ে ওঠে তবে আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ সত্যিই অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়বে। সুতরাং আজকের কিশোর গ্যাং কালচার দেশ, জাতি ও সমাজের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাই সকলে এই বিষয়ে সচেতন হয়ে কিশোর গ্যাং অপরাধ দমনে প্রশাসনকে সহায়তা করুন। দেশ ও জাতির কল্যাণ এগিয়ে আসুন।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2020 ajkerbd24.com
Design & Development By: Atozithost
Tuhin