• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ১১:১৯ পূর্বাহ্ন

ঝালকাঠির রাজাপুরে সৎভাইদের অত্যাচার ও হত্যার ভয়ে পালিয়ে বেরাচ্ছে প্রধান শিক্ষক বড় ভাই


প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ২৭, ২০২২, ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন / ২২
ঝালকাঠির রাজাপুরে সৎভাইদের অত্যাচার ও হত্যার ভয়ে পালিয়ে বেরাচ্ছে প্রধান শিক্ষক বড় ভাই

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঝালকাঠিঃ ঝালকাঠির রাজাপুরে ছোট ভাইয়ের হামলার ভয়ে নিজ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেরাচ্ছে বড় ভাই নূর ফরাজী। ৭০ বছর বয়সী নূর ফরাজীর বাড়ি উপজেলার গালুয়া ইউনিয়নের বড় কৈবর্তখালী গ্রামে। তিনি এলাকার মাইন উদ্দিন ফরাজীর ছেলে। নুর ফরাজীর বাবা মাইন উদ্দিন ফরাজী ৩১ বছর আগে ১৯৯১ সনে মৃত্যু বরণ করে।

নুর ফরাজী শিক্ষকতার চাকুরী শেষ করে জি.কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ থেকে অবসর নিয়েছেন অনেক আগেই। বাবার মৃত্যুর পর থেকেই শুরু হয় সৎ ভাইদের সাথে জমিজমা সংক্রান্ত বিবোধ।দীর্ঘবছর ধরে চলে আসা বিরোধে উভয় পক্ষের মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। এনিয়ে অনেকবার দুপক্ষের নয়জন (এলাকার গণ্যমান্যরা) শালিসদার একাধীকবার মিমাংসার জন্য বৈঠক করেছেন। ওয়ারিশদের মাঝে জমির সুষ্ঠ বন্ঠনও করে দিয়েছেন।কিন্তু শেষমেশ বিরোধ রয়েই গেছে। কারন নুরের সৎ ভাইদের মনের মতো না হওয়ায় তারা শালিস বানচাল করে দেয়।

কৈবর্তখালী গ্রামের বয়োজেষ্ঠ্যদের সাথে আলাপ হয় প্রতিবেদকের। তাদের মতামত এবং মিমাংসা চেষ্টা করা অনেকে জানান, মাইনউদ্দিন ফরাজীর সন্তানদের বিবোধের মুল কাহিনী। এলাকার মানুষের তথ্যমতে যা জানা যায় তা হলো মাইন উদ্দিন ফরাজীর দু’টি বিবাহ ছিলো। দুই সংসারে তার ১০ পুত্র এবং চার কন্যা সন্তান হয়। এর মধ্যে প্রথম স্ত্রী মোসাম্মৎ ফুলমন বিবির ঘরে চার পুত্র, দুই কণ্যা এবং দ্বিতীয় স্ত্রী ছাহেরা বেগমের ঘরে ছয় পুত্র ও দুই কন্যা সন্তান জন্ম নেয়।

বাবার মৃত্যুর পরেই ১৪ ভাই-বোনের মধ্যে শুরু হয় জমির সীমানা সংক্রান্ত বিরোধ। প্রথম স্ত্রীর ঘরে মাইন উদ্দিন ফরাজীর যে সন্তান তারা হলো,মহিন উদ্দিন ফরাজী, শুক্কুর ফরাজী, নূর ফরাজী, ইউনুছ ফরাজী, ফাতেমা খাতুন এবং আয়শা খাতুন। এর মধ্যে মহিন উদ্দিন ১৬ বছর আগে মৃত্যু বরণ করেছেন। বাকিদের সকলের বয়স বর্তমানে ৬৫ বছরের উর্ধে।

অন্যদিকে মাইনউদ্দিনের দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরের যে সন্তান রয়েছে তারা হলো নেছার উদ্দিন ফরাজী, নাজির ফরাজী, ওয়ালিউল্লাহ ফরাজী, মুছা ফরাজী, ঈসা ফরাজী, নূহু ফরাজী, খাদিজা খাতুন এবং শাহিদা খাতুন। নেছার উদ্দিন সেনাবাহিনীতে চাকুরী করে অবসর নিয়েছেন এবং নাজির ফরাজী পুলিশ বাহিনীতে চাকুরী করেন। ঈসা ও মুছা দুই ভাই চাকুরী করেন সৌদী আরবে। অন্য দুজন বাড়িতে কৃষি কাজ করেন। এদের মধ্যে সাবেক সেনা সদস্য এবং বর্তমান পুলিশ সদস্য জোর পুর্বক সৎ ভাইদের জমি ঠকিয়ে খাচ্ছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় অনেকে।

মাইনউদ্দিন ফরাজীর প্রথম স্ত্রীর সন্তান শুক্কুর ফরাজী বলেন, আমি ও আমার ছোট ভাই নূর ফরাজী অন্য সৎ ভাইদের নিয়ে বাবার বাড়িতেই বসবাস করি। আমাদের বাড়ির পাশে বাবার আরেকটি জমিতে আমার ছোট ভাই ইউনুছ ফরাজী বসবাস করেন। বাবার সম্পত্তি নিয়ে সৎ ভাইদের সাথে দীর্ঘবছর ধরে বিরোধ চলছে। এটা নিয়ে অনেক বার এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ শালিস বৈঠক করেন কিন্তু আমার সৎ ভাইদের মনের মতো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় প্রতিবারই তারা শালিসদারদের দেয়া সিদ্ধান্ত না মেনে ঝগড়া বিবাদ বাধিয়ে রাখে। আমাদের আরেক সৎ ভাই যিনি বর্তমানে পুলিশের উপ পরিদর্শক (এসআই) পদে পিরোজপুর সদর থানায় কর্মরত আছেন। তিনি প্রশাসনিক দিক থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমাদের উপর নির্যাতন করে আসছে। তার সাথে আরেক ভাই সাবেক সেনা সদস্য নেছার উদ্দিন একত্রিত হয়ে কিছু দিন আগে আমাকে এবং আমার ছোট ভাই নূর ফরাজীকে মারধর করে এবং বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বলে। নতুবা আমাদের হত্যা করবে বলে হুমকি দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বাড়ির এক প্রতিবেশী বলেন, দুই ভাই মিলে শুক্কুর ও নুর ফরাজীকে মারধর করেছে সেদিন রাতেই প্রানে বাঁচতে নূর ফরাজী তার স্ত্রীকে রেখেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বরিশালে তার ছেলের বাসায় গিয়ে উঠেছে। দূরে কোনো আত্মীয়স্বজন না থাকায় শুক্কুর ফরাজী কোথাও যেতে পারেনি। বর্তমানে সারাদিন ঘরের মধ্যেই থাকেন। সৎ ভাইদের হামলার ভয়ে ঘর থেকেও বের হয়না।

বাড়িছাড়া নূর ফরাজী মুঠোফোনে বলেন, আমি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলাম। বর্তমানে অবসরে আছি। আমার বড় ভাইও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। এই গ্রামে আমাদের অনেক ছাত্র-ছাত্রী থাকে। সবাই আমাদের দুই ভাইকে সন্মান শ্রদ্বা করে। তাই ছোট ভাইদের হাতে মার খেয়েও লোক লজ্জায় কাউকে বলি নাই। বৃদ্ধ বয়সে বাবার সম্পত্তি নিয়ে যদি সৎ ভাইদের হাতে মার খেতে হয় এর চেয়ে লজ্জার কি আছে। মার খেয়ে প্রাণের ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে বরিশালে ছেলের বাসায় চলে আসছি।

এ বিষয়ে একাধিকবার বৈঠকে বসা শালিসদাররা বলেন, আমরা উভয় পক্ষের নয়জন শালিসগণ দলিলের এস.এ এবং বি.এস খতিয়ান অনুযায়ী মাইনউদ্দিন ফরাজীর সম্পত্তি থেকে ৫১টি প্লট দাগ কেটে নকশা তৈরি করে দিয়েছিয়াম। কিন্তু একটা পক্ষ তা মানতে নারাজ। তারা যেটা দাবি করেছে সেটা ওয়ারিশ ও বন্টন আইন সম্মত হয় না। শালিসদাররা দু’পক্ষকে একটি মিমাংসা নামা বানিয়ে দিয়েছিলো।তাতে দেখা যায় রাজাপুর থানার জে. এল নম্বর ৩২ এর বড় কৈবর্তখালী মৌজার ৯টি এস. এ খতিয়ান অনুযায়ী মৃত মাইনউদ্দিন ফরাজীর ওয়ারিশদের প্রাপ্য সম্পত্তির পরিমাণ হচ্ছে ৫-৪৫.৪৮শতাংশ।এর মধ্যে মো. মাহিন উদ্দিন ফরাজী, শুক্কুর ফরাজী, নূর ফরাজী এবং ইউনুস ফরাজী ৩৩.৯০ শতাংশ করে জমি পেয়েছেন। এছাড়া নেছার উদ্দিন, নাজির, ওয়ালীউল্লাহ, মুছা, ঈসা এবং নুহু ফরাজী প্রত্যেকে ৪৩.৯৫ শতাংশ করে পৈত্রিক সম্পত্তি পেয়েছেন। তাদের বোন ফাতেমা খাতুন ও আয়শা খাতুন ১৬.৯৫ শতাংশ এবং খাদিজা খাতুন ও সাহিদা খাতুন ২১.৯৭ শতাংশ করে জমি পেয়েছেন। কিন্তু এই বন্টন মানতে নারাজ মাইনউদ্দিনের দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তানরা। কিন্তু নিজেদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাইন উদ্দিনের দ্বিতীয় স্ত্রী সাহেরা বেগমের সন্তানরা।

তারা বলেন, শালিসগনরা মনগড়া মিমাংসা নামা তৈরি করেছেন এগুলা আমরা মানি না। শালিসদাররা আমাদেরকে ১০শতাংশ জমি কম দিতে চায় তারা বলছে আমাদের দাবির ১০ শতাংশ জমি নাকি সরকারি রাস্তায় চলে গেছে। তাই আমরা মিমাংসা নামার বিরুদ্ধে প্রধান শালিসদার শাহজাহান মোল্লার কাছে একটি দরখাস্ত দিয়েছি। তাছাড়া আদালতে ২০১৭ সনে একটি নালিশি মোকদ্দমা দায়ের করেছিলাম।চলমান ঐ মামলায় আদালত যে রায় দিবে সেটা আমরা মেনে নিব।