• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ন

খুলনায় শান্তিপূর্ণভাবেই হয়ে গেল বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ: বাধা ডিঙিয়ে বড় জমায়েত বিএনপির


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২৩, ২০২২, ৩:১১ অপরাহ্ন / ৬৪
খুলনায় শান্তিপূর্ণভাবেই হয়ে গেল বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ: বাধা ডিঙিয়ে বড় জমায়েত বিএনপির

মোস্তাইন বীন ইদ্রিস (চঞ্চল), খুলনা: অবরুদ্ধ খুলনায় মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই হয়ে গেল বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ। চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহের পর এটি দলটির তৃতীয় বিভাগীয় বড় সমাবেশ। এই সমাবেশ ঘিরে গত দুই দিন সারা দেশ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় খুলনাকে। সে কারণেই খুলনার সমাবেশে বিএনপি কী দাবি তুলল বা দলীয় কী নির্দেশনা দিল তা ছাপিয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে সফল সমাবেশ। শনিবার খুলনা শহরের ডাকবাংলা এলাকায় সোনালী ব্যাংক চত্বরের সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাই বলেছেন, দেখেন, পথ আটকে, হামলা-হয়রানি করে জনগণের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখা যায় না। তারই প্রমাণ দিয়েছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের চিহ্ন থাকবে না। নির্বাচনে তারা ১০ আসনও পাবে না। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি, জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং চলমান আন্দোলনে দলের পাঁচ কর্মী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে এই বিভাগীয় সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

সমাবেশকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে উত্তপ্ত ছিল খুলনা। সমাবেশের আগের দিন নগরীতে শোডাউন করে ছাত্রলীগ। এরই মধ্যে শুক্র ও শনিবার পরিবহন ধর্মঘটের ঘোষণা আসে মালিক সমিতির পক্ষ থেকে। ফলে খুলনার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। দলের স্থানীয় নেতারা জানান, ময়মনসিংহের সমাবেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপিও কৌশল বদল করেছে। তাঁরা বৃহস্পতিবার রাত থেকেই আশপাশের জেলার নেতাকর্মীদের খুলনায় নিয়ে আসতে শুরু করেন। শুক্রবার রাতেই সমাবেশস্থলে অবস্থান নেন দূরদূরান্ত থেকে আসা দলের কয়েক হাজার নেতাকর্মী। বাস চলাচল করেনি। চলেনি লঞ্চ। তবে নৌপথে সীমিত পারাপার ছিল। সেটাকেই কাজে লাগিয়েছেন নেতাকর্মীরা। তাঁরা এসেছেন ট্রেন, ট্রাক, পিকআপ, বালুবাহী ট্রলার, নৌকা এবং কয়েক মাইল পায়ে হেঁটে। শনিবার সকাল থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে শহরের নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে উপস্থিত হন। একদিকে নিউ মার্কেট থেকে হাদিস পার্ক, আরেক দিকে ময়লাপোতা থেকে পার্ক রোড পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নেতাকর্মীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন।

সমাবেশে আগতরা দলীয় নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি চেয়ে স্লোগান দিয়েছেন। তাঁদের কারো হাতে লাঠিসোঁটা ছিল। কেউ কেউ জাতীয় পতাকা মোড়ানো লাঠি নিয়েও এসেছিলেন। আবার শহরের বাইরে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের লাঠি, গজারি ও রামদা নিয়ে মহড়া দিতে দেখা গেছে। তবে পুরো শহর ছিল বিএনপি নেতাকর্মীদের দখলে। সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি দলীয় কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। বিএনপি নেতাকর্মীরা রেলস্টেশনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। বিএনপির দাবি, দুপুর ২টার পর রেলস্টেশন ৫ নম্বর নৌঘাটে বিএনপির এক কর্মীকে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা। সকালে দৌলতপুর নতুন রাস্তায় আওয়ামী লীগ অফিস ভাঙচুর করার পর বিকেলে খালিশপুরে বৈকালিতে বিএনপি অফিসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

আন্দোলন ছাড়া বিকল্প নেই: সমাবেশে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ২০১৪ সালে বিনা ভোটের নির্বাচনে ক্ষমতায় গিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ২০১৮ সালে নিশিরাতে ভোট হয়ে গেছে। দুই নির্বাচনেই মানুষ ভোট দিতে পারেনি। ২০২৩ সালে নির্বাচন আসছে। এবারও ক্ষমতাসীনরা একই কায়দায় নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে থাকার পাঁয়তারা করছে। এ জন্য নিজেদের মতো নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে তারা। গাইবান্ধার নির্বাচন বন্ধ করা নির্বাচন কমিশনের কৌশল বলে মনে করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, নিজেদের ভালো দেখানের জন্য সব রকম কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে তারা। গাইবান্ধায় ভালো নির্বাচন করেছে। কিন্তু ডিসি-এসপিরাই তাদের কথা শোনে না। তারা কী নির্বাচন করবে? তাদের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যায় না।

সমাবেশ বানচাল করতে সরকার সব চেষ্টা করেছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, খুলনাবাসী অসাধ্য সাধন করেছে। জলে স্থলে অন্তরীক্ষে সব জায়গায় বাধা দিয়েছে সরকার। বাস, লঞ্চ, নৌকা সব বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তাতেও জনস্রোত ঠেকানো যায়নি। বিএনপি মহাসচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন। অথচ সরকারই বলেছিল, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ ধরনের মিথ্যা প্রচার করে তারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে এখন দুর্ভিক্ষের কথা বলছে। ১৯৭৪ সালেও আওয়ামী লীগের আমলে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর বইতে লিখেছেন, আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা ও লুটপাটের কারণে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, সমাবেশ সফল করতে কোথায় সহযোগিতা করা হয়েছে? উল্টো নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কুপিয়েছে তারা। গত কয়েক দিনে পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার, সহস্রাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে বিএনপি। বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এসব হামলা চালিয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।

সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব বলেন, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করছেন। কোথাও সহিংসতা করছেন না। বরং আওয়ামী লীগ সহিংসতা করছে। নেতাকর্মীদের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, আন্দোলন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সরকারকে হটাতে হলে একমাত্র বিকল্প আন্দোলন, আন্দোলন এবং আন্দোলন। মির্জা ফখরুল বলেন, এখন পদত্যাগ না করলে পালানোর পথ খুঁজে পাবে না সরকার। এখনো সময় আছে নিরাপদে চলে যান। নইলে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটানো হবে। সমাবেশের শেষ পর্যায়ে ক্ষমতায় গেলে কী করবেন সেই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করা হবে। বিদ্যুতের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে কমিশন গঠন করা হবে।

খুলনা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শফিকুল আলমের সভাপতিত্ব এবং জেলা আহ্বায়ক আমীর এজাজ খান ও মহানগর সদস্যসচিব শফিকুল আলম তুহিনের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, আবদুল আউয়াল মিন্টু, নিতাই রায় চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা মশিউর রহমান, মেহেদী হাসান রুমি, মাহবুব উদ্দিন খোকন, সোহরাব উদ্দিন, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আজিজুল বারী হেলাল, রকিবুল ইসলাম বকুল, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, শামীমুর রহমান প্রমুখ।

সমাবেশে এলেও মঞ্চে ছিলেন না মঞ্জু: দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে পদচ্যুত হওয়া খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। তবে তিনি সমাবেশ মঞ্চে ছিলেন না। মঞ্চের বাম পাশে নেতাকর্মীদের নিয়ে রাস্তায় বসে বক্তব্য শুনেছেন। মঞ্জু বলেন, বিএনপি মহাসচিবের নির্দেশে নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। তবে মঞ্চে ছিলেন না। তাঁকে মঞ্চে ডাকাও হয়নি। তাঁর নামও ঘোষণা করা হয়নি।

যশোর থেকে খুলনার পথে ১২ জায়গায় বাধা: যশোর থেকে খুলনা যাওয়ার পথে মহাসড়কের অন্তত ১২টি স্থানে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এর বাইরে পুলিশও চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালিয়েছে। গতকাল সকাল ১১টায় যশোর চাচড়া মোড় থেকে রওনা হয়ে খুলনা ফুলতলা আসার পথে এমন বাধার ঘটনা দেখা যায়। রাজারহাট চেকপোস্ট, বসুন্দিয়া মোড়, ফুলতলা বাজার, বেরেডাঙ্গার বাজার, আফিল গেট বাইপাস, যশোর রোড, দৌলতপুর রেলগেট, দৌলতপুর বাসস্ট্যান্ড, পাবলা নতুন রাস্তার মোড়, গোয়ালখালী বাসস্ট্যান্ড ও খুলনা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস—এসব স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মহড়া দিতে দেখা গেছে। তাঁরা খুলনামুখী মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারলে অনেককে ফিরিয়ে দিতে দেখা যায়। কর্মস্থলে কিংবা নিজ প্রয়োজনে যাঁরা যাচ্ছিলেন তাঁরা মোটরসাইকেল, ভ্যান ও ইজি বাইকে খুলনা শহরে গেছেন।

আওয়ামী লীগ অফিস ভাঙচুর, বিএনপি অফিসে আগুন: ১৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি মোরশেদ মনির অভিযোগ করেন, দুপুর দেড়টার দিকে বিএনপি নেতাকর্মীরা দৌলতপুর আওয়ামী লীগ কার্যালয় ভাঙচুর করেন। সন্ধ্যার দিকে বিএনপি অভিযোগ করেছে, বিকেলে খালিশপুরে বৈকালি বিএনপি অফিস ভাঙচুর করে আগুন দেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।

খালিশপুর থানা ওসি মনিরুল গিয়াস বলেন, আগুন দেওয়ার ঘটনা তিনি শুনেছেন। তবে কেউ মামলা বা অভিযোগ করেনি।