• ঢাকা
  • শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৫:৫৪ অপরাহ্ন

ওদের শক্তির উৎস কোথায়? : মান্নান সিন্ডিকেটের মুঠোয় বন্দি পরিবার পরিকল্পনার নিয়োগ বদলি পদোন্নতি


প্রকাশের সময় : মার্চ ৩০, ২০২৩, ২:৩৬ অপরাহ্ন / ৪৬
ওদের শক্তির উৎস কোথায়? : মান্নান সিন্ডিকেটের মুঠোয় বন্দি পরিবার পরিকল্পনার নিয়োগ বদলি পদোন্নতি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে অদৃশ্য ইশারায় চলছে নিয়োগ, বদলি আর পদোন্নতির তুঘলকি কারবার। জেষ্ঠ্যতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি দেওয়ায় দফতরের কর্মকর্তাদের মাঝে বাড়ছে অসন্তোষ। অন্যদিকে বদলির ক্ষেত্রেও টাকা ছাড়া কোনো কাজ হচ্ছে না। বদলি সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে খোদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অমান্য করেও ঘুষ বাণিজ্যের ফন্দি-ফিকির করেন ওই সিন্ডিকেট।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডাবলিউভি) পদে নিয়োগ পরীক্ষার খাতা দেখা শেষ হলেও এখন পর্যন্ত এর ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি। অভিযোগ উঠেছে- সিন্ডিকেটের এই চক্রটি ১০৮০ পদের এ নিয়োগে বড় ধরনের বাণিজ্য হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয়নি বলেই এখনো ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি। এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে সচিব ও মহাপচিালক এদের কাছে অসহায়। কখনো কখনো সচিব মহাপরিচালকের দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত পর্যন্ত কার্যকর হতে দেয়া হয় না।

অভিযোগের সূত্রে অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ মূলত একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। এ সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছে মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ মোহসিন উদ্দিন। মূলত এই উপসচিবের শক্তিতেই অধিদপ্তরের সকল অবৈধ কার্যক্রম চলে। যেখানে টাকা ছাড়া নড়ে না কোনো ফাইল। হয় না স্বাভাবিক নিয়মে বদলি বা পদোন্নতি। অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) খান মোহাম্মদ রেজাউল করিম, বহুল আলোচিত সহকারী পরিচালক (পার্সোনেল -১ ) আব্দুল মান্নান এবং সহকারী পরিচালক (সমন্বয়) মতিউর রহমান এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন। ঘুষ বাণিজ্য ও বদলী সিন্ডিকেট প্রধান হিসেবে পরিচিত বহুল আলোচিত সহকারী পরিচালক মান্নানের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই মন্ত্রণালয়ের সহ দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে উপ-সচিব মোহাম্মদ মোহিসন বলেন, আমি তো অধিপ্তরের কেউ না। আমি মন্ত্রণালয়ে কাজ করি। সেখানে কি হলো না হলো এটা আমার দেখার বিষয় না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফলের জন্য পৃথক কমিটি রয়েছে। তারাই মূলত রেজাল্ট দেবে। আর এই নিয়োগে দূর্নীতি হচ্ছে বা কোনো সিন্ডিকেট করছে সেটি কি আমি জানবো?

অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, উপসচিব মহসিনই সহকারী পরিচালক আব্দুল মান্নানকে উপজেলা পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা থেকে (ইউএফপিও) অবৈধভাবে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি পাইয়ে দিয়েছেন।

অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) খান মোহাম্মদ রেজাউল, বহুল আলোচিত সহকারী পরিচালক (পার্সোনেল-১) আব্দুল মান্নান, সহকারী পরিচালক (সমন্বয়) মতিউর রহমান এই তিনজনই নিয়োগ বাণিজ্য, বদলিবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে আব্দুল মান্নান দুর্নীতির কারণে সবচেয়ে আলোচিত। এবারও প্রক্রিয়াধীন এক বড় নিয়োগের দায়িত্বে আছেন তিনিই।

জানা গেছে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডাবলিউভি) পদে নিয়োগ পরীক্ষা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগকে ওই পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর কয়েকদিনের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ ফলাফল প্রস্তুত করে অধিদপ্তরে পাঠিয়ে দিলেও আজ পর্যন্ত তার ফলাফল ঘোষণা হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, এই চক্র নিয়োগের বিপরীতে টাকার হিসেব কষছেন। প্রার্থীদের নিকট থেকে ‘কালেকশন’ নিশ্চিত হয়নি বলেই এখন পর্যন্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

সূত্রে জানা গেছে, ১০৮০টি পদের প্রতিটির জন্যে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। সেই ‘যাচাই-বাছাই’ এখন চলছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই হবে ফল প্রকাশ।

জানা যায়, সহকারী পরিচালক আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন কিছু নয়। এর আগেও কর্মীদের হেনস্থা, আর্থিক দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণসহ বেশকিছু অনিয়মের অভিযোগ এলেও তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহসিন উদ্দিন হচ্ছেন সহকারী পরিচালক আব্দুল মান্নানের বড় সাহায্যকারী ও আশ্রয়াতা। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর পরিচালক পদে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি না দিয়ে নিচের সিরিয়ালে থাকা সাত কর্মকর্তাকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার উপরে পদায়ন দেওয়া হয়। এখানে বড় ভূমিকা রাখে আব্দুল মান্নান। এ ঘটনায় অধিদপ্তরে চরম অসন্তোষের পাশাপাশি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উপ-পরিচালক (ডিডি) এই আদেশে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, তিনি ২৫ বছর পূর্তিতে অবসরে যাওয়ার দিন গুনছেন। কারণ অবসর না নিলে সিনিয়র হয়েও একজন বিভাগীয় শাস্তিপ্রাপ্ত জুনিয়রের কাছ থেকে তাকে এসিআর নিতে হবে।

জানা গেছে, ওই সচিবের নিজ জেলা মাদারীপুরে কিছু পছন্দের লোক নিয়োগ দেওয়ায় পুরষ্কার স্বরূপ ওই জেলার উপপরিচালককে (সিরিয়াল নম্বর ২৩) জেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক পদে পদায়ন করা হয়। এরফলে মাঠপর্যায়ে চরম অসন্তোষ ও চেইন অব কমান্ডে বড় রকমের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

ভুক্তভোগীরা জানান, বর্তমান সচিব অনিয়মের বিরুদ্ধে অনেক কঠোর হলেও এখনও পর্যন্ত তার কোনো প্রতিফলনদেখা যায়নি। উপসচিব মহসিন এখনও ক্ষমতাবান। এই পদ থেকে মোহসিনকে না সরানো পর্যন্ত পরিবর্তন আসবে না। মহসিন মন্ত্রণালয়ের সচিবকেও বিভ্রান্ত করেন এই চক্রের স্বার্থের জন্য। আরো অভিযোগ রয়েছে- আগের সচিবকে দিয়েও নানা অনিয়ম করিয়েছেন তিনি।

অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, আগে যখন নূর আলী সচিব ছিলেন তখন সিদ্ধান্তগুলো অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিবরা বাস্তবায়নে ভুমিকা রাখতেন। কিন্তু এখন সিন্ডিকেটের নিকট তারাও অসহায়।

সূত্র জানায়, একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যেন আলোচনার শেষ নেই সরকারের এ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাহান আরা বানুও বাস্তবিকভাবে তার কোনো কাজ করতে পারছেন না। এমনকি তার আদেশও কেউ পালন করে না। অধিদপ্তরে নামমাত্র ডিজি তিনি। সমস্ত কাজ চলে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। এ নিয়ে মাঠ প্রশাসনের ভেতরে ভেতরে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। সরকারের ঊর্ধতন মহলের আশু হস্তক্ষেপ চাইছেন এখানে কর্মরত ভুক্তভোগীরা।

সূত্রগুলো আরও জানায়, উপসচিব মহসিন এবং সহকারী পরিচালক আবদুল মান্নান নিজের এবং পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়েছে।

এ বিষয়ে সহকারী পরিচালক (পার্সোনাল ১) আব্দুল মান্নানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এটা কি করে সম্ভব ভাই। এগুলো মন্ত্রণালয়ের কমিটির মাধ্যমে হয়। এখানে অনিয়মের কোনো প্রশ্নই আসে না। উপসচিবের সাথে তার পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা, তাকে জেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি পাইয়ে দেওয়ার বিষয়টি জানাতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য না করে এড়িয়ে যান।

পরিচালক প্রশাসন খান মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, বদলি, পদোন্নতি এবং নিয়োগ একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়। সম্প্রতি অধিদপ্তরে কোনো পদোন্নতি হয়নি। ডিসেম্বরে যে পদোন্নতি হয়েছে সেটি মন্ত্রণালয় থেকে। আমরা এখান থেকে তালিকা পাঠিয়েছি সেই তালিকা বিচার বিশ্লেষণ করেই পদোন্নতি হয়েছে। আমরা যে তালিকা পাঠিয়েছি সেটিও জেষ্ঠ্যতার ভিত্তিতেই।

নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বলেন, পরিদর্শিকা নিয়োগের ফলাফল দ্রুতই হবে। নিয়োগ কমিটির সভা এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। সভা হলেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।