• ঢাকা
  • সোমবার, ২০ মে ২০২৪, ০৩:৫৫ অপরাহ্ন

এবারের ঈদযাত্রায় ৩৪১ দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৩৫৫ জনের


প্রকাশের সময় : মে ২, ২০২৩, ১:৩৭ অপরাহ্ন / ৪১
এবারের ঈদযাত্রায় ৩৪১ দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৩৫৫ জনের

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ পবিত্র ঈদুল ফিতরে যাতায়াতে দেশের সড়ক, রেল ও নৌ পথে সম্মিলিতভাবে ৩৪১টি দুর্ঘটনায় ৩৫৫ জন নিহত ও ৬২০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সড়ক-মহাসড়কে ৩০৪টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩২৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৯৫ জন। এবারের ঈদ যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা ১৮.২ শতাংশ ও প্রাণহানী ২১.১ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার  সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিশুকল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন ২০২৩ প্রকাশকালে এসব তথ্য তুলে ধরেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের ঈদে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত গরমসহ নানা কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০ শতাংশ কম মানুষের যাতায়াত হয়েছে। পাশাপাশি পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচলের কারণে মোট যাত্রীর ১৮.২ শতাংশ মোটরসাইকেলে যাতায়াত করেছেন। এতে আরও বলা হয়, ঈদযাত্রার ১৫ দিনে ৩০৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২৮ জন নিহত ও ৫৬৫ জন আহত হয়েছেন। ২০২২ সালের ঈদুল ফিতরে যাতায়াতের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা ১৮.২ শতাংশ ও প্রাণহানী ২১.১ শতাংশ এবং আহত ৩০ শতাংশ কমেছে। উল্লেখিত সময়ে রেলপথে ২৭টি দুর্ঘটনায় ২২ জন নিহত ও ৫৫ জন আহত হয়েছেন। আর নৌ-পথে ১০টি দুর্ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২২ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। এবারের ঈদে ১৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৬৭ জন নিহত ও ১২০ জন আহত হয়েছেন। যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৫৪.৩ শতাংশ এবং নিহতের ৫১ শতাংশ ও আহতের ২১.৩ শতাংশ প্রায়। যাত্রী কল্যাণ থেকে বলা হয়, এই সময় সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ৮৮ জন চালক, ১৬ জন পরিবহন শ্রমিক, ৪২ জন পথচারী, ৪৮ জন নারী, ৪০ শিশু, ১৭ জন শিক্ষার্থী, একজন সাংবাদিক, ০৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ০৪ জন শিক্ষক, ০৫ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ০২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ০৬ জন চিকিৎসকের পরিচয় মিলেছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের সদস্যরা বহুল প্রচারিত ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় দৈনিক, আঞ্চলিক দৈনিক ও অনলাইন দৈনিক এ প্রকাশিত সংবাদ মনিটরিং করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেন। সংগঠিত দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট যানবাহনের ৩৬.৯ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৩.৫ শতাংশ ট্রাক-পিকআপ ভ্যান-কাভার্ডভ্যান-লরি, ৫.৬ শতাংশ কার-মাইক্রো-জিপ, ৪.৬ শতাংশ নছিমন-করিমন-ট্রাক্টর-লেগুনা-মাহিন্দ্রা, ৬.৭ শতাংশ অটোরিকশা, ১২.৮ শতাংশ ব্যাটারি চালিত রিকশা-ইজিবাইক-ভ্যান-সাইকেল এবং ১৬.৯ শতাংশ বাস এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সংঘটিত দুর্ঘটনার ২৬ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৩৭.২ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা দেওয়ার ঘটনা, ২০.৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনায়, ১৬.৪ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ২.৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩৭.২ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২৬.৬ শতাংশ ফিডার রোডে হয়। এছাড়াও সারাদেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৩৬ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে হয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার এই চিত্রকে একটি নমুনা রিপোর্ট বলা যায়। প্রকৃতপক্ষে দেশে বর্তমানে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক ক্যান্সারের মতো বেড়ে যাওয়ার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে যে পরিমাণ সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানী ঘটছে, তা সংবাদমাধ্যমে আসে না। তাই এসব দুর্ঘটনার হিসেব রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এবারের ঈদে শুধু ঈদের দিনে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনায় ২১৬ জন পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯৬ জনের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। ঈদের দিন দুপুর ২টা পর্যন্ত ১০৫ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে ওই হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের মধ্যে ৩৫ জনের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। কেবল পঙ্গু হাসপাতালে এই দুই দিনে ভর্তি রোগীর সমপরিমাণ সড়ক দুর্ঘটনার খবরও সংবাদপত্রে আসেনি। ফলে এসব দুর্ঘটনার ভয়াবহতার খবর আপনাদের সামনে তুলে ধরতেও পারিনি।

তিনি আরও বলেন, সড়ক, রেল ও নৌ পথে গত ১৪ বছরে ধারাবাহিক উন্নয়নের ফলে সড়ক মহাসড়কের অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো। এসব সড়কে মানসম্মত বাসের অভাবে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ইজিবাইকের মতো ছোট পরিবহন অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার কারণে সড়কে বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব এসময় মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের আমদানি বন্ধের পাশাপাশি গণপরিবহনকে বিকশিত করার দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে যাত্রীকল্যাণ সমিতির পক্ষে থেকে দুর্ঘটনার কিছু কারণ জানানো হয়, দেশের সড়ক মহাসড়কে মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল। জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকায় হঠাৎ ঈদে যাতায়াতকারী ব্যক্তিগত যানের চালকদের রাতে এসব জাতীয় সড়কে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চালানো। জাতীয়, আঞ্চলিক ও ফিভার রোডে টার্নিং চিহ্ন না থাকার ফলে নতুন চালকদের অনেকেই এসব সড়কে দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছে। মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা।  উল্টোপথে যানবাহন চালানো, সড়কে চাদাঁবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন। অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া যানবাহন চালানো।

যাত্রীকল্যাণের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কিছু সুপারিশও দেওয়া হয়: জরুরী ভিত্তিতে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক আমদানি ও নিবন্ধন বন্ধ করা, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে রাতের বেলায় অবাধে চলাচলের জন্য আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ, যানবাহনের ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস প্রদান, ধীরগতির যান ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা, সড়কে চাদাঁবাজি বন্ধ করা, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা, সড়কে রোড সাইন, রোড মার্কিং স্থাপন করা, সড়ক পরিবহন আইন যথাযতভাবে বাস্তবায়ন করা। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ করা, গণপরিবহন বিকশিত করা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

এ সময় সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহ-সভাপতি তাওহীদুল হক লিটন, যুগ্ম মহাসচিব মনিরুল হক, প্রচার সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রাসেল প্রমুখ।