• ঢাকা
  • শনিবার, ১৩ Jul ২০২৪, ০৯:৪৫ অপরাহ্ন

এই শব্দসন্ত্রাস বন্ধ করিতে হইবে


প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ১৮, ২০২১, ১২:৩৪ অপরাহ্ন / ৪২৩
এই শব্দসন্ত্রাস বন্ধ করিতে হইবে

ঢাকা : বাংলাদেশে শীত মৌসুমে সামাজিক অনুষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বিবাহ-শাদি হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন মেলা ও উৎসবেরও আয়োজন করা হয় এই সময়ে। বিশেষ করিয়া নভেম্বর-জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কে আমাদের দেশে বিবাহ মৌসুম হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই সময়ে কমিউনিটি সেন্টারগুলির ব্যস্ততা বাড়িয়া যায়। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান যেমন- পানচিনি, বাগদান, গায়ে হলদু, বিবাহ, বিবাহোত্তর সংবর্ধনা, জন্মদিন, বিভিন্ন ধরনের সভা ইত্যাদি এই সময়ে তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। কিন্তু বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা যায়, উচ্চ স্বরে বাজানো হইতেছে দেশি-বিদেশি গান। অনেক সময় গভীর রাত অবধি চলিতে থাকে এই গানবাজনা। গানের সহিত অনেকে নাচিয়া ও হই-হুল্লোড় করিয়া আমদ-ফুর্তি করিয়া থাকে।

বিবাহসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে আনন্দ করা হইবে, ইহাতে দোষের কিছু নাই। কিন্তু শব্দদূষণের মাধ্যমে অন্যের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড এমনকি ঘুমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করিয়া প্রতিবেশীদের অধিকার হরণ করা অনাকাক্সিক্ষত। গত শুক্রবার ঝিনাইদহের শৈলকুপায় বিবাহবাড়িতে সাউন্ডবক্সে উচ্চ স্বরে গানবাজানোকে কেন্দ্র করিয়া প্রথমে কথা-কাটাকাটি হয়। ইহার পর দুই পক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র লইয়া সংঘর্ষে লিপ্ত হইয়া পড়ে। ইহাতে নারীসহ আহত হইয়াছে অন্তত ১৫ জন। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না করিলে আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটিতে পারিত।

এই হাঙ্গামাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলিবার কোনো অবকাশ নাই। আমাদের দেশে শহর ও গ্রামগঞ্জে এই ধরনের ঘটনা অহরই ঘটিয়া থাকে। বিশেষ করিয়া শহরের পাড়া-মহল্লায় উচ্চ স্বরে গভীর রাত পর্যন্ত গানবাজনা করা যেন রীতিতে পরিণত হইয়াছে। পরিবেশ আইন মানিয়া, সাউন্ড সীমিত করিয়া একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গানবাজনা করা যাইতেই পারে, কিন্তু এই ব্যাপারে অন্যের সুবিধা-অসুবিধাকে তোয়াক্কা না করা বা আইন না মানা মোটেও উচিত নহে। শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের কথা অবশ্যই আমাদের ভাবিতে হইবে। তাহাদের এইভাবে কষ্ট দেওয়া আইন পরিপন্থি ও অপ্রতিবেশীসুলভ। কিন্তু আমাদের প্রতিবাদহীনতা ও অসচেতনতার অভাবে এই ধরনের ঘটনা বাড়িয়া চলিয়াছে। নিয়ম অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা হইতে ভোর ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবল অতিক্রম করিতে পারিবে না। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতের আশেপাশের ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকা হইল নীরব এলাকা। ইহা ছাড়া আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা হইতে ৫০০ মিটারের মধ্যে নির্মাণকাজের জন্য ইট বা পাথর ভাঙার মেশিন ব্যবহার করা যাইবে না। খোলা জায়গায় বিবাহ, খেলাধুলা, কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো ধরনের সভা, মেলা ইত্যাদির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয় এবং পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় এই ধরনের শব্দ করা যাইবে না। রাত ১০টার মধ্যে এই সব অনুষ্ঠান অবশ্যই শেষ করিতে হইবে। কিন্তু এই সব নিয়ম মানা হইতেছে না। আইন ও বিধিমালার প্রয়োগ নাই বলিলেই চলে।

শব্দদূষণ দুশ্চিন্তা, অবসাদ, উদ্বিগ্নতা, নিদ্রাহীনতার পাশাপাশি ইহা ৩০টি কঠিন রোগের উল্লেখযোগ্য কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশন্যাল অ্যাসোসিয়েশন অব নয়েজ কন্ট্রোলের মতে, শব্দদূষণের কারণে হাইপারটেনশন, আলসার, হৃদরোগ, মাথাব্যথা বা স্বায়ুর সমস্যা হইতে পারে। ইহার কারণে ব্লাডপ্রেশার, শ্বাস-প্রশ্বাসের রোগ, এমনকি হজমেরও সমস্যা হইতে পারে। তাই ইহাকে শব্দদূষণ না বলিয়া শব্দসন্ত্রাস বলাই শ্রেয়। ইহা একটি নীরব ঘাতকও বটে। নাক-কান-গলার রোগবিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে দীর্ঘদিন কাটাইলে কানের নার্ভ ও রিসেপ্টর সেলগুলো নষ্ট হইয়া যায়। অতএব, অনুষ্ঠানের মৌসুমে উচ্চ স্বরে গানবাজনা অবশ্যই বন্ধ করিতে হইবে। এই ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হইতে হইবে সজাগ ও সতর্ক।