• ঢাকা
  • রবিবার, ১৯ মে ২০২৪, ০১:২৩ পূর্বাহ্ন

আসলামের যৌবনকালের ভালোবাসা


প্রকাশের সময় : মে ৫, ২০২৩, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন / ৩৭
আসলামের যৌবনকালের ভালোবাসা

বিশেষ প্রতিনিধিঃ যৌবনকাল থেকে পরম ভালোবাসায় প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করেন এমন লোক খুঁজে পাওয়া দায়। প্রথমে দেখা, তারপর আগ্রহ আর ভালোবাসা, সেই থেকেই বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের আসক্তি আজ অবধি চলছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে নষ্ট, ভাঙা, পুরাতন সকল বাদ্যযন্ত্রসহ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রায় ৬শ’ বিরল বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করে সংস্কৃতিপ্রেমীসহ নানা শ্রেণি-পেশার লোকজনের প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
তার নাম আলী আসলাম। তিনি ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া এলাকার বাসিন্দা। নোভিস ফাউন্ডেশন নামে একটি সাংস্কৃতি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। নোভিন আর্টিস্টিক এডুকেশন সেন্টার নামের একটি শিক্ষালয়ও পরিচালনা করছেন। এখানে উপমহাদেশীয় ও পাশ্চাত্য রীতির সমন্বয়ে সংগীত, নৃত্য, চারুকলা, গিটার, বেহালা এবং দোতারা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এছাড়াও বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সংগীত সংগঠন সমন্নয় পরিষদ বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শহরের জি কে এম সি সাহা রোডের বড় বাজারে নবাব এন্ড কোং নামে একটি বাদ্যযন্ত্রের দোকান রয়েছে। যেটি পরিচালনা করছেন আলী আসলাম। দোকান ঘরটি সব ধরনের বাদ্যযন্ত্রে সম্পূর্ণ পরিপূর্ণ। এগুলো সংগ্রহের জন্য নগরীর আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠের বিপরীতে একটি গির্জার নিচতলায় এশিয়ান মিউজিক মিউজিয়াম নামে একটি জাদুঘর গড়ে তুলেছেন। তবে দোকানটি পরিচালনা আর বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের পেছনে আসলাম সম্পর্কে রয়েছে আরও তথ্য। ১৯৪৪ সালে আসলামের দাদা নবাব আলী ওই দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেন। বংশ পরম্পরায় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসাটি দাদার মৃত্যুর পর বাবা জালাল উদ্দিন পরিচালনা করে আসছিলেন। স্কুল জীবন শেষ করে বাবাকে সহযোগিতা করতে দোকানে আসেন রেজাউল করিম আসলাম। দোকানে অনেক পুরাতন বেহালা, সেতার ও তানপুড়া পড়ে থাকতে দেখে সেগুলোর যত্ন নিতে শুরু করেন তিনি। একসময় এসব ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের প্রেমে পড়ে যান এবং সংগ্রহের প্রতি আসক্তি তৈরি হয়। সেই থেকেই দোকানটি পরিচালনা করে আসছেন তিনি।

রেজাউল করিম আসলামের সংগ্রহে থাকা বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে রয়েছে- একতন্ত্রী বীণা, সেতার, সারেঙ্গী, এসরাজ, তম্বুরা, বেহালা, গোপীযন্ত্র, ব্যাঞ্জো, সারিন্দা, আনন্দ লহরি, সুরবাহার, ম্যান্ডেলিন, তুবড়ি, বাঁশি, শঙ্খ, সানাই, ক্ল্যারিওনেট, ট্রাম্পেট, হারমোনিয়াম, প্রেমজুড়ি, নাকাড়া, ঢোল, ডমরু, খঞ্জরি, মৃদঙ্গ, তবলা, ঝাঁঝর, ঘণ্টা, খঞ্জনি, করতাল, ঘড়ি, কৃষ্ণকাঠি, মেকুড়, নূপুর, সেকাস, পাখোয়াজ ও শারদ, চেম্পারেঙ, দভণ্ডি, চিকারা, যোগী সারঙ্গী, মুগরবন, অ্যাকোর্ডিয়ান, ঘেরা, পেনা, শিঙা ইত্যাদি। এগুলো ছাড়াও জলসাঘরের তৈজসপত্রও আসলামের সংগ্রহে আছে। এগুলো হলো- ফুলের সাজি, ফুলদানি, প্যাঁচানো ফুলদানি, পানি সাকি, সুরাপাত্র, ঘণ্টা, নর্তকী, হুঁকো, তামাপাত্র, পানিপাত্র, মোমদানি, দেয়াল নকশি, খানদানি হুঁকো, পিকদানি, ছাইদানি জুতা, ছাইদানি প্লেট ও দুধপাত্র। জাতীয় জাদুঘরের ২৮ নম্বর গ্যালারিতে তার সংগ্রহে থাকা ৩২ টি দেশীয় বাদ্যযন্ত্র স্থান পেয়েছে।

এছাড়া সংগৃহীত বাদ্যযন্ত্রগুলো নিয়ে ২০০৩ সালে ময়মনসিংহ লোকজ মেলায় প্রথম প্রদর্শনী করেন রেজাউল করিম আসলাম। পরের বছর ২০০৪ সালে জয়নুল সংগ্রহশালায়। ২০০৬ সালে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ঢাকার বৈশাখী উৎসবে, ২০০৮ সালে জয়নুল উৎসবে, ২০১২ সালে মোতাহার হোসেন বাচ্চুর জন্মবার্ষিকীতে ও ২০১২ সালে হালুয়াঘাটে প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহে বাদ্যযন্ত্রগুলো প্রদর্শন করেন। এরপর ২০১৬ সালে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবে, ২০১৭ সালে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সিলেটের আবুল মাল আব্দুল মুহিত ক্রিড়া কমপ্লেক্সে লোকজ উৎসবে ও ২০১৯ সালে হালুয়াঘাটের ক্ষুদ্র নৃত্বাতীক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরে বাদ্যযন্ত্র, পোশাক-পরিচ্ছদ ও যুদ্ধাস্ত্রসহ ১৪৯টি নিদর্শন দেন রেজাউল করিম আসলাম। বিরল বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ সম্পর্কে রেজাউল করিম আসলাম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, শখের বশেই বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করেন তিনি। বহু বাদ্যযন্ত্র নতুন প্রজন্মের চোখের আড়ালে থেকে যাচ্ছে। তাদের চোখের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করছেন। বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের পাশাপাশি এগুলো নিয়ে গবেষণাও চালিয়ে যাচ্ছি। এর ফলে বাংলাদেশে লোকসংগীতের বিকাশ ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সহজতর হবে।

এ বিষয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ময়মনসিংহের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর বাসার ভাসাণী বলেন, বর্তমান সময়ের নতুন প্রজন্ম অনেক দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের নামই জানে না। আর তাই এসব বাদ্যযন্ত্র নিয়ে রেজাউল করিম আসলাম জাদুঘর গড়ে তোলায় এগুলো সম্পর্কে ধারনাসহ নতুন প্রজন্ম বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার জানতে পারবে। এছাড়া বাংলার সংস্কৃতি ধরে রাখতে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার প্রয়োজন। বাদ্যযন্ত্রের প্রতি ভালোবাসার কারনেই দূর-দূরান্ত থেকে ভাঙ্গা, নষ্ট, পুরাতন ও বিরল বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করতে পেরেছেন রেজাউল করিম আসলাম।