• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১২ পূর্বাহ্ন

যুদ্ধ-সংঘাতে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দুনিয়া: কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে এখনই প্রস্তুতির সময় বাংলাদেশের


প্রকাশের সময় : জুন ২৩, ২০২৫, ১০:০৭ অপরাহ্ন / ২৪৭
যুদ্ধ-সংঘাতে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দুনিয়া: কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে এখনই প্রস্তুতির সময় বাংলাদেশের

বর্তমান বিশ্ব যেন দাঁড়িয়ে আছে এক অনিশ্চিত দ্বিধাবিভক্ত মোহনার সামনে-যেখানে একদিকে পরমাণু অস্ত্রের ছায়া, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ধ্বংসের বাস্তবতা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে যে চরম ধাক্কা দিয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি পৃথিবী। এরই মধ্যে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার উত্তেজনা সেই বৈশ্বিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধ-সংঘাত কেবল মানবজীবনের জন্য নয়, বিশ্ব খাদ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব রাজনীতিতে এখন এক অনির্বচনীয় প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে-ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং পরমাণু শক্তির আধিপত্য বিস্তারের জন্য। শক্তিধর দেশগুলোর এই দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য-নেশা কেবল ওই অঞ্চলের নয়, পুরো বিশ্বের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। পরমাণু হুমকি ও পাল্টা হুমকির পাল্লায় পড়ে এখন যে কোনো মুহূর্তে এক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে মানবজাতি। সেই বিপর্যয়ের আগে আমাদের মতো ছোট ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য জরুরি কিছু সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা ও নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে দেশের স্বার্থ রক্ষা করাই হবে চূড়ান্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। বিশ্ব যখন দুই বা ততোধিক শক্তিধরের সংঘাতে জর্জরিত, তখন শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক নীতিই বাংলাদেশকে রক্ষা করতে পারে দীর্ঘমেয়াদে।

তবে কেবল কূটনীতি নয়, অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাও গড়ে তোলা জরুরি। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে—কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা। ইতিহাস বলছে, যুদ্ধে সবচেয়ে দ্রুত হুমকির মুখে পড়ে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা। রফতানি বন্ধ হয়, আমদানি থেমে যায়, দাম বাড়ে, দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়। সুতরাং আমাদের জন্য এখনই সময় নিজস্ব খাদ্য উৎপাদনে আত্মনির্ভরতা গড়ে তোলা এবং কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার।

বাংলাদেশের কৃষি অনেক বাধা পেরিয়ে এখনো টিকে আছে, তবে তা যথেষ্ট নয়। বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ, জলবায়ু সহনশীল বীজের ব্যবহার, কৃষকদের ভর্তুকি ও আধুনিক প্রশিক্ষণ, পানি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষিকে আরও টেকসই ও উৎপাদনক্ষম করতে হবে।

বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলো যুদ্ধ ও আধিপত্যের খেলায় ব্যস্ত থাকলে এবং খাদ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে, তখন বাংলাদেশ যেন নিজেদের জনগণের খাবার নিশ্চিত করতে পারে—এই প্রস্তুতিই এখন সময়ের দাবি। এমনকি নিজেদের চাহিদা পূরণ করে বিশ্ববাজারে কৃষি ও খাদ্য রপ্তানির একটি সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। কারণ যুদ্ধে জর্জরিত বিশ্বে খাদ্যই হতে যাচ্ছে পরবর্তী ‘সোনার খনি’।

এই মুহূর্তে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের উচিত, যুদ্ধের ঝুঁকি মাথায় রেখে একটি জাতীয় কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা রূপরেখা তৈরি করা। দুর্যোগ ও যুদ্ধকালীন জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ করা হবে, সে বিষয়ে একটি শক্তিশালী কাঠামো দাঁড় করাতে হবে।

এখন প্রশ্ন, আমরা কি প্রস্তুত? আমরা কি আগাম বিপদের আলামত বুঝতে পারছি? নাকি আগের মতো পরিস্থিতি ঘনিয়ে আসার পর সিদ্ধান্ত নিতে যাব?

যে পৃথিবী যুদ্ধ ও সংঘাতে প্রতিনিয়ত কাঁপছে, সেখানে খাদ্য উৎপাদনশীলতা ও কৃষি সক্ষমতাই হবে ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ শক্তি। বাংলাদেশকে সেই লক্ষ্যেই এখন প্রস্তুত হতে হবে।
আমাদের মাটি, আমাদের কৃষক-এখন তাদের ঘামেই টিকে থাকতে পারে জাতি।

এই সত্য অনুধাবন করে এখনই সিদ্ধান্ত নিলে, আমরা ধ্বংসের মুখে থেকেও হয়ে উঠতে পারি বিশ্ববাসীর কাছে এক টেকসই ও শান্তিপূর্ণ উদাহরণ।

 

✍️ লেখক: হাফিজুর রহমান শফিক
সাংবাদিক।