শিরোনাম

রবীন্দ্রনাথ শিল্প-সাহিত্যের আলোকধারায় ছুঁয়েছিলেন বাঙালীর মন-প্রাণ

আজকের বিডি সাহিত্য ডেস্ক: বাঙালীর যাপিত জীবনে সর্বক্ষণই তিনি বিরাজমান। সেই সুবাদে তিনি চিরকালের ও চিরদিনের। আপন সৃষ্টির নির্যাসে প্রতিনিয়ত নির্মাণ করে চলেছেন জাতিসত্তার মননকে। এভাবেই বাঙালীর প্রাণের মানুষে পরিণত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। সেই আত্মপরিচয়টি মেলে ধরেছিলেন এভাবে সেতারেতে বাঁধিলাম তার, গাহিলাম আরবার/মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক…। সৃষ্টির আলোয় ছড়িয়েছিলেন রবির কিরণ। শিল্প-সাহিত্যের আলোকধারায় ছুঁয়েছিলেন বাঙালীর মন-প্রাণ। আনন্দ বা উচ্ছ্বাসে হয়েছেন প্রেরণার সঙ্গী। সংকটে জুগিয়েছেন আশার আলো। সাহিত্য বা শিল্পের আশ্রয়ে বাঙালীকে দেখিয়েছেন সংস্কৃতিবান হয়ে ওঠার পথের দিশা। তাঁর হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য জাতীয়তার গন্ডি পেরিয়ে পেয়েছিল আন্তর্জাতিকতার ঠিকানা। স্বদেশের ঠিকানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিকতায় ঠাঁই করে নিয়েছিল বাঙালীত্বের গৌরববৌধ। বাংলা পঞ্জিকার হিসেবে রবিবার ছিল বাইশে শ্রাবণ, কবির বিদায়ী দিন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৬তম প্রয়াণবার্ষিকী। বিশ্বব্যাপী উগ্রন্থার আগ্রাসন, অমানবিকতার উত্থান ও হিংসা-হানাহানির অস্থির সময়ে কবির মহাপ্রস্থানের দিনটিতে বারংবার উচ্চারিত হয়েছে শান্তির বারতা। ব্যক্ত হয়েছে হিংসার পথ দূলে ঠেলে মানবতার পথে ধাবিত হওয়ার প্রত্যয়। রবির সৃজনী শক্তির আলোয় উগ্রপন্থার অন্ধকার শক্তির বিরুদ্ধে গাওয়া হয়েছে জীবনের জয়গান।robindro

নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে পালিত হয়েছে কবিগুরুর প্রয়াণবার্ষিকী। এ উপলক্ষে পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বকবিকে নিবেদিত বিশেষ সংবাদ। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় ছিল বহুমাত্রিক আয়োজন। কোথাও উচ্চারিত হয়েছে দোলায়িত ছন্দে বিশ্বকবির অবিনাশী কবিতা। আবার কোন চ্যানেলে দিনভর নানা শিল্পীর সুরেলা ধ্বনিতে গীত হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীত। কোথাও বা প্রচারিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ রচিত নাটক। বিশিষ্টজনের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে কবির বর্ণাঢ্য শিল্প ও সাহিত্য জীবন। বেতারেও প্রচার হয়েছে নানা অনুষ্ঠান। ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট গানের সুরে ও কাব্যনাট্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেছে রবি ঠাকুরকে। ‘পরিবেশ, নির্মাণসংস্কৃতি ও রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক একক বক্তৃতা ও সঙ্গীত পরিবেশনার আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। একইভাবে ‘রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক আলোচনা ও সঙ্গীতাসন্ধ্যার আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরে সংস্কৃতিবান বাঙালী প্রাত্যহিক জীবনাচারে সহজাতভাবেই স্মরণ করেছে কবিগুরুকে। শান্তির শপথে নিয়েছে আগামী দিনের পথচলার প্রেরণা।

কবির প্রয়াণবার্ষিকীতে ছায়ানটের শ্রদ্ধাঞ্জলি

রবিবার শ্রাবণ সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী শিল্পীরা গানে গানে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছে কবিকে। সম্মেলক ও একক গানের সঙ্গে পরিবেশিত হয়েছে শ্রুতি কাব্যনাট্য। আয়োজনটি উপভোগে কবিগুরুর অনুরাগীদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে ছায়ানট মিলনায়তন। সম্মেলক কণ্ঠের আশ্রয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। বিশ্বকবির প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করে অনেকগুলো এক স্বরে গেয়ে ওঠেÑ বাজাও তুমি কবি, তোমার সঙ্গীত সুমধুর/গম্ভীরতর তানে প্রাণে মম…। এছাড়া সম্মেলক কণ্ঠে গাওয়া অন্য গানগুলোর শিরোনাম ছিল ‘বাদল-বাউল বাজায় রে’, ‘কোন পুরাতন প্রাণের টানে’ ও ‘শ্রাবণের গগনের গায়’। জহিরুল হক খান ও শামীমা নাজনী পরিবেশিত ‘কর্ণ কুন্তী সংবাদ’ শীর্ষক শ্রুতি কাব্যনাট্যের আবৃত্তি মোহাবিষ্টতা ছড়িয়েছে শ্রোতা-দর্শকের। এছাড়াও আবৃত্তি করেন এটিএম জাহাঙ্গীর। একক কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন লাইসা আহমেদ লিসা। গেয়ে শোনান ‘অশ্রু ভরা বেদনা’ শিরোনামের গান। মোস্তাফিজুর রহমান পরিবেশন করেন তুর্য ‘এসো গো জ্বালিয়ে দিয়ে যাও’, ফারজানা আক্তার পপি ‘এসেছিলে তবু আস নাই’, সেজুঁতি বড়ুয়া ‘দিনের বেলায় বাঁশি তোমার’, ইফফাত আরা দেওয়ান ‘শ্রাবণের ধারার মত’, আব্দুল ওয়াদুদ ‘শ্যামল ছায়া নাইবা পেলে’, সেমন্ত্রী মঞ্জরী ‘এই শ্রাবণের বুকের ভিতর’, সুকান্ত চক্রবর্তী ‘যে রাতে মোর দুয়ার গুলি’, সুতপা সাহা ‘আমার দিন ফুরালো’ ও নাঈমা ইসলাম নাজের কণ্ঠে গীত হয় ‘রাত্রি এসে যেথায় মেশে’। সব শেষে সবাই মিলে গেয়ে ওঠে ‘আমার সোনার বাংলা আমি আমি তোমায় ভালোবাসি’। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে শেষ হয় কবিগুরুকে নিবেদিত এ আয়োজন।

শিল্পকলা একাডেমির স্মরণে রবীন্দ্রনাথ

কবির প্রয়াণ দিবসের ‘রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক আলোচনা ও সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির। গানের সুরে, কবিতার শিল্পিত উচ্চারণে কিংবা বক্তার আলোচনায় শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে বিশ্বকবিকে। একাডেমির সঙ্গীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও লেখক ড. হায়াৎ মামুদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল।

আলোচনা শেষে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। একাডেমির শিশু শিল্পীদের সম্মেলনের গানের সুরে শুরু হয় পরিবেশনা পর্ব। রবির কিরণে উদ্ভাসিত অনেক কচিকণ্ঠ এক সুরে গেয়ে শোনায় তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে মোর প্রাণে, এ আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে…। শিশুদলের পরিবেশিত পরের গানের শিরোনাম ছিল ‘আকাশভরা সূর্য তারা’। একক কণ্ঠে অনিমা রায় গেয়ে শোনান ‘ ছি ছি চোখের জলে ভেজাসনে আর মাটি’ ও ‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান’। কমলিকা চক্রবর্তীর কণ্ঠে গীত হয় ‘তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে’ ও ‘আমার সকল দুঃখের প্রদীপ’। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েল সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা পরপর পরিবেশন করে তিনটি রবীন্দ্রসঙ্গীত। গানগুলো হলোÑ ‘ঐ মহামানব আসে’, ‘শুভ কর্মপথে নির্ভয়ে গান’ ও ‘আনন্দ ধ্বনি জাগাও গগনে’। সুরের মাঝে কবিতার শব্দধ্বনি। আবৃত্তিশিল্পী মাহমুদা আক্তার পাঠ করেন ‘নিষ্ফল কামনা’ শিরোনামের কবিতা। নুসরাত বিনতে নূর গানে সুরে বলে যান রূপময় ঋতু বর্ষার কথা। গেয়ে শোনান ‘শ্রাবণের ধারার মত পড়ুক ঝরে’। সাজেদ আকবর পরিবেশিত গানের শিরোনাম ছিল ‘সঘন গহন রাতি’। সরকারী সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিল্পীদের সম্মেলক কণ্ঠে গীত হয় ‘সুরের গুরু দাও গো সুরের দীক্ষা’। সৈয়দ হাসান ইমামের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় ‘বোঝাপড়া’ ও ‘দুঃসময়’ শিরোনামের কবিতা। এছাড়াও রবীন্দ্র রচনা থেকে আবৃত্তি করেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় ও কৃষ্টি হেফাজ। মহিউজ্জামান চৌধুরী ময়না পরিবেশিত গানের শিরোনাম ছিল ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’ ও ‘তুমি কি কেবলই ছবি’। সুললিত কণ্ঠে শামা রহমান গেয়ে শোনান ‘বন্ধু রহো রহো সাথে’। একই সঙ্গে স্বদেশ ও কবিগুরুর প্রতি ভালোবাসা নিবেদন করে মামুন জাহিদ খান পরিবেশন করে ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’ ও ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে’ শীর্ষক দুটি গান। জলি রহমানের কণ্ঠে গীত হয় রূপ ‘সাগরে ডুব দিয়েছি অরূপ রতণ আশা করে’। রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের শিল্পীদের সম্মেলক গানের সুরে শেষ হয় রবীন্দ্র প্রয়াণবার্ষিকীর এ আয়োজন।##

Be Sociable, Share!
বিভাগ: সাহিত্য

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*