শিরোনাম

বেকারত্ব ঘোচাতে পোল্ট্রি খামার

2016_04_06_11_30_24_Z9N6vzTOLLpsBcWt1C6bsZZUa3H47T_originalউত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় শহর রাজশাহী। শহর হিসেবে অনেক বড় হলেও কর্মসংস্থানের সুবিধা অনেক সীমিত। এ অঞ্চলে স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য কর্মসংস্থান ও আয়ের পথ প্রসারিত করতে পোল্ট্রি শিল্প হতে পাবে অন্যতম একটি মাধ্যম বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রায় ১০ বছর আগে থেকেই রাজশাহী মহানগরী ও আশেপাশের উপজেলায় পোল্ট্রি শিল্পের প্রসার ঘটেছে। যদিও অনেক প্রতিকুল পরিবেশের কারণে এ শিল্পে কয়েক বছরে উত্থান-পতন ঘটেছে। শুধু তাই না দেশে আমিষের চাহিদা মেটাতেও পোল্ট্রি শিল্পের ভুমিকা অনেক।

রাজশাহী ও রংপুরের ১৬টি জেলায় প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি পোল্ট্রি খামার আছে। এর মধ্যে রাজশাহী জেলার নয় উপজেলায় ৫৯০টির মধ্যে ১৭৭টি লেয়ার এবং ৪২২টি বয়লার খামার রয়েছে। রাজশাহী পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী মহানগরীর মধ্যে এর সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। বিগত বছরগুলোতে এ সংখ্যা আরো বেশি ছিল। নানান প্রতিকুলতায় এ সংখ্যা কমেছে।

স্বল্প পুঁজি নিয়ে নিজে প্রতিষ্ঠিত হতে গেলে পোল্ট্রি একটি অন্যতম শিল্প। মাত্র ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার পুঁজি নিয়েও অল্প জায়গার মধ্যেও এ ব্যবসা করে নিজেকে বেকার মুক্ত করতে পারে মানুষ। সে কারণে শিল্পটিকে ঘিরে সারাদেশের মতো রাজাশাহীতে হাজার হাজার যুবক ও সাধারণ মানুষ স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করে। অনেকেই এ শিল্প শুরু করে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়েছেন অনেকেই। কেউ বা বড় ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।

দেশের পুষ্টির দিকে বিবেচনা করলেও এ শিল্পের সম্ভাবনা অনেক বেশি।  ২০১৫ সালের শেষে বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির (বিপিআইসিসি) আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায় তথ্য দেয়া হয় যে,  ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ডিম এবং প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন মুরগির মাংসের প্রয়োজন হবে। বিনিয়োগ দরকার হবে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই চাহিদা কিংবা বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা বাড়াতে হবে, সরকারকে পোল্ট্রিখাতে আরও বেশি নজর দিতে হবে। ঢাকাস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, একজন মানুষের বছরে ন্যূনতম ১০৪টি ডিম খাওয়া উচিত। উন্নত বিশ্বে বছরে জনপ্রতি গড়ে ২২০টি ডিম খাওয়া হয় এবং জাপানে খাওয়া হয় ৬০০টি। আর আমাদের দেশে এর পরিমাণ হলো জনপ্রতি মাত্র ৫০টি। সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষের বছরে কমপক্ষে ১৮ থেকে ২০ কেজি মুরগির মাংস খাওয়া উচিত। উন্নত বিশ্বে জনপ্রতি মুরগির মাংস গ্রহণের পরিমাণ ৪০ থেকে ৪৫ কেজি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বছরে গড়ে ৫১ দশমিক ১ কেজি মাংস খায় এবং কানাডায় জনপ্রতি বছরে মাংস ভোগের পরিমাণ ৩৬ দশমিক ৫০ কেজি।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে বছরে জনপ্রতি মাংস ভোগের পরিমাণ মাত্র ৩ দশমিক ৬৩ কেজি। প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডিম ও মুরগির মাংস খাওয়ার পরিমাণ আরো অনেক কম। এ বিশাল পরিমান ঘাটতি মেটাতেও এ শিল্পকে আরো অনেক দুর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

তবে পোল্ট্রি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সময় সময় নানান কারণে এ শিল্পে ধস নেমে আসে। এতে অনেক ব্যবসায়ীকে হতাশায় পড়তে হয়। রাজশাহীতে ৫ বছরে সাড়ে ৩ হাজার পোল্ট্রি খামার বন্ধ হয়ে গেছে। পোল্ট্রি খামারিদের অভিযোগ শুধু সরকারি পৃষ্টপোষকতার অভাবে খামারিরা সমস্যায় পড়েছে।

রাজশাহী পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক জানান, পোল্ট্রি খামারিদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল একটি নীতিমালার জন্য। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছেন। কিন্তু সেই নীতিমালাতে কী আছে তা খামারিরা এখনো জানেন না।

তিনি আরো অভিযোগ করেন, মনিটরিংয়ের অভাবেও এ অপার সম্ভাবনাময় শিল্পটি ক্ষতির মুখে পড়ছে। বাজারে গরুর মাংসের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাজারে গরুর মাংসের দাম খুব বেশি হলে ১০ থেকে ২০ টাকা উঠানামা করেন। কিন্তু পোল্ট্রি মুরগির ক্ষেত্রে কখনো মাংসের দাম ২৫০ টাকা আবার কখনো ১০০ টাকাতেও নেমে আসে। এতে করে ক্ষতির মুখে পড়েন খামারিরা।’

খামারিদের অভিযোগ, রাজশাহী জেলায় এক সময় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পোল্ট্রি খামার গড়ে ওঠে। কেউ মাংসের জন্য ব্রয়লার মুরগি আবার কেউ ডিম উৎপাদনকারী লেয়ার মুরগি পালন করতে থাকেন। বর্তমানে এসব খামারের মধ্যে প্রায় দুই হাজার খামার টিকে আছে। এ শিল্পে রাজশাহীতে অন্তত ১০ হাজার বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সঠিক পৃষ্টপোষকতা পেলে এ শিল্পে রাজশাহীতে ৫০ হাজারের বেশি বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব বলে মনে করেন শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

খামারিদের অভিযোগ, ক্রমাগত খাবার ও ওষুধের দাম বৃদ্ধি ও পাশাপাশি ডিম ও মাংসের দাম সে অনুযায়ি বৃদ্ধি না হওয়ার কারণে এ শিল্পটি বারবার ধাক্কা খেয়েছে।

শিল্পটি ধ্বংসের পেছনে অপপ্রচার অন্যতম একটি কারণ বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন সময় অপপ্রচারের কারণে এ শিল্পের বাজারে ধস নেমেছে। এতে অনেক খামারি ক্ষতির মুখে পড়েছে।

পোল্ট্রি খামারিদের অপার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, একজন ব্যক্তি যদি মাংসের জন্য এক হাজার মুরগি নিয়ে খামার করে তাহলে দুই মাসের মধ্যে প্রতিটি মুরগির ওজন ৬০০ গ্রাম হবে। এ ৬০০ কেজি মাংস উৎপাদন করতে ব্যয় হবে ৯০ হাজার টাকা (প্রতি কেজি ১৫০ টাকা)। বাজারে ২০০ কেজি দরে বিক্রি করলে আয় হবে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। খামারি কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা দুই মাসে লাভের মুখ দেখবে। অল্প জায়গা নিয়েই খুব সহজের একজন বেকার যুবক খামারটি করতে পারে।

আগে অনেক কষ্ট হলেও এখন মুরগির ওষুধ, চিকিৎসক ও খাবার একেবারে হাতের কাছে পাওয়া যায়। সে জন্য মুরগি বিভিন্ন রোগে মোড়ক লেগে মারা যাওয়ার সম্ভবনাও কমে গেছে বলে তিনি জানান।

খামারিরা জানান, শিল্পটির জন্য সহজ শর্ত ও নীতি প্রণয়ণ করতে হবে। এছাড়াও বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই এ শিল্প দিয়েই অনেকাংশে রাজশাহী অঞ্চলের বেকার সমস্যা সমাধান হবে পারে।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: কৃষি খবর, সারা বাংলার খবর

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*