শিরোনাম

হাজার বছরের পুরনো বাঙালির নিজস্ব-স্বতন্ত্র সর্ব ধর্ম শ্রেণী পেশার অনন্য অসম্প্রদায়িক উৎসব বর্ষবরণ : মুক্তবুদ্ধির মানুষকে কোণঠাসা করে ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে সরকার

বুলবুল আহমেদ সোহেল : আজ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলা নতুন বছরকে আপন সংস্কৃতির অনুশীলনে বরণ করে নেয়ার দিন। এই দিনকে সামনে রেখে ঐতিহ্যিক অনুসঙ্গের সমন্বয়ে হাজার বছরের পুরনো বাঙালির নিজস্ব-স্বতন্ত্র অনন্য অসম্প্রদায়িক উৎসবে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের সব শ্রেণী পেশার মানুষ বাংলা নববর্ষ বরণে জেগেে উঠেছে।  প্রাণের আনন্দে আর আবেগের উচ্ছলতায়। বৈশাখ ও বাঙালিয়ানার উন্মাদনায় মেতে উঠছে সমগ্র বাঙালি। সেই প্রাণের উৎসব সফল করতে ব্যস্ত সংস্কৃতি অঙ্গনসহ নানান সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন-প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এবারের এই বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবের আয়োজন ঘিরে সরকারের দেয়া নির্দেশনা দিনটির প্রকৃত মাহাত্ম্যকেই সংকীর্ণ করবে বলে মনে করছেন দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য মানুষ ও চিন্তকেরা। তারা বলছেন- পহেলা বৈশাখ নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠানে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দেয়ার নানা আয়োজনের নামে উল্টো জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। নিরাপত্তার অজুহাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। নির্দেশনায় বিকেল ৫টার পরও অনুষ্ঠান না চালানোর যে বিধিনিষেধ দেয়া হয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ। গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদী বর্ষবরণ করার ঘোষণা দিয়েছে ‘নারী নিরাপত্তা জোট’। তারা বলেছে, বিধিনিষেধ আরোপ করে মুক্তবুদ্ধির মানুষকে কোণঠাসা করে ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে সরকার।বৈশাখ
নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠান ঘিরে নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে নির্দেশনা জারি করেছে তার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই দেশের বিশিষ্ট সংস্কৃতি কর্মীরা ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে এবং অযথা আতঙ্ক ছড়ানোর মতো কর্মকান্ড না করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। এর পাশাপাশি বর্ষবরণের প্রশাসনিক নির্দেশনা ভেঙে বিকেল ৫টার পরেও যতক্ষণ প্রয়োজন ততক্ষণই অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়ার এবং অনুষ্ঠান আয়োজনের তীব্র প্রতিবাদের সঙ্গে ঘোষণা দিয়ে আসছে। তারা বলছে পহেলা বৈশাখে অনুষ্ঠানমালার সময় নিয়ন্ত্রণের অপচেষ্টা সফল হবে না। এছাড়া শুধু চারুকলা ইনস্টিটিউট নয়, দেশের সব তরুণ-তরুণী মুখোশ পরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেবে। সরকার নিরাপত্তা দিতে না পারলে আমরা নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা দেব।
এবারের পহেলা বৈশাখ ও নববর্ষ বরণকে সামনে রেখে গতকাল ‘নারী নিরাপত্তা জোট’ এর ‘পহেলা বৈশাখ ১৪২৩ উদযাপন এবং নারী নিরাপত্তা জোট-এর অবস্থান’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে তেমনই প্রতিবাদী আহ্বান জানানো হলো। এছাড়াও জোটের পক্ষ থেকে বিকেল ৫টার পর জনগণ উন্মুক্ত স্থানে থাকতে পারবে না এ ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাতিল করা; উন্মুক্ত স্থানসমূহে যেন নারী-পুরুষ সকলের চলাচলের উপযোগী থাকে তার ব্যবস্থা করা; নারীর নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করা এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া; প্রতিটি নারী নির্যাতনের ঘটনায় অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বানও জানানো হয়।1e7ebcf6e6304a5bbf7f40b64897a281
মঙ্গলবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলা বর্ষবরণ’ অনুষ্ঠানে বাধানিষেধ আরোপের সমালোচনা করে মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, সরকার মুক্তবুদ্ধির মানুষকে কোণঠাসা করে ধর্মান্ধ, মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। সরকার নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ তারা কোন অবস্থাতেই এই ধর্মান্ধ, মৌলবাদী যারা সাম্প্রদায়িকতাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চাচ্ছে না, তাদের মুখোমুখি দাঁড়াতে চাচ্ছে না। পক্ষান্তরে যারা মুক্তবুদ্ধির মানুষ তাদের উপরে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে এই শক্তিগুলোকে অনেক বেশি প্রশ্রয় দিচ্ছে; শক্তিশালী করে তুলছে বলে মনে করেন নারী নিরাপত্তা জোটের এই আহ্বায়ক।
ফারাহ কবির বলেন, একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে শুধু নারী নয়, নারী-পুরুষ উভয়ের উপরই এর প্রভাব পড়বে। নারী পুরুষ সবার জন্য নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, কোন ধর্মান্ধতা বা মৌলবাদ ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়ে এ ধরনের উৎসবকে ঘরবন্দী করা যাবে না। আগামীতে পহেলা বৈশাখের মতো একুশে ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ-এর মতো জাতীয় উদযাপনেও এর প্রভাব পড়বে। তিনি আরও বলেন, অন্যায়ের সঙ্গে সহাবস্থান করলে সমস্যার সমাধান হয় না, এজন্য সমন্বিত ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
ড. ওয়াজেদুল ইসলাম খান বলেন, এই ন্যক্কার ঘটনায় নারীদের ঘরে বন্দী রাখার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। গত বাংলা বর্ষবরণে নারীদের হয়রানির এই ঘটনাটিকে কোনভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বলার কোন সুযোগ নেই। পুরো ঘটনাটি নারী সমাজের উন্নয়নের জন্য যেমন হুমকি, তেমনি বাংলার সংস্কৃতির জন্য এটি হুমকিস্বরূপ।
সেলিনা আহমেদ বলেন, উন্নয়নের কথা বলে নারীকে আমরা আবদ্ধ করছি, নারীর চলাচলের স্থান বদ্ধ করে ফেলছি। আমরা উল্টো দিকে হাঁটছি কিনা প্রশ্ন রেখে বলেন- শুধু নারী নয়, নারী-পুরুষ উভয়কেই এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে, নারীকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে এবং নারী নির্যাতন রোধে উভয়কেই এগিয়ে আসতে হবে।images১
প্রসঙ্গত, গতবছর ‘১৪২২ বর্ষবরণ’ অনুষ্ঠানে নারীদের উপর হামলা এবং যৌন নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে বিভিন্ন সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীদের প্রচেষ্টায় গত বছর ২৬ এপ্রিল ‘নারী নিরাপত্তা জোট’ নামে একটি ঐক্যবদ্ধ নাগরিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়। এ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন নারী নিরাপত্তা জোটের আহ্বায়ক ফারাহ কবির, ড. ওয়াজেদুল ইসলাম খান ও সেলিনা আহমেদ। ###

Be Sociable, Share!
বিভাগ: প্রধান খবর - ১, সম্পাদকীয়

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*