শিরোনাম

রাজনৈতিক সংগঠনের কাউন্সিলের গুরুত্ব শুধু দলীয় লোকদের কাছে নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও অসামান্য

কোনো গণতান্ত্রিক দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাউন্সিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাতে দলের আশু লক্ষ্য ও কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয় এবং নতুন নির্বাহী পরিষদ নির্বাচিত হয়। সম্মেলনে আর যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হয় তা হলো পূর্ববর্তী সম্মেলনের পরবর্তী সময়ের দলের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা এবং ওই সময়ে নেতৃত্ব কী কী সঠিক ও ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার বিচার-বিশ্লেষণ। সারা দেশের প্রতিনিধিদের কাছে নেতাদের জবাবদিহি করতে হয়। এসব কারণে রাজনৈতিক সংগঠনের কাউন্সিলের গুরুত্ব শুধু দলীয় লোকদের কাছে নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও অসামান্য।
গত দুই সপ্তাহে বাংলাদেশের দুটি রাজনৈতিক দলের কাউন্সিল অধিবেশন হয়ে গেল। একটি সরকারি জোটের অন্যতম শরিক দলের এবং আর একটি বিরোধী দলের—এমনকি সংসদের বাইরের একটি দলের। প্রথমটির সম্মেলন নিয়ে দেশবাসীর অনিদ্রার কোনো কারণ ছিল না। সে সম্মেলন কবে কোথায় হবে তা নিয়েও দেশবাসী ও সংবাদমাধ্যমের কিছুমাত্র আগ্রহ ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয়টির সম্মেলন কোথায় হবে এবং কোন দিন হবে, তা নিয়ে হাজারো কথা। সম্মেলনের জায়গার অনুমতি প্রার্থনা করে দরখাস্ত লিখে এই কর্মকর্তার অফিস থেকে ওই কর্মকর্তার অফিসে ধরনা দিতে গিয়ে দলের নেতাদের অনেকের লাঞ্চ পর্যন্ত করা হয়নি। এক বোতল পানি খেয়েই দুপুর পার করেছেন।

IMG_20141205_212155সব ভালো তার শেষ ভালো যার—এই থিওরি সরকারের শরিক দলটির সম্মেলনের ব্যাপারে প্রযোজ্য হয়নি। গোল বেধেছে শেষ সময়ই। দলের ভেতরে গণতন্ত্রের পরিপূর্ণ চর্চা করতে গিয়েই বিপত্তি বাধে। ওই গোলটা না বাধলে সম্মেলনের সংবাদ পত্রপত্রিকায় দু-চার অনুচ্ছেদের বেশি ছাপাই হতো না। এক পক্ষ আরেক পক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি অবহেলা প্রভৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অন্যদিকে আরেক পক্ষ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষক বলে। দল দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। তবে ওই দলের ভেতরে প্রবলভাবে গণতন্ত্রের চর্চা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ না থাকায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা উচ্চবাচ্য করেননি।

দ্বিতীয় দলটির ভেতরে যে গণতন্ত্র নেই—এই বেদনা থেকে হাহাকার করতে দেখা গেল সরকারি টক শোজীবী প্যানেলের কারও কারও। খবরের কাগজে যাঁরা রচনা লেখেন তাঁদেরও অনেকে দলে গণতন্ত্র না থাকা নিয়ে তীব্র বেদনা প্রকাশ করেন। তাঁদের একটি অভিযোগ, এত দেরিতে কেন সম্মেলন। নির্ধারিত সময়ে সম্মেলন না করা দলের বিরুদ্ধে আর একটি অভিযোগ। স্বচ্ছ বাক্স ও ব্যালট পেপার নিয়ে গত সংসদ নির্বাচন যেভাবে হয়েছে সেভাবে দলের সব পদে নির্বাচন হলে তাঁরা সন্তুষ্ট হতেন। এখন সম্মেলনের পরে তাঁদের অন্তরে অতৃপ্তি রইল, সাঙ্গ করে মনে হইল, শেষ হয়েও হইল না শেষ। বড় কবির কবিতা দিয়ে ছোটগল্পের সংজ্ঞার মতো। সম্মেলনটি দলের নেতা-কর্মীদের নয়, তাদের বিরোধীদেরই তৃপ্তি দিতে পারল না।

জার্মানি বা ব্রিটেনের মাটি আর বাংলার মাটি এক জিনিস নয়। বাংলার মাটির রাজনৈতিক দল আর অন্য গণতান্ত্রিক দেশের রাজনৈতিক দল একই চরিত্রের হবে না। দলে গণতন্ত্রের চর্চা হোক—এই আবদার আমরা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে কয়েক বছর ধরে করে আসছি। আমাদের সমাজে পরিবারেই গণতন্ত্র নেই। আট সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিবার। বাবা-মা, তিন বোন, দুই ভাই এবং এক বিধবা ফুফু। পরিবারের সব সিদ্ধান্ত নেন পরিবারপ্রধান। অন্য কারও কথার কোনো মূল্য নেই। উপমহাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোও একনেতাসর্বস্ব। কংগ্রেসে গান্ধী, মুসলিম লিগে জিন্নাহ, আওয়ামী লীগে প্রথমে ভাসানী, পরে সোহরাওয়ার্দী এবং শেষে শেখ মুজিব, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে ভাসানী। তাঁদের সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত।

প্রতিটি জাতীয় সম্মেলনে নেতা পরিবর্তন করলেই কোনো দল শক্তিশালী হয় না। উপমহাদেশের প্রথম ও প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত ৩৮ বছরে কংগ্রেসে নেতা পরিবর্তন করা হয়েছিল ৩৫ বার। অর্থাৎ ৩৮ বছরে সভাপতি ছিলেন ৩৫ জন। তাঁরা মস্ত মস্ত নামজাদা মানুষ ছিলেন। দাদাভাই নওরোজি, বদরুদ্দিন তাইয়েবাজি, স্যার ফিরোজশাহ মেহতা, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, আনন্দ মোহন বসু, গোপাল কৃষ্ণ গোখলে, রাসবিহারী ঘোষ, মদনমোহন মালব্য, নবাব সৈয়দ মোহাম্মদ, অ্যানী বেসান্ত, হাসান ইমাম, মতিলাল নেহরু, লালা লাজপত রাই, হাকিম আজমল খান, চিত্তরঞ্জন দাশ, আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা মোহাম্মদ আলী প্রমুখ বাঘা বাঘা ব্যক্তিত্ব। এই পঁয়ত্রিশ জন পঁয়ত্রিশটি জাতীয় সম্মেলনের পর দলকে জনগণের কাছে নিয়ে যেতে পারেননি। কংগ্রেস একটি উপরতলার সুবিধাবাদীদের সংগঠন হয়েই ছিল।

এই বাঘাদের তুলনায় খুবই কম পরিচিত, শীর্ণকায় এবং সাধারণ বস্ত্রপরিহিত এক আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। তাঁর মতো আইনজীবী তখন সারা ভারতে অসংখ্য। প্রথম মহাযুদ্ধের শেষদিকে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে সারা দেশ ঘুরে মানুষের বাহ্যিক অবস্থা ও তাদের মনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। ১৯২০ সালে কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে তিনি তাঁর অহিংস অসহযোগের ফর্মুলা পেশ করেন প্রবল বিরোধিতার মধ্যে। শেষ পর্যন্ত সেটা গৃহীত হয় এবং জনগণ তা লুফে নেয়। বিশেষ করে যুবসমাজ, বুড়োরা নয়। কোনো শীর্ষ পদে না গিয়েও তিনি হয়ে ওঠেন কংগ্রেসের অবিসংবাদিত নেতা। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে যাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতির বিশ্লেষক হিসেবে অলিখিত নিযুক্তি পেয়েছেন তাঁরা জানেন না মহাত্মা গান্ধী সারা জীবনে মাত্র একবারই কয়েক মাসের জন্য কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন, আর কক্ষনো নয়। ১৯২৪ সালে বেলগাম কংগ্রেস সম্মেলনে তাঁকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সভাপতি করা হয়। এক বছর পর ১৯২৫ সালে কানপুর সম্মেলনে তিনি তা সরোজিনী নাইডুর হাতে অর্পণ করেন। কিন্তু কংগ্রেসের নেতৃত্ব তাঁর শাহাদত বরণের দিন পর্যন্ত তাঁর হাতেই থেকে যায়।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনের পর পত্রপত্রিকায় লেখালেখি ও টেলিভিশনে আলোচনা যথেষ্টই হয়েছে। রাজনীতির কথিত বিশ্লেষকদের অনেকেরই দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল: এই সম্মেলন থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা কী পেলেন? যেন এই সম্মেলনে আগত হাজার হাজার প্রতিনিধির হাতে একটি করে পোঁটলা ধরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। সেটা স্বেচ্ছাচারিতাবশত দলীয় প্রধান তাঁদের না দিয়ে বঞ্চিত করেছেন।

রাজনৈতিক বিষয়ে পটু এমন দুজন বিজ্ঞ ব্যক্তিকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাঁরা ব্রিটিশ যুগের কংগ্রেস বা লীগের জাতীয় সম্মেলনের ইতিহাস জানেন কি না এবং ১৯৪৭-পরবর্তী সময়ের আওয়ামী লীগ এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির জাতীয় সম্মেলনের ইতিকথা সম্পর্কে অবগত কি না? তাঁদের মৌনতা দেখে মনে হলো তাঁরা ওসব জানার প্রয়োজন বোধ করেন না।

তাঁদের অবগতির জন্য বলেছি, আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর প্রথম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে পুরান ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে। কিন্তু দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন হয় ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর রূপমহল সিনেমা হলে। সেসব সম্মেলনের মুদ্রিত ভাষণ ইত্যাদি আমি বহু কষ্টে জোগাড় করেছিলাম। সেসব সম্মেলনে পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার ও ভাগ্য নিয়ে কথা হতো। ১৯৫৫ সালের সম্মেলনে দলের সভাপতি মাওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি অতি পুরাতন। দেশরক্ষা, বৈদেশিক নীতি ও মুদ্রা প্রস্তুত এই তিন বিষয়ের ক্ষমতা ছাড়া আর সমস্ত বিষয় আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ছাড়িয়া দিতে হইবে। দেশরক্ষা বিভাগের নৌবাহিনীর সদর দপ্তর পূর্ববঙ্গে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যও প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতাধীন থাকিবে।’

ওই সম্মেলনে প্রদত্ত মাওলানার দীর্ঘ বক্তৃতাটি পুস্তিকা আকারে ছেপে সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রচার সম্পাদক আবদুল হাই (মাওবাদী কমিউনিস্ট নেতা আবদুল হকের ভাই) কয়েক হাজার কপি দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন। সম্মেলনে ভাসানী তাঁর ভাষণে আরও বলেছিলেন, ‘আমরা মুসলমান—পাকিস্তানকে ইসলামি রাষ্ট্র বলিয়া ঘোষণা করা হইবে এই চিৎকার উঠিতেছে।…দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র গঠনের কথা বলা হইতেছে। পাকিস্তানে শুধু মুসলমানই পাকিস্তানী নহে—বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, হিন্দু সকলেই পাকিস্তানী জাতি। পাকিস্তানে চারি জাতির বাস যাহারা কল্পনা করেন তাহারা ভবিষ্যতে পাকিস্তানকে চতুষ্পদের স্থান বলিয়া ছাড়িবেন এই ভয় হয়।’

পাকিস্তানের সাড়ে ২৩ বছরে আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির খুব কমই জাতীয় সম্মেলন হয়েছে। সে জন্য দুই দলের নেতাদের দোষ দেওয়া যাবে না। মামলা-মোকদ্দমায় নেতা-কর্মীরা নাজেহাল থাকলে জাতীয় সম্মেলন ভালোভাবে করা সম্ভব হয় না। আমার মনে পড়ে, ষাটের দশকে আওয়ামী লীগের দু–একটি সম্মেলনে রমনা গ্রিনে ও হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে কবি জসীমউদ্‌দীন ও রফিকুল ইসলাম (পরে দর্শনা কলেজের বাংলার শিক্ষক এবং একাত্তরে পাকিস্তান বাহিনীর হাতে শহীদ), আমিও দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। প্রধান রাজনৈতিক দলের জাতীয় সম্মেলনে নেতার মুখ থেকে এমন কিছু কথা উচ্চারিত হয়, যা জাতির ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। এখন কি তাই হচ্ছে?

দলের কেন্দ্রীয় নেতা ঘন ঘন বদলালে দল শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক হয়, সে ধারণা সঠিক নয়। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বদলাতে হয় নেতাকেই। তাতেই দলে গতি আসে। ষাটের দশকে ঘন ঘন কাউন্সিল করে মিজানুর রহমান চৌধুরী বা কোরবান আলীকে আওয়ামী লীগের সভাপতি করলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। খালেদা জিয়া রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। ওগুলো কাগজে লেখা কথা। তিনি নিজেকে বদলাতে পারবেন কি না? নেতা নিজেকে না বদলালে কিছুই অর্জন সম্ভব নয়।

( প্রথম আলোতে প্রকাশিত এ লেকাটির রেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ এর সাথে আমি এক মত )

Be Sociable, Share!
বিভাগ: সম্পাদকীয়

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*