শিরোনাম

ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ ও রক্তস্নাত মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সর্বক্ষেত্রে বাংলাভাষা ব্যবহার করতে হবে

 

দূতাবাস ও বিদেশী প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের সব সাইনবোর্ড, নেইমপ্লেট ও গাড়ির নম্বর প্লেট বাংলায় লেখার নির্দেশ দিয়েছেন মহামান্য হাইকোর্ট। এক মাসের মধ্যে এই আদেশ বাস্তবায়ন করতে হবে। এছাড়া গণমাধ্যমসহ সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ কেন দেয়া হবে নাÑ তা জানতে চেয়ে একটি রুলও জারি করেছেন আদালত। মন্ত্রিপরিষদ, আইন, স্বরাষ্ট্র ও সংস্থাপন সচিবকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে হবে। গত সোমবার আদালতের জারি করা এই নির্দেশ ও রুল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উল্লেখ্য, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে দেশে আইন পাস হয়েছে ১৯৮৭ সালের মার্চ মাসে। ওই আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন ছাড়া অন্যান্য সব ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহার করবে। নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে। উল্লিখিত কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তাহলে তা বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। যদি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন তাহলে উক্ত কাজের জন্য তিনি সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ করেছেন বলে গণ্য হবে এবং তার বিরুদ্ধে বিধি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলো ২৭ বছর অতিবাহিত হলেও আজো দেশে এই আইন বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পর্যন্ত এই আইন ঢালাওভাবে অমান্য করে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে বিধি অনুসারে কোনো ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। এ প্রেক্ষাপটে আইনটি বাস্তবায়নের নির্দেশ চেয়ে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দ। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি এ সংক্রান্ত একটি রিট দাখিল করেন, যার প্রেক্ষিতে গত আদালত উল্লিখিত নির্দেশ দেন। গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি আদালতের দৃষ্টিগোচর করার জন্য আমরা রিটকারী আইনজীবীকে সাধুবাদ জানাই।

ভেবে বিস্মিত হতে হয়, যে ভাষায় দেশের সর্বসাধারণ কথা বলেন, যে ভাষা ব্যবহারের অধিকার রক্ষার জন্য আমাদের পূর্বসূরিরা রাজপথে রক্ত দিয়েছেন, সে ভাষা দেশের দপ্তরগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে না, এ সংক্রান্ত আদালতের নির্দেশ পর্যন্ত উপেক্ষিত হচ্ছে। এক সময় বলা হতো উচ্চ আদালত ও উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিভাষার অভাবসহ আরো কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা। এরপর তো অনেকদিন কেটে গেছে, সে অবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে। উচ্চ আদালতের রায় বাংলায় লিখে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সচেতন বিচারক মহোদয়গণ। কিন্তু তা ব্যাপকভাবে অনুসৃত হচ্ছে না। এখনো আদালতে বাংলাভাষার ব্যবহার যথেষ্ট নয়, বলে সমালোচনা আছে। কম্পিউটারসহ যোগাযোগ প্রযুক্তিতে বাংলাভাষা ব্যবহার এখন যথেষ্ট সাবলীল। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নথিপত্র বাংলায় লিখতে কোনো সমস্যা থাকারই কথা নয়। আর সর্বসাধারণের জন্য প্রদর্শিত ব্যবসা ও সেবা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড বা বিজ্ঞাপন সর্বসাধারণের ভাষা বাংলায় না হওt20121018_1350564528য়ার কোনো কারণ থাকতে পারে কি। এখানে মানসিক দৈন্যতাই কি স্পষ্ট নয়। বাংলাভাষা ব্যবহারে এই অবজ্ঞা আত্মপ্রবঞ্চনারই শামিল, যা ক্ষমার অযোগ্য।

আমাদের বিশ্বাস, আদালতের তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশ আদালতসহ সর্বক্ষেত্রে বাংলাভাষার ব্যবহারে গতি সঞ্চার করবে; আদালতের এই নির্দেশ সবাই মান্য করবেন এবং নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্টরা তৎপর হবেন। ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ ও রক্তস্নাত মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সর্বক্ষেত্রে বাংলাভাষা ব্যবহারে সবাইকে মনোযোগী হতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনোপ্রকার সীমাবদ্ধতা থাকলে তাও কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা নিতে হবে।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: সম্পাদকীয়

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*