শিরোনাম

বাঙালি জাতির স্বাধীনতার লড়াই সম্পর্কে তারেক কিছুই জানেন না, বই পড়ে জানার চেষ্টা না করে ইতিহাস বানানোর চেষ্টা করছে

Tareq

ঢাকা: বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২৫ মার্চ লন্ডনে এক আলোচনা সভায় বলেন, জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। শুধু রাষ্ট্রপতিই নন, স্বাধীনতার ঘোষণাও জিয়া নিজে ড্রাফট করে নিজেই তা পাঠ করেছেন।এর কয়েকদিন পর গত ৯ এপ্রিল কেন্দ্রীয় লন্ডনের ওয়েস্ট মিনস্টার হলে যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত এক সুশীল সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সেইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বও ‘অবৈধ’ বলে দাবি করেন তিনি।তারেকের এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্টজনরা বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্ব বৈধ ও সংবিধানসম্মত।তারা বলেন, ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আইনসম্মতভাবেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। আগের দিন হেয়ার রোডে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাসভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থার বদলে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত হয়। ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের প্রধান উপদেষ্টা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সংবিধানের প্রণেতা ও বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম‍ বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর দায়িত্ব নেওয়া সম্পূর্ণভাবে সংবিধানসম্মত। এখনকার সংবিধানেও এটির বৈধতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর দায়িত্ব নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে তা হবে সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই লঙ্ঘনের জন্য আইনে আনুষ্ঠানিক শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া যারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপপ্রচার করবে, তাদের ঘৃণা করার মাধ্যমে জনগণ সবচেয়ে বড় শাস্তি দেবে। তিনি আরো বলেন, একটি মহল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে ঘৃণ্য অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে, এটি তাদের মানসিক বিকৃতির বহিঃপ্রকাশ। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই  দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এসব ঘৃণ্য বক্তব্যের মাধ্যমে জাতির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে।
বিশিষ্ট সাংবাদিক কামাল লোহানী তারেক রহমানের বক্তব্যকে ‘ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ১১ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা বৈঠকের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। সবার জানা ইতিহাসকে এখন উল্টে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। বাঙালি জাতির অধিকার রক্ষা ও স্বাধীনতার জন্য ২৩ বছরের লড়াই সম্পর্কে তিনি (তারেক) কিছুই জানেন না। এখন বই পড়ে তিনি জানার চেষ্টা না করে নিজের মতো করে ইতিহাস বানানোর চেষ্টা করছেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও তার ইতিহাস নিয়ে কথা বলার যোগ্যতা তারেক রহমানের নেই। তিনি যেভাবে নিচুমানের মিথ্যাচার ও অসঙ্গতিপূর্ণ কথাবার্তা বলছেন, তা নিয়ে কথা বলা মর্যাদা হানিকর বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তারেকের বক্তব্যে দেশের সুধী মহলেও ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দশম সংসদের চলমান অধিবেশনে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ মামলা দায়েরের দাবিও করেছেন অনেক সংসদ সদস্য। সংসদে তারেক রহমানের বক্তব্যের তীব্র নিন্দাও জানানো হয়।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘অবৈধ প্রধানমন্ত্রী’ বলায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ‘আহাম্মক’ বলেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, একটা অর্বাচীন ছেলে আজ কী বলে! এটা দেশের সঙ্গে রীতিমতো বেয়াদবি! তারেককে সঠিক ইতিহাস জানার অনুরোধের পাশাপাশি অনেকে তার চিকিৎসার কথাও বলেছেন।ক্ষুব্ধ বক্তব্যে তারেক রহমানকে ‘তার ছেঁড়া এক ছোকড়া’ ও ‘ভারসাম্যহীনের প্রলাপ বকা’ বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণা হিসেবেই নথিভুক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরে। এতে উল্লেখ রয়েছে, ২৬ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা ২৫ মার্চ রাতে চট্টগ্রামে কিভাবে পৌঁছায় সে বিষয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারের ওয়ার করেসপন্ডেন্ট ও বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব মুসা সাদিক এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ২৫ মার্চ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার মধ্যে চট্টগ্রামের বীর জনগণ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ও চট্টগ্রাম পোর্ট পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ও অবরোধ করে ফেলে। ২৫ মার্চের দুপুরে চট্টগ্রামে ইপিআরের মেজর রফিক তার সমন্বয়কারী ছাত্রনেতা বখতিয়ার নূর সিদ্দিকীর মাধ্যমে ছাত্রনেতাদের কাছে মেসেজ পাঠান যে, সিআরবিসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তার ফোর্স সিক্রেট পজিশন নিয়ে ফেলেছে।
চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট থেকে শহরের ওপর যদি পাকিস্তানি সৈন্যরা আকস্মিক হামলা করে তা মোকাবেলার জন্য ২৫ মার্চ, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এম আর সিদ্দিকী, এম এ হান্নান, জহুর আহম্মদ চৌধুরী প্রমুখ চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও ছাত্রনেতা আবদুর রব ও ছাত্রলীগের অন্যান্য শীর্ষ নেতা গোপনে বৈঠকে বসেন। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের দিক থেকে যেকোনো আক্রমণ প্রতিহত করার বিষয়ে বৈঠকে বেশ কিছু গোপন সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
২৫ মার্চ সারা দিন ও সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে রাত ১১টার দিকে কাজেম আলী রোডের বাড়ি ফিরে কিছু খেয়ে আমার বড় ভাই ও আমি দৈনিক আজাদী অফিসে গেলাম রাত ১টার দিকে। আমাদের বাড়ি থেকে ১০-১২টা বাড়ি পরেই দৈনিক আজাদী অফিস। আমরা সেখানে হেঁটে গেলাম। দৈনিক আজাদী অফিসের দোতলায় আমরা সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ এমপির কাছে গেলে তিনি ঢাকা থেকে তৎক্ষণাৎ টেলিপ্রিন্টারে আসা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সংবলিত ইংরেজি টেক্সট দেখালেন এবং বললেন : ‘জাফর সাহেব, দেখুন ঢাকায় ম্যাসাকার (গণহত্যা) হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এখন আমাদের সামনে আলজিরিয়া-ভিয়েতনামের মতো দীর্ঘ স্বাধীনতার যুদ্ধ।’ রাত তখন ১টা ১০ মিনিট। অর্থাৎ সেটা তখন ২৬ মার্চের প্রথম প্রহর। আমিও পড়লাম সেই টেলেক্স মেসেজ। টেলেক্স মেসেজটি আমি সঙ্গে সঙ্গে লিখে নিলাম।
৮ বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়া ২৭ মার্চ সন্ধ্যা ৭টায় স্বাধীন বাংলা বেতারে বঙ্গবন্ধুর নামে ও পক্ষে স্বাধীনতার যে ঘোষণা দেন, এই তার পটভূমি। ওই ঘোষণার অনুষ্ঠানের চাক্ষুস সাক্ষীরা অনেকেই জীবিত আছেন।তিনি আরও উল্লেখ করেন, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মহান বীর ও জেড ফোর্সের কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব পালনকাল পর্যন্ত কখনো বিস্মরণেও উচ্চারণ করেননি যে, তিনি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নথিতে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখেই ওয়াশিংটনে স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের এক জরুরি বৈঠক চলছিল। ওই বৈঠকে সিআইএ’র পক্ষ থেকে অংশ নিচ্ছিলেন রিচার্ড হেমস। সভাপতিত্ব করছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। বৈঠকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতার হওয়া নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও তথ্য তুলে ধরা হয়।
সেই বৈঠকেই রিচার্ড হেমস বলেন, অজ্ঞাত স্থান থেকে রেডিও বার্তায় শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।১৯৬৯-এর তদানীন্তন পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সময়ের তথ্য রয়েছে এই নথিতে। ‘ভল্যুম আপডেট’ নাম দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক যাবতীয় কার্যক্রমের গোপনীয় দলিল-দস্তাবেজ প্রকাশ করেছে এতে। ওই সময়ে যেসব তথ্য গোপনে সংগ্রহ বা আদান-প্রদান করা হতো সে সবই প্রকাশিত হয়েছে এসব নথিতে। এর মধ্যে বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়সহ সে সময়কার বিশ্বের যাবতীয় কূটনৈতিক বিষয়সহ সিআইএ’র বিভিন্ন নথিও প্রকাশ পেয়েছে।বাংলাদেশ বিষয়ে সে সময়ে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারসহ ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের প্রতিটি বৈঠক ও প্রতিদিনের ঘটনাপঞ্জি, টেলিফোন কথোপকথন, টেলিগ্রাম বার্তার হুবহু বর্ণনা রয়েছে এসব নথিপত্রে।
পররাষ্ট্র দফতরের প্রকাশিত এই গোপনীয় দলিলগুলোর অন্তত একটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ রয়েছে।এত সব তথ্য-প্রমাণের পরও তারেক রহমান কীভাবে বলেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ‘প্রথম রাষ্ট্রপতি’!

Be Sociable, Share!
বিভাগ: রাজনীতি

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*