শিরোনাম

এই সঙ্কট কাটানো যাবে?

250844_190নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের রাজনীতি অনেকটা দুই দলনির্ভর- বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। এ দুই দলের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতা ঘোরাফেরা করে। তৃতীয় স্রোত তৈরির প্রয়াস যে হয়নি তা নয়। এখনো এমন উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে এসব ছোট দলের তৃতীয় স্রোত গঠনের প্রচেষ্টা কখনোই খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। লক্ষ করা যাবে প্রধান যে দুই দল, তাদের নেতৃত্বে যে জোট রয়েছে, যেমন- আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রয়েছে ১৪ দল। একমাত্র আওয়ামী লীগ ভিন্ন আর যেসব দল ১৪ দলে রয়েছে, সাধারণ মানুষ তাদের নামও ঠিকমতো বলতে পারবে না। আবার বিএনপির নেতৃত্বে যে ২০ দল, তাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী একটি বড় দল, অন্য দলগুলো খুবই ছোট।

এ দুই বড় দলেরই এখন নানামুখী সঙ্কট রয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় রয়েছে, কিন্তু এই ক্ষমতা যেন তাদের সঙ্কটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা মাঠপর্যায়ে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি নিয়ে পরস্পর দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে রয়েছেন। এমনকি এসব সঙ্ঘাতের কারণে নিজেদের হাতে দলীয় কর্মীরা হতাহত হচ্ছেন। আর এমন দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের ফলে দলের ঐক্য সংহতি ভেঙে পড়ছে। সংসদ নির্বাচনের আবহ তৈরি হওয়ায় আসনওয়ারি প্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তাই প্রার্থী মনোনয়ন করতে গিয়েও দলের হাইকমান্ড সমস্যায় পড়বেন। দলের এসব সমস্যার বাইরে এখন বিচার বিভাগের সাথে সরকারের যে টানাপড়েন, তা নিয়েও সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে উচ্চ আদালতের রায় ও রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে সরকার বিপাকে পড়েছে। এসব বিষয় নিয়েও তারা উৎকণ্ঠিত। সরকার এর আগে আরো দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে, কিন্তু আগামী নির্বাচনে সরকার কোন কথা বলে বা তাদের কোন সাফল্য নিয়ে জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার জন্য ভোট চাইবে?

তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য গত দুই মেয়াদে তাদের কাজের কী খতিয়ান তারা জনগণের সামনে নিয়ে দাঁড়াবে। চলতি মেয়াদের শেষবর্ষে এসে দেশের যে হাল এখন হয়েছে তাতে তাদের ক্ষমতাচর্চায় বড় ঘাটতি ফুটে উঠেছে। তাই তাদের নির্বাচনী প্রচারকাজে আত্মরক্ষামূলক বক্তব্য নিয়েই দাঁড়াতে হবে। প্রতিপক্ষের শতমুখী সমালোচনার তীর তাদের ওপর গিয়ে পড়বে। তা ছাড়া ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়টি নিয়ে তাদের ভূমিকা কিন্তু বোদ্ধা ভোটারদের মনে দাগ কেটেছে। এ বিষয়টি যেকোনোভাবেই নির্বাচনের সময় একটা ইস্যু হয়ে দেখা দেবে। বর্তমান সময়ে নারী নির্যাতনের বিষয়টি খুবই আলোচিত। নারী ও শিশুদের ওপর যে যৌন হয়রানি চলছে, তা গোটা সমাজকে ভাবিয়ে তুলছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের কোনো বাড়তি সতর্কতা লক্ষ করা যাচ্ছে না।

এ বিষয়টিও আগামী নির্বাচনে নারী ভোটারসহ সাধারণ ভোটারদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকার নারীসমাজের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নের কিছু কাজ লক্ষ করা গেলেও সামগ্রিক বিবেচনায় তা খুব উল্লেখযোগ্য নয়। বহু অসহায় নারী বিভিন্ন বেশ্যালয়ে আছেন। যেখানে তাদের এক গ্লানিকর জীবন যাপন করতে হয়। এই অসহায় নারীদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব সরকারের। অতীতের সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারের এ ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা নেই।

ভাসমান ভোটার বলে একটি কথা নির্বাচনী ময়দানে রয়েছে। এসব ভোটারের কোনো দলের প্রতি যেমন অনীহা নেই, তেমনি এরা কোনো দলের প্রতি একনিষ্ঠও নন। এমন ভোটারের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। এসব ভোটার ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের ভূমিকার তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন করে ভোট দিয়ে থাকেন। এসব ভোটারই আবার কোনো দলের জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে বিরাট প্রভাব ফেলে। ক্ষমতাসীনেরা আগামী নির্বাচন পর্যন্ত তাদের কাজের ক্ষেত্রে ভালো করতে না পারলে এই ভোটারদের সমর্থন পাওয়া যাবে না। সম্প্রতিক শাসক দল বিরোধী দলের প্রতি যে অগণতান্ত্রিক আচরণ করছে, তা সাধারণ মানুষ পছন্দ করছে না। একটি গণতান্ত্রিক শক্তির এমন আচরণ শোভনীয় নয়। এমন কর্মকাণ্ড গণতন্ত্রের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য অন্তরায় সৃষ্টি করে। গণতন্ত্রে স্বাভাবিক চর্চা বিঘিœত হলে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কায়েম হতে পারে। জনগণের যে মৌলিক মানবাধিকার তা হারিয়ে যায়। আমাদের সংবিধানে মুক্তভাবে সংগঠন করার অধিকার সন্নিবেশিত রয়েছে এবং সে আলোকে আইনানুগভাবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড অবাধে পরিচালনার অধিকার দেয়া হয়েছে। এটার ব্যত্যয় ঘটলে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হবে।

সরকারের বিরুদ্ধে এতসব নেতিবাচক বিষয় নির্বাচনের আগে শাসক দল পুষিয়ে নিতে পারবে কি না, তা ভাবার বিষয়। দেশের কোনো দল নির্বাচনে এবারের আগে পরপর দুই দফা বিজয়ী হতে পারেনি। বর্তমানে আওয়ামী লীগ একটি প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় রয়েছে। এরপর আগামীতে টানা তৃতীয় দফা বিজয়ের মুখ দেখা খুবই কঠিন। অথচ তারা সেটাই কামনা করছে। জনগণ চাইলে তারা ক্ষমতায় আসীন হবেÑ এমন কথাও বলছে না। তাদের ইচ্ছা ব্যক্ত করাই যেন নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার একমাত্র বিষয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দলটির কাছে এমনটি কেউ প্রত্যাশা করে না। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায়। কিন্তু দায়িত্ব পেয়ে তারা একটি ভালো সংবিধান প্রণয়ন করে বটে, কিন্তু পরে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে তারাই। রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো কাঠামো তারা নির্মাণ করতে পারেনি। এটা একটা বড় ব্যর্থতা।

দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপি। কিন্তু দলটির সঙ্কট যেন ছাড়ছেই না। আর এ সঙ্কট হালের নয়। অতীতে তারা এ সঙ্কট কখনো সফলতার সাথে মোকাবেলা করেছে, কখনো তা সম্ভব হয়নি।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক শাহাদতবরণ থেকেই তাদের দুর্ভোগের দিনের সূচনা। এরপর বিএনপি নতুন নির্বাচন মোকাবেলা করে সফলতার সাথে ক্ষমতায় আসে। সেটা দলটির সাফল্য। কিন্তু ক্ষমতাসীন হলে তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদ সরকারকে নানাভাবে বিপদগ্রস্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। ক্ষমতায় যাওয়ার মাত্র কিছু দিন পরই এরশাদ বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এ সময় বেগম খালেদা রাজনীতিতে আসেন এবং বিএনপির হাল ধরেন। তার নেতৃত্বে দীর্ঘ প্রায় দশ বছর রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করে বিএনপি। এই আন্দোলন সফলতার সাথে পরিচালনার জন্য জনগণ বিএনপিকে পুনরায় ক্ষমতাসীন করে। পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তারা ক্ষমতা হারিয়ে পুনরায় রাজপথে নেমে আসে। এরপর পাঁচ বছর নানা সমস্যার মুখোমুাখি হয় বিএনপি। এই সঙ্কটের সময় ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে বিএনপি পুনরায় বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু ক্ষমতায় থাকার এই সময়টা তারা সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনায় ব্রতী হতে পারেনি। বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগ আন্দোলনের নামে সরকারকে নানাভাবে বেকায়দায় ফেলে। পরে আসে নির্বাচন।

এ সময় গঠিত হয় সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার। এই সরকার বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তার দলের নেতাকর্মীদের পরিকল্পিতভাবে হেনস্তা করতে থাকে। বেগম খালেদা জিয়াসহ নেতাদের জেল-জুলুমসহ বিএনপকে দ্বিধাবিভক্ত করার প্রয়াস চালায়। কেয়ারটেকার সরকারের মেয়াদ তিন মাস হলেও সংবিধান লঙ্ঘন করে সে সরকার দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থেকে কারসাজির নির্বাচন করে। সে নির্বাচনে বিএনপিকে হারিয়ে দেয়া হয়। সেই কেয়ারটেকারের দুই বছর বিএনপি নেতানেত্রীবিহীন অবস্থায় সঙ্কটের আবর্তে ঘুরপাক খায়; যে পরিস্থিতি মোকাবেলায় তারা বিজ্ঞতার পরিচয় দিতে পারেনি। কেয়ারটেকার সরকারের দেয়া সেই বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপিকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। এ থেকে শুরু হয় বিএনপির দুর্যোগ ও দুর্ভোগের পালা। এরপর আবারো ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে শত শত মামলার জালে জড়িয়ে দেয়ায় তাদের থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাচারির মধ্যেই আটকে রাখা হচ্ছে। এতে দলটির হাত-পা বাঁধা হয়ে গেছে। তাদের আর এখন স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখা হয়নি।

দলের চেয়ারপারসনসহ বহু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হাজারের ওপর মামলা দায়ের করা হয়েছে। এখন এসব মামলায় হাজিরা দিতেই তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। দলের আরো একটি সমস্যা, এর ৫০০ সদস্যের মাথাভারী কেন্দ্রীয় কমিটি। কমিটির সদস্যরা পদ পেয়েছেন বটে, কিন্তু তাদের মাঠে-ময়দানে কোনো তৎপরতা লক্ষ করা যায় না। দলটি এবার নতুন সদস্য সংগ্রহের কর্মসূচি নিয়েছে। কিন্তু কিছু নেতা ছাড়া এই কর্মসূচিতে আর কারো অংশগ্রহণের খবর পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া বিএনপি নেতাদের অনেকেই গণমুখী নন। তারা সাধারণ মানুষের সাথে মিশে কাজ করার চেয়ে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে বক্তব্য দিতে পছন্দ করেন।

এসব আলোচনায় নিছক রাজনীতি নিয়েই আলোচনা হয়। সমসাময়িক জাতীয় সমস্যা নিয়ে খুব বেশি কথা হয় না। অথচ বিশেষজ্ঞদের ডেকে নিয়ে বিভিন্ন চলমান ইস্যু সামনে এনে বড় ধরনের আলোচনার আয়োজন করলে, এর শুভ প্রভাব পড়তে পারত। মিডিয়ায় বিএনপির অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল অথচ ক্ষমতাসীন দলের নেতারা মিডিয়ায় বিএনপিকে চৌকস ভাষায় আক্রমণ করে, কিন্তু বিএনপির দু-চারজন নেতা ছাড়া এসব বক্তব্যের কড়া জবাব দেয়া এবং পাল্টা আক্রমণ করতে অন্যদের তেমন দেখা যায় না।

বাংলাদেশের প্রবাসীরা বিভিন্ন দেশে প্রধান দলগুলোর শাখা প্রতিষ্ঠা করেছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের শাখাগুলো তৎপর। বিএনপির এমন শাখা থাকলেও সেগুলোকে চাঙা করে তোলা হচ্ছে না। বাংলাদেশের বিরাট জনগোষ্ঠী দেশের বাইরে অবস্থান করলেও ভোটের রাজনীতিতে তাদের প্রভাব রয়েছে। এখানে বিএনপি কাজ করতে পারে এবং তাতে তাদের লাভও হবে। দেশের সংখ্যালঘুদের ভেতর বিএনপির তৎপরতা তেমন নেই। আওয়ামী লীগ তাদের কাছ থেকে ভোটের সুবিধা গ্রহণ করলেও সংখ্যালঘুদের প্রতি তাদের আচরণ সন্তোষজনক নয়। এখানে বিএনপি এগিয়ে আসতে পারে।

আগে সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে ছিল। এখন সেই একচেটিয়া অবস্থা নেই। এখানে বিএনপি সহজেই স্থান করে নিতে পারে। এজন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নেয়া উচিত। সামনে বিএনপিকে বড় ধরনের সঙ্কট মোকাবেলা করতে হবে। আগামী বছর নির্বাচন হবে, তবে সে নির্বাচন কেমন হবে, কোন ধরনের সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে তা এখনো বলা যাচ্ছে না। সরকার নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা মানছে না। নির্বাচন কমিশন সম্পর্কিত বক্তব্য ইতিবাচক নয়। এ অবস্থায় যদি ২০১৪ সালের মতো কোনো ধরনের নির্বাচনের আয়োজন করা হয়; তবে তেমন নির্বাচনে অংশ নেয়ার কোনো অর্থ হয় না। কিন্তু এর বিকল্প কী। একটি জুৎসই বিকল্প বের করতে হবে। বিষয়টি নানা দিক থেকে জটিল। তা ছাড়া নির্বাচনের আগে সরকার যদি বিএনপি নেতাদের চলমান মামলাগুলোতে ফাঁসিয়ে আটক করে তবে কী হতে পারে। আসলে সব মিলিয়ে সামনের দিনগুলো বিএনপির অত্যন্ত কঠিন। এসব বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেয়াও ততোধিক কঠিন। তাই আগামী দিনের জন্য কী করণীয়, তা নিয়ে এখনই চিন্তা করে বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দলের যারা বুদ্ধিদাতা ও বুদ্ধিজীবী, তাদের দায়িত্ব দিতে হবে। সব কিছু বিশ্লেষণ করে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে।
দেশের নারী ভোটারেরা অধিক হারে বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে থাকেন। আগামীতে নারী ভোটারদের এই সমর্থনকে পরিচর্যা করা এবং বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে সুচিন্তিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বিএনপির মহিলা শাখাকে এ জন্য এগিয়ে আসতে হবে।

তাদের ভোটের আগেই বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। এর পাশাপাশি মূল সংগঠনকেও এ ব্যাপারে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মহিলা ভোটারেরা ব্যাপক হারে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদার প্রতি অনুরক্ত। তার ব্যক্তিগত ইমেজ ও ব্যক্তিত্ব নারী ভোটারদের ওপর প্রভাব রাখে। এ বিষয়টি মনে রাখতে এবং তা কাজে লাগাতে হবে। বিএনপি ও তাদের নেত্রীর প্রতি নারী ভোটারদের ওপর প্রভাব নিয়ে ভেবে শুধু বসে থাকলে চলবে না, এই প্রভাবকে আরো বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য দলের এবং স্বয়ং বেগম খালেদা জিয়াকে ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আরেকটা বিষয় স্মরণ রাখতে হবে, দেশের অর্ধেক ভোটার নারী। নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন এই ভোটারেরা। নারী ভোটারেরা যাতে নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যেয়ে ভোট দিতে পারেন, সে ব্যবস্থা যেন হয়। বিএনপিকে এ নিয়ে সোচ্চার হতে হবে। নারী ভোটারদের বিষয়টি দেখাশোনার জন্য পৃথক সেল থাকা আবশ্যক।

আওয়ামী লীগের একটি বড় সম্পদ হচ্ছে এ জাতির মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের প্রাণপুরুষ। আওয়ামী লীগ চমৎকারভাবে তাকে বারবার জাতির সামনে তুলে ধরে। নির্বাচনেও তাকে তারা ভোটারদের সামনে তুলে ধরে। অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথেই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে জনগণের সামনে নিয়ে আসে, যা ভোটারদের মধ্যে দ্যোতনার সৃষ্টি করে। এটা তাদের কৃতিত্ব। এটা স্বীকার করতেই হবে যে, বিএনপির সেই মাপের কোনো নেতা নেই।

কিন্তু তাদের যে কিছুই নেই তা কিন্তু নয়, বীর মুক্তিযোদ্ধা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমানকে বিএনপি তেমনভাবে তুলে ধরতে পারছে না। অথচ সাধারণ জনগণের মধ্যে জিয়াউর রহমানের ভাবমর্যাদা রয়েছে। তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বিরাজ করছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের বিশেষ অবদান রয়েছে। এটা যদি যথাযথভাবে তুলে ধরা না হয় তবে নতুন প্রজন্ম জিয়াউর রহমান সম্পর্কে কিছু জানতে পারবে না, তিনি নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে হারিয়ে যাবেন। প্রত্যেক দলের একজন প্রাণপুরুষ থাকা কল্যাণকর। তার চিন্তাচেতনা ও আদর্শকে অনুসরণ করেই দল এগিয়ে যাবে। জিয়াউর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শ ও দর্শনের প্রবর্তন করেন এবং বহুদলীয় রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেন। নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি জিয়াউর রহমানের রাজনীতিতে প্রাধান্য ছিল। তিনি তরুণ প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। এই জোয়ার আবার সৃষ্টি করার কথা বিএনপিকে ভাবতে হবে।

পৃথিবী এখন আধুনিকতার দিকে ছুটছে। রাজনীতি অর্থনীতি সামাজিক ব্যবস্থায় আধুনিকতার স্পর্শ লাগছে। বাংলাদেশে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃদু ছোঁয়া লেগেছে বটে, কিন্তু রাজনীতির ক্ষেত্রে এই ছোঁয়া তেমনভাবে স্পর্শ করেনি। জনগণের চাহিদা, তাদের আশা-আকাক্সক্ষা সব কিছু নির্ণয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া থাকা উচিত। রাজনৈতিক কর্মসূচি ও কর্মপন্থা নির্ধারণের ব্যাপারে গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণা করে বাস্তবমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু বিএনপি এ ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও আওয়ামী লীগ কার্যক্রম নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের বলয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিন্তাশীল ও গবেষকদের নিয়োগ করে রেখেছে। তারা প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। বিএনপিকে ক্ষমতায় যেতে হলে এবং ক্ষমতায় গিয়ে দেশ পরিচালনায় করণীয় সম্পর্কে অবশ্যই চিন্তা-ভাবনা প্রয়োজন। বিএনপির এমন বুদ্ধিদাতা গবেষক নেই, এ কথা পুরোপুরি সত্য নয়। কিন্তু তাকে আরো জোরদার করা এবং এর ফসল সর্বত্র ব্যবহার করা প্রয়োজন। রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মকে কাজে লাগিয়ে দলে নতুন চিন্তার স্ফুরণ ঘটানো উচিত। ফলে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা-অভিজ্ঞান ও তরুণদের কর্মোদ্দীপনার মিলিত শক্তি দলকে উজ্জীবিত করবে, বিজয়ী করবে।

আগামী নির্বাচনে একটি বড় ফ্যাক্টর হবেন নতুন প্রজন্মের ভোটারেরা। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তারা ভোটে অংশ নিতে পারেননি। ফলে গত প্রায় দশ বছরে যারা নতুন ভোটার হয়েছেন, আশা করা যায় আগামী নির্বাচনে তারা অংশ নেবেন। পাঁচ বছর পরপর প্রতিটি নির্বাচনে যারা নতুন ভোটার হন, নির্বাচনের তাদের মূল্যবান ভোট ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলে। এবার এই প্রভাব পড়বে আরো অনেক বেশি। কারণ আগামী নির্বাচনে নবীন ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশি হবে।
এসব ভোটার নতুন দিনের মানুষ হিসেবে স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল। তাদের মন-মানস নতুন চিন্তা-ভাবনায় ভরা। এরা হবে অনেক বেশি যুক্তিবাদী। এই ভোটারদের কাছে ভোট চাইতে হবে কেমন করে তা ভেবে ঠিক করতে হবে। তাদের ভোট কেন বিএনপি চাওয়ার অধিকারী, তা তাদের যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে। বিএনপির রাজনীতি, তরুণ-তরুণীদের মন-মানস তাদের ও তাদের চাওয়াপাওয়ার বিষয়টি উপলব্ধি করেই আবেদন জানাতে হবে। বিএনপি তরুণ-তরুণীদের জন্য কিভাবে কী করতে চায় তা তাদের বলতে হবে। এ কাজ অত্যন্ত কঠিন, যোগ্যতা সক্ষমতার সাথে কাজটি করতে। কোন মাধ্যমে কোন প্রক্রিয়ায় তা করতে হবে সে নিয়ে এখনই চিন্তা-ভাবনা করে রাখতে হবে। বিএনপির এবার অনেক বেশি হোমওয়ার্ক করা উচিত।

Be Sociable, Share!
বিভাগ: প্রধান খবর - ২, রাজনীতি

এখনো কোন মন্তব্য করা হয়নি.

মন্তব্য করুন

*